ইতিহাস

আধুনিক যুগের যে সব প্রযুক্তি হাজার বছর আগেও ছিল (পর্ব-১)

আধুনিক যুগের যে সব প্রযুক্তি হাজার বছর আগেও ছিল/ NeonAloy

মানুষ অসম্ভব উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন এক প্রাণি। মানুষ টিকে থাকার জন্য, পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়ে নিজের বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে অনেক আবিষ্কার করেছে। রেনেসাঁ যুগকে আমরা ভেবে থাকি মুক্তবুদ্ধি চর্চা এবং নব্য আবিষ্কার এর যুগ হিসেবে। শিল্প বিপ্লবের সময় আবিষ্কৃত হয় অনেক উদ্ভাবনী যন্ত্র এবং আবিষ্কার যা আমাদের “আধুনিক” সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। কিন্তু বহুকাল আগে, আদি ঐতিহাসিক যুগে মানুষ কীভাবে টিকে থাকতো বিরুদ্ধ পরিবেশে এই কথা যদি চিন্তা করি, তাহলে আমাদের কপালে কি একটু চিন্তার ভাজ পরে না? সাধারণভাবে কাউকে যদি বলা হয় আদিম সভ্যতা বলতে একজন কি বোঝে, তাহলে সে বলবে পাথর এর হাতিয়ার, আগুনের ব্যবহার, শিকার করে জীবন যাপন এসবের কথা। কিন্তু আপনি জানলে অবাক হবেন যে, আমরা এ যুগে যে সব প্রযুক্তি ব্যবহার করি তাঁর অনেক কিছুই হাজার হাজার বছর আগেও ছিলো!

চলুন এ পর্বে জেনে নেই এমন ৬টি আবিষ্কার যা আমরা বর্তমানে ব্যবহার করে থাকি এবং ভেবে থাকি এগুলো খুব সাম্প্রতিক কিন্তু এর আবিষ্কার বা ব্যবহার ছিলো সেই আদি ঐতিহাসিক যুগ থেকেই।

১. কৃত্রিম হাত-পাঃ প্রথমেই শুরু করি প্রস্থেটিক এবং প্লাস্টিক সার্জারি এর কথা দিয়ে। আমরা বিকলাঙ্গ মানুষদের কৃত্রিম হাত-পা ব্যবহার করতে দেখে থাকি যা প্রস্থেটিক নামে পরিচিত। আপনারা কি জানেন প্রাচীন মিশরে ৩০০০ খ্রিষ্টপূর্বে প্রস্থেটিকের ব্যবহার এর প্রমাণ পাওয়া যায়! কি অবাক হলেন তো? খ্রিষ্টের জন্মেরও ৩০০০ বছর পূর্বে মিশরে বিকলাঙ্গ মানুষ যে প্রস্থেটিক ব্যবহার করতো তা শুধু পায়ের আকৃতিই দান করতো না বেশ কার্যকরী ছিলো হাঁটাচলার জন্য।

 

আধুনিক যুগের যে সব প্রযুক্তি হাজার বছর আগেও ছিল/ NeonAloy

 

 

২. প্লাস্টিক সার্জারিঃ প্রায় ৮০০ খ্রিষ্টপূর্বে প্রাচীন ভারতে গাল ও কপালের চামড়া দিয়ে নাকের আঁকার প্রদান করা হতো যা বর্তমানের আধুনিক যুগের প্লাস্টিক সার্জারির মতোই। আধুনিক যুগে প্রথম প্লাস্টিক সার্জারি এর ব্যবহার দেখা যায় ১৯১৭ সালে বিশ্বযুদ্ধের আহত সৈনিক এর মুখের আঘাতের চিকিৎসায়। কিন্তু আমরা দেখতে পারছি প্লাস্টিক সার্জারি এর ব্যবহার ছিলো সেই প্রাচীন কাল থেকেই, এটি খুব সাম্প্রতিক কোনো আবিষ্কার বা প্রযুক্তি নয়।

 

৩. পানি ও পয় নিষ্কাশনঃ আধুনিক শহরের কথা বললে উন্নতমানের পয় নিষ্কাশন ব্যবস্থা, পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থার কথা চলে আসবে। ১৯ শতকের মাঝামাঝিতে ইউরোপে এই নিষ্কাশন ব্যবস্থা চালু হয়। কিন্তু জেনে অবাক হবেন, বহু প্রাচীন সভ্যতায় এই নিষ্কাশন ব্যবস্থার দেখা মেলে। খ্রিষ্টপূর্ব ২৬০০ এর ইন্দাস ভেলীর মহেঞ্জোদারোতে পাবলিক টয়লেট এবং আধুনিক মানের নিষ্কাশন ব্যবস্থা ছিলো। ব্যাবীলন, প্রাচীন চীন, রোমে এরূপ পাবলিক টয়লেট এবং পয় নিষ্কাশন ব্যবস্থা দেখা যায়। এমনকি বাংলাদেশের প্রাচীন সভ্যতা কুমিল্লার ময়নামতি এবং নওগাঁর পাহাড়পুরেও প্রত্নতাত্ত্বিকরা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আবিষ্কার করেছেন! তাই দেখতেই পারছেন পানি ও পয় নিষ্কাশন ব্যবস্থা আধুনিক মনে হলেও এর ব্যবহার কত আগে থেকেই হচ্ছে!

 

আধুনিক যুগের যে সব প্রযুক্তি হাজার বছর আগেও ছিল/ NeonAloy

 

 

৪. ব্যাটারিঃ আলেক্সান্ডার ভোল্টা কে আমরা চিনি প্রথম ব্যাটারি আবিষ্কারক হিসেবে। কিন্তু আপনারা কি জানেন প্রায় ২৫০০ খ্রিষ্টপূর্বে সিরামিক পট, কপার টিউব এবং আয়রন রডের তৈরি ব্যাটারি ছিলো? প্রাচীন ব্যাবীলন সভ্যতায় গ্যাল্ভানাইজেশন পদ্ধতি ব্যবহার করে ব্যাটারি বানানো হতো যা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম। ব্যাটারি আমরা আধুনিক সভ্যতার যুগান্তকারী এক আবিষ্কার মনে করি যা আমাদের আধুনিক সভ্যতার অন্যতম চাবিকাঠি বিদ্যুৎ এর আদিরূপ। এই ব্যাটারি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে আদিমকালের মানুষরা। মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতা যে কত প্রাচীন তা সহজেই বোঝা যাচ্ছে সিরামিক পটের এই প্রাচীন ব্যাটারি এর উদাহরণ থেকে।

 

আধুনিক যুগের যে সব প্রযুক্তি হাজার বছর আগেও ছিল/ NeonAloy

 

 

৫. ফ্লেইমথ্রোয়ারঃ  আপনারা অনেকেই ফ্লেইমথ্রোয়ার বা অগ্নি-বর্ষক যন্ত্র দেখে থাকতে পারেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সিনেমা গুলোতে। কিন্তু এই ফ্লেইমথ্রোয়ার এর ব্যবহার ছিলো ৪২৪ খ্রিস্টপূর্বে! ডেলিয়ামের যুদ্ধে গ্রীকরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলো। কি অবাক হচ্ছেন? হবারই কথা! তারা যুদ্ধ জাহাজের এক কোণায় কপার টিউব রাখতো যার ভেতরে থাকতো দাহ্য তরল পদার্থের মিশ্রণ । এগুলোর টিউবের মুখ দিয়ে আগুন ছোঁড়া হতো শত্রুর জাহাজে। টিউবগুলো ছিলো আকারে অনেক বড় এবং বহন করা কষ্টসাধ্য ছিলো। কি উপাদান ব্যবহার করতো তা অজানা ছিলো অন্যান্য জাতি গুলোর কাছে এর ফলে কালের বিবর্তনে এই প্রযুক্তিটি হারিয়ে যায়। ১৯ শতকে জার্মানিতে ফ্লেইমথ্রোয়ার আবারো আবিষ্কৃত হয় যুদ্ধে মানুষকে হত্যা করার জন্য এবং এগুলো ছিলো আকারে ছোট ও বহনযোগ্য।

 

আধুনিক যুগের যে সব প্রযুক্তি হাজার বছর আগেও ছিল/ NeonAloy

 

 

৬. ঘড়িঃ সকালের মিষ্টি ঘুম ভাঙ্গার জন্য একটি অ্যালার্ম ঘড়িই যথেষ্ট।  শুনলে অবাক হবেন খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ তে গ্রীক দার্শনিক প্লেটো “ওয়াটার ক্লক” ব্যবহার করতো যা তাকে তার লেকচার দেয়ার সময়কে স্মরণ করিয়ে দিতে সাহায্য করতো। এর পরবর্তীতে এই পানির শক্তির সাহায্যে চালিত ঘড়িগুলো রোম এবং মধ্যপ্রাচ্যে আবিষ্কৃত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের উসমানীয় সাম্রাজ্যে নামাযের সময় মনে করিয়ে দেয়ার জন্য এই পানি শক্তি চালিত ঘড়ি ব্যবহার করা হতো। চীনে ৮ম শতাব্দীতে যান্ত্রিক ঘড়ির প্রচলন শুরু হয় যা ইউরোপে ১৪ শতাব্দীতে পুনরায় প্রচলিত হয়। এই যান্ত্রিক ঘড়ি গুলোকে বলা হয় স্ট্রাইকিং ঘড়ি(striking clock)। ইউরোপে ক্লক টাওয়ার এর প্রচলন দেখা যায় এবং ১৫ শতকে এসে এই ঘড়ি গুলো মানুষের ব্যক্তিগত ব্যবহারে ব্যবহৃত হওয়া শুরু করে।

লেখকঃ সাখাওয়াত আকাশ 

 

আরো পড়ুনঃ আদিম মানুষের আজব আজব কাজ! 

 

Most Popular

To Top