নাগরিক কথা

প্রতিভার দাম দেয় না এইদেশ!

প্রতিভার দাম দেয় না এইদেশ! NeonAloy

আমি তাঁর বাঁ দিকে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমাকে লক্ষ্য করেননি তিনি। শ্যামলী এস ও এস শিশুপল্লীর পাশের রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছিলেন তিনি। প্রচন্ড রোদ। ভদ্রলোকের চোখ মুখ কুঁচকানো। আমি দেখেই চমকে উঠি। দীর্ঘকায়, ছিপছিপে সেই মানুষটি কেমন যেন বুড়িয়ে গেছেন। একটু ঝুঁকে হাঁটছিলেন। একবার ভাবলাম গিয়ে উনাকে বলি কিছু, জড়িয়ে ধরি তাঁকে। আর বলা হয় নি!

বরাবর তিনি ছিলেন আমার প্রতিপক্ষ শিবিরে। খুব বিরক্ত হতাম তাঁকে দেখে। তাঁর জন্য আমাদের প্লেয়ারদের ঢুকতে বড় কষ্ট হতো। কিন্তু তিনি যখন বাংলাদেশের হয়ে নামতেন, তিনি হয়ে যেতেন আমার কিংবা আমাদের মধ্যমনি।

জুয়েল রানা। দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ ফুটবলের ডিফেন্স যিনি আঁকড়ে ধরে ছিলেন। মোনেম মুন্নার পর তাঁকে বাংলাদেশ ডাকতো “চীনের প্রাচীর” উপাধি দিয়ে। এমন অসাধারণ ডিফেন্ডার খুব কম দেখা যায়।

মোহামেডান আমাদের স্কুলে দুই বা তিন মৌসুম প্র্যাক্টিস করেছিলো। রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের বড় মাঠে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁদের প্র্যাক্টিস দেখতাম। সাথে ছিলো আলফাজ, আরমান মিয়া, মানিক, লাডি বাবা লোলা, বোডে বাবা লোলা, রূপু, কায়সার হামিদদের মতো সে সময়ের বড় তারকারা।

প্রথম আলোর একটা সংবাদে জানতে পারলাম জুয়েল রানা ২২ শে এপ্রিল চলে যাচ্ছেন চিরতরে আমেরিকায়। ফ্যামিলি সেটেলমেন্ট ভিসা নিয়ে। হয়তো ফিরবেন। ঘুরতে আসবেন দেশে। এই দেশের মাঠ, এই দেশের ফুটবলকে হয়তো মনের গহীন থেকে স্বরণ করবেন, মাঝে মধ্যে কষ্টে ভিজে উঠবে তাঁর চোখ। হয়তো সে কথা কাউকে বলবেন না।

সে রিপোর্টে জুয়েল রানার অনেক ক্ষোভ আর দুঃখের কথা পড়লাম। তেমন অবাক হইনি। এই দেশ কখনো প্রতিভাদের লালন করতে পারেনা, করেনা হয়তো করবেও না। এক সময় মোনেম মুন্না ছিলো এই দেশের প্রাণের মানুষ। নিরবে নিভৃতে একদিন চলে গেলেন তিনি কিডনী রোগে ভুগে ভুগে। দেশ তাঁকে মনে রাখেনি। তাঁর স্ত্রী, সন্তান কাউকে মনে রাখেনি ফুটবল ফেডারেশন। কি করে তাঁরা বেঁচে আছেন, কি করে তাঁরা চলছেন আমরা কেউই তা জানিনা।

ঠিক একই ব্যাপার হবে হয়তো আজকের মাশরাফির। একদিন তিনিও এমন প্রচন্ড রৌদ্দুরে হেঁটে ফিরবেন বাসায়। একা হয়ে উঠবেন ক্রমশ। কেউ তাঁকে মনে রাখবে না। এই দেশ মনে রাখতে জানে না।

জুয়েল রানাও অনেক অভিমান, অনেক কষ্ট নিয়ে চলে যাচ্ছেন নিউ ইয়র্কে। সেখানে গড়বেন নতুন পৃথিবী। নতুন সময়। বলছিলেন ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তিনি জানেন, এখানে ২ বছরের একটি বাচ্চাও ধর্ষণ থেকে বাঁচতে পারেনা, ধর্ষিত হয় কলা গাছ, ঘোড়া সব কিছু। এই দেশে বাবা তার সন্তানকে মেরে ফেলে জন্মের পর কানের কাছে আজান দেয়া হয়নি, এটি জানতে পেরে।

এই দেশে যে শুটার আসিফ শুটিং-এ দেশকে স্বর্ণ এনে দিয়েছিলো, সেই আসিফের হাতটি পিটিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছিলো পুলিশ। এটিই এই জনপদে খুব স্বাভাবিক।

তাই সুযোগ হলেই এখানকার মানুষ পশ্চিমে চলে যেতে চায়। পশ্চিমে মানুষের মতো বেঁচে থাকতে চায়। সে সুযোগ সেখানে রয়েছে।

আমি জুয়েল রানাকে ভুলবোনা কোনোদিন। আমি আবাহনীর সমর্থক ছিলাম। জুয়েল রানা ছিলেন মোহামেডানের খেলোয়ার। কিন্তু সেসব শুধু সমর্থন আর পাল্টা সমর্থনের কথাই কেবল।

যতদিন বেঁচে থাকব, ডিফেন্ডার জুয়েল রানা বেঁচে থাকবেন আমার ভেতর। বাংলাদেশ মনে রাখুক কিংবা না রাখুক। আমি মনে রাখবো।

ভালো থাকবেন জুয়েল ভাই। যেখানেই থাকুন, ভালো থাকবেন!

 

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

 

Most Popular

To Top