নাগরিক কথা

ডাক্তারের এতো ভুল?

ডাক্তারের এতো ভুল?/NeonAloy

মাস ছয়েক আগের কথা। ভোর চারটায় ফ্যামিলির এক সদস্যের হেমাচুরিয়া (প্রসাবের রাস্তা দিয়ে রক্ত যাওয়া) স্টার্ট হলো। আমি কঠিন বিপদে পড়লাম, নিজে যতই চিকিৎসক হই না কেন, এরকম অবস্থায় মাথা ঠান্ডা রাখা ডিফিকাল্ট। রোগীকে ইমিডিয়েট ট্রিটমেন্ট যেমন দিতে হবে তেমনি দ্রুত এর আন্ডারলায়িং কারণও বের করতে হবে। ঢাকা মেডিকেল নিজের সেকেন্ড হোমের মতো, সেখানে নিয়ে যাবো কি না ভাবছি, এমন সময় মনে পড়ল ঐদিন সরকারি ছুটি, প্রতিটা স্টেইপে কিছুটা ডিলে হবে। বাসার কাছে ধানমন্ডির LabAid, ফ্যামিলির সদস্যকে নিয়ে সেখানেই ছুটতে হলো।

ভোর ৫ টা নাগাদ LabAid এ রোগীকে ভর্তি করলাম, Empirical Treatment স্টার্ট হলো, ইনভেস্টিগেশন পাঠানো হলো। দুপুর ১২ টার মাঝে কালচার রিপোর্ট বাদে সবগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেজাল্ট চলে আসলো, রিপোর্ট দেখে আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, সমস্যা তেমন গুরুতর নয়, বাকী চিকিৎসা ধীরেসুস্থে ডিএমসিতে করানো যেতে পারে। আমি সংশ্লিষ্ট ডাক্তারকে ডিসচার্জ পেপার রেডী করতে বললাম।

বিল সেকশনে বিল দিতে গিয়ে দেখি LabAid এ এই ৮ ঘন্টার অবস্থানকালে আমার বিল হয়েছে ২৩,০০০ টাকা। আমি যে সরকারি চাকরি করি তাতে মাসে সর্বসাকুল্যে হাজার চল্লিশেক টাকা পাই, একদিনের একটা ইনসিডেন্টে ৮ ঘন্টায় আমার বেতনের অর্ধেকের বেশী টাকা বের হয়ে গেলো!

আমি যে টাইপের লেখা লিখি তাতে এ বিষয় নিয়ে LabAid হাসপাতালের পিন্ডি চটকিয়ে একটা জ্বালাময়ী নোট লেখা আমার জন্য খুব কঠিন ছিলো না, ভুল চিকিৎসার অভিযোগও আনতে পারতাম, আমজনতা সেগুলো আগুনের মতো শেয়ার করতো। কিন্তু সেরকম কিছু আমার লেখা হয় নাই। প্রথম কারণ, আমি আমজনতা না, আমি চিকিৎসক, আমি জানি LabAid এ নেয়া প্রতিটা স্টেইপই সঠিক ছিলো, টাকা গেলেও আমি দ্রুত পেশেন্ট ম্যানেজমেন্ট পেয়েছিলাম। দ্বিতীয়ত, আমি জানতাম যে LabAid এ কেমন বিল হতে পারে, নিজের ইচ্ছায় সেখানে গিয়েছি, এটা নিয়ে রসিয়ে রসিয়ে লেখার কোন অর্থ নেই, লাইভে এসে কান্নাকাটি করারও কোন অর্থ হয় না।

২.

গত কয়েকদিনে স্কয়ার হাসপাতালের এক ঘটনা ভাইরাল হলো। এ ধরাধামে এক শিশুকে জন্ম দিতে গিয়ে ভিকটিম কিভাবে স্কয়ার হাসপাতালে হেনস্থা হয়েছে সেটি তিনি নিজ মুখে বর্ণনা করলেন। আমি পুরো ভিডিওটি দেখলাম, শুনলাম।

চিকিৎসক হিসেবে পুরো ভিডিওর বর্ণনায় Medical point of view তে আমি একটি বর্ণও খুঁজে পাই নাই যেটি সংশ্লিষ্ট, দায়িত্বরত গাইনী ও অবস্ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে যায়, তদন্ত কমিটির সামনে চিকিৎসা সংক্রান্ত অভিযোগগুলো মোটেই ধোপে টিকবে না। তবে, হ্যাঁ ভিকটিমের বর্ণনায় আমার মনে হয়েছে পেশেন্ট ডিলিং এ চিকিৎসক ও চিকিৎসক সংশ্লিষ্ট অন্যদের গলদ ছিলো, তারা পেশেন্টের সাথে Rapport তৈরি করতে পারেন নাই।

ভিডিওতে স্পষ্টতই সম্পূর্ণ একপাক্ষিক ভাবে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ আনা হয়েছে, অপজিশন পার্টির কোন বক্তব্য সেখানে নাই। যেহেতু এই জাতির বিচার-বুদ্ধির ঘাটতি আছে, কাজেই এরা একপক্ষের কথা শুনেই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে রায় দেয়া শুরু করলো, কেউ গুলি করতে চাইলো, কেউ ফাঁসিও চাইলো, চিকিৎসক যেহেতু মহিলা- কাজেই ধর্ষণও বাদ গেলো না। অথচ এই অবার্চীনগুলোই আবার রেইপের বিরুদ্ধে কথা বলে। ভিডিওটি ভাইরাল করে সম্পূর্ণ চিকিৎসক সমাজকে (ব্যাড লাক, এর মাঝে আমিও আছি, যদিও আমি এবং আমার মতো অন্য চিকিৎসকদের কোন দায় এতে নাই) জনতার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হয়েছে। আমি নিশ্চিত করেই বলছি এর দায়দায়িত্ব ভিডিওটি যারা ভাইরাল করেছেন তাদের নিতে হবে।

৩.

অ্যাপোলো হাসপাতালের এক ঘটনাও নেটের কল্যাণে দেখতে পেলাম। এক বয়স্ক ভদ্রলোক ICU তে শুয়ে আছেন, মুখে অক্সিজেনের মাস্ক পরা, হাতে পালস্ অক্সিমিটার লাগানো। ভদ্রলোককে অবহেলা করা হয়েছে কিনা সেটি তার কন্যা Provocative ওয়েতে জিজ্ঞেস করছেন। ভদ্রলোক একবার ‘না’ করলেন আরেকবার ‘হ্যাঁ’ করলেন।

ভদ্রলোকের সাথে যদি চিকিৎসক ও চিকিৎসক সংশ্লিষ্ট কেউ দুর্ব্যবহার করে থাকেন তবে নিশ্চিতভাবেই সেটা অন্যায় হয়েছে। এ ভিডিওটি তদন্ত কমিটির কাছে জমা দেয়া যেতে পারতো, সেখানেই এর সুরাহা হওয়াটা শোভনীয় ছিলো। আফসোস, ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছে, সম্পূর্ণ চিকিৎসক সমাজকে সচেতনভাবেই অপরাধী করা হয়েছে। যারা শিক্ষিত হয়েও এই ভিডিওটি ভাইরাল করেছেন, তারা অবিবেচকের মতো কাজ করেছেন, চিকিৎসক ও রোগীর মাঝে দূরত্ব এতে বেড়েছে, এর ফলাফল কোন পক্ষের জন্যই ভালো হয় নাই।

৪.

আমি যে বিষয়ের এক্সপার্ট নই, সচেতনভাই সে টপিকটা আমি এড়িয়ে চলি, আমার শিক্ষা আমাকে সেটাই করতে বলে। আমি চিকিৎসক হয়ে যদি প্রকৌশল সম্পর্কিত কোন বিষয়ে নাক গলাতে চাই তবে সেটি হবে স্টুপিডিটি। প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি এ ধরণের স্টুপিডিটি দেখাবে না।

আফসোস, এদেশে একটি নব্য আপাত সচেতন জনগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে, গাঁও গেরামে প্রচলিত একটি কথা এদের জন্য ভালো খাটে, কথাটি এরূপঃ “ধন নাই বন্দুক কাঁধে, চাল নাই সাত সের রাধে”। নিজের জ্ঞানের লিমিট নিয়ে এদের কোন ধারণাই নেই। এদের লেখাপড়া আগে SSC বা HSC লেভেলে সীমাবদ্ধ থাকত, এখন এরা গ্রাজুয়েশন করছে, প্রকৃত শিক্ষা থেকে এরা যথেষ্টই দূরে, ফেসবুকে সব বিষয়ে মতামত প্রকাশ করাকে এরা স্মার্টনেস মনে করে, টপিকটা যদি হয় চিকিৎসা সংক্রান্ত তবে তো কথাই নেই!

উদাহরণ দেই। মাসখানেক আগে এক মেডিসিন বিশেষজ্ঞের এক প্রেসক্রিপশন ভাইরাল হলো, রোগীকে ১৭-১৮ টার মতো ওষুধ প্রেসক্রাইব করা হয়েছে। নব্য আপাত সচেতন সমাজ সেই প্রেসক্রিপশন শেয়ার করলেন, রোগী ভাত খাবে না ওষুধ খাবেন- সেটা নিয়ে তারা গোস্বা করলেন, সমগ্র ডাক্তার সমাজকে মন্ডুপাত করে তবে তেনারা থামলেন।

প্রেসক্রিপশনটি আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। প্রেসক্রিপশনের একপাশে রোগীর রোগগুলো উল্লেখ করা আছে, ৬-৭ টির মতো রোগ, কিছুটা রকমফের ভেদে ১৭-১৮ ওষুধগুলো সহজেই জাস্টিফাই করা যায়। এ প্রেসক্রিপশনকে নেগেটিভ ওয়েতে ভাইরাল করার কোন কারণ নেই।

৫.

বাঙালি অতি আবেগী জাতি। আবেগ ভালো, অতি আবেগ খারাপ, বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই অতি আবেগ বিনাশী রূপে আবির্ভূত হয়। এই অতি আবেগের জন্যই স্বাধীনতার এতো বছর পর কাঠ দিয়ে বল বাড়ি দেয়া ছাড়া আমাদের আর তেমন কোন উন্নতি নাই।

গ্রো আপ পিপল, যা ফেসবুকে দেখলেন সেটা দেখেই উত্তেজনার বশে শেয়ার বাটনে চাপ দেয়ার আগে একটু দম নিন। একবার ভাবুন, আপনার এই শেয়ার ব্যক্তি পর্যায়ে, পারিবারিক পর্যায়ে, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কতটুকু ইমপ্যাক্ট ফেলতে পারে, ইন দি লং রান-সেটি অভারওল ভালো কিছু নিয়ে আসবে নাকি খারাপ কিছু? দিনশেষে এই চিকিৎসকরাই কিন্তু আপনাদের ভরসা, দূরত্ব সৃষ্টি করে আপনি কি উপকৃত হচ্ছেন?

উপদেশ দেয়া আমার কাজ নয়, তবে জীবন চলার পথে যা দেখি তার কিয়দংশ কিবোর্ড চেপে আপনাদের মাঝে মাঝে জানাই। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আজ উপদেশগুলো দিয়ে ফেললাম। তবে যে জাতি মাছের কিংবা গাছের গায়ে “আল্লাহু” লেখা ফেইক টাইপ জিনিসপত্র ফেসবুকে দেখে ‘সোবহানাল্লাহ’ বলে সেটা হাজার হাজার শেয়ার করে, তাদের কাছে আমার এই উপদেশ টিকবে বলে মনে হয় না।

৬.

BMDC(Bangladesh Medical & Dental Council) বলে একটা জিনিস আছে, এর ঠিকানা ২০৩, সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্মরণী, ফোন নাম্বার–৯৫৫৫২৩৬। চিকিৎসা সংক্রান্ত যদি আপনার কোন অভিযোগ থাকে তবে প্রমাণসহ এই প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করুন। উত্তেজনার বশে আপনি আপনার ভিডিও ভাইরাল করে অন্যান্য নির্দোষ চিকিৎসকদের জনগণের মুখোমুখি করবার আগে এই জায়গাটায় এসে আপনার ভিডিওগুলো দেখান, উত্তেজনাকে সাময়িকভাবে চেপে রাখুন, সঠিক সময়ে উত্তেজনাকে ব্যবহার করুন।

তবে BMDC এরও কিন্তু ভূমিকা আছে। শুধুমাত্র Attention seeking এর জন্য যারা মূর্খের মতো চিকিৎসক ও জনগণকে মুখোমুখি দাঁড় করায়-তাদের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা করুন। একজন চিকিৎসক কিভাবে কত শত বিনিদ্র রজনীর বিনিময়ে চিকিৎসক হয়ে উঠেন সেটা BMDC নামক প্রতিষ্ঠানের জানা থাকার কথা। সেই বিনিদ্র রজনীগুলো এরা আমজনতাকে গলা টিপে মেরে ফেলার জন্য ব্যয় করেনি। ভাইরাল সংস্কৃতির মাধ্যমে এদেশে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত হবে, লাখ টাকার ফসল নিমিষেই দুই টাকার ছাগলে খেয়ে ফেলবে, আর BMDC নিশ্চুপ থাকবে সেটি কাম্য হতে পারে না।

৭.

এবার চিকিৎসকদের কিছু কথা বলি। যদি আপনি রোগীকে সময় দিয়ে কথা বলতে না পারেন তবে প্রাইভেট প্র্যাকটিস বাদ দেন। এ পর্যন্ত যতগুলো মিসহ্যাপেনিং আমি দেখেছি সেখানে চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে সমস্যা তেমন দেখি নাই, যা ঘটেছে তার বেশীরভাগই কম্যুনিকেশন গ্যাপের কারণে। আপনি যতই ত্যাঁনা প্যাচান না কেন, আমি জানি এক হাতে তালি বাজে না।

আর একটা বিষয়-রোগীর কাছে নিজেকে প্রভু জাহির করা বন্ধ করেন। আমরা প্রভু নই, আমরা বন্ধু-এটা যদি রোগীকে প্রথম ২ মিনিটে বোঝাতে না পারেন তবে বুঝতে হবে আপনার ফেইট খারাপ।

৮.

আমি চিকিৎসক। গলায় Stethoscope এর সাথে হাতে কলম তুলে নিয়েছিলাম যাতে এদেশে চিকিৎসক ও জনগণের মাঝে দূরত্ব কমিয়ে আনা যায়। At the end of the day- আমি ব্যর্থ।

মাওলানা রুমির একটা কোটেশন মনে পড়ছেঃ “When we practice loving kindness and compassion, we are the first ones to profit.” এদেশের জনগণ অবশ্য চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে মনে মনে ঘৃণাকেই আবাদ করে গিয়েছেন, চিকিৎসক-রোগী সম্পর্কের কোনো উন্নতি তাই আপাতত আমার চোখে পড়ছে না।

৯.

“Weak people see flaws in others, where strong people see potential. What they really see is a part of themselves.” দুঃখের সাথে বলতে হয় এদেশের জনগণ চিকিৎসকদের মাঝে কোন Potentiality দেখতে পায় নাই।

গত কয়েকদিনে এটা স্পষ্ট এদেশের জনগণ চিকিৎসা বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনায় আগ্রহী নয়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে এরা ধ্বংসযজ্ঞে বিশ্বাসী, এরা ধ্বংস দিয়ে সৃষ্টি রচনায় আগ্রহী। ধ্বংস দিয়ে কি কোনো সৃষ্টি রচনা হয়? সৃষ্টির রচনা হয় ভালোবাসায়- এ ধ্রুব সত্যটি এ বোকা জাতিকে কে বোঝাবে? সহজ সরল পথ বাদ দিয়ে এরা যেভাবে বাঁকা পথে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতেছে, তার ফল একদিন তাদের পোহাতে হবে, সেদিনটি কারো জন্যই খুব একটা সুখকর হবে না!

 

লিখেছেনঃ জামান অ্যালেক্স 

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

 

আরো পড়ুনঃ মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকে মানুষ!

Most Popular

To Top