নাগরিক কথা

আপনার নিজের মেয়ে সাইফুলের পরবর্তী শিকার হবে না তো?

আপনার নিজের মেয়ে সাইফুলের পরবর্তী শিকার হবে না তো?- নিয়ন আলোয়

পেডিয়াট্রিক এডমিশান। ব্যাস্ত সময়,  সকাল ১০:৩০। NOD (No Official Delay) Slip– এ একটা বাচ্চা আসলো। ৪-৫ বছরের ছোট্ট একটা মুখ দেখা যায় শুধু কম্বলের ফাঁক দিয়ে। ট্রলিতে এসেছে, অজ্ঞান। CA হাসিনা ম্যাডাম আরেক বাচ্চা ম্যানেজ করতে ওয়ার্ডে ব্যস্ত।

আমি স্লিপ এ লিখে দিলাম রিসিভড by Dr Sonia. ID।
তখনও জানি না কি রিসিভ করেছি। কম্বল সরাতে সরাতে বাচ্চার বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম কি সমস্যা বাচ্চার। বলল “বাচ্চাটাকে মারছে খুব ম্যাডাম”।

বাচ্চাটা কাঁপছে। ভয়ানক খিঁচুনি হচ্ছে বাচ্চার। স্যার ম্যাডাম কাউকে আশেপাশে দেখি না। চিৎকার করে ওয়ার্ড বয় কে বলছি ম্যাডামকে জানাও। স্যারকে ডাক। খিঁচুনি থামাতেই হবে। কারও অনুমতি নিলাম না। কোথাও কেউ নাই। এক এম্পুল ইঞ্জেকশন Barbit তার ক্যানুলা করা হাতে পুশ করে দিলাম। খিঁচুনি সামান্য কমলো।

দিনাজপুর ল্যাম্ব হাসপাতাল থেকে একটা সেফট্রায়াক্সন ইঞ্জেকশান আর কিছুটা স্যালাইন পেয়ে এসেছে। তারা রংপুর মেডিকেলে রেফার করেছে। কেন করেছে, কেস কি- কিছুই জানি না তখনো।

কম্বল পুরাপুরি সরালাম।
আল্লাহ! এরচে বীভৎস দৃশ্য পৃথিবীতে আর হয় না!

তার যৌনাংগের ওপর এক ফালি কাপড়। একটা ছেঁড়া প্যান্ট। সরালাম। সেই ছোট একটা জায়গা থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে পোকা (maggot) পড়ছে। মাটির ঢেলা গুঁজে দেয়া সেখানে। রক্ত-মাটি মেখে একাকার। চিৎকার দিয়ে সরে গেলাম। ইন্টার্ন হিসাবে ততদিনে পাথর হবার বিদ্যা শিখে গেছি, তবু এই দৃশ্য সহ্য করার সাহস আমাকে সৃষ্টিকর্তা দেন নি।

আশপাশ থেকে জানলাম। বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের ধন পুজা। নিম্ন বর্ণ হিন্দু। তাকে একদিন বিকালে খেলতে যাওয়ার পর থেকে খুঁজে পাওয়া যায় নাই। তার পর দিন ভোরে বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে হলদিবাগানে নিথর পড়ে থাকতে দেখা যায়। চিৎকার যেন না করতে পারে তাই গলা আচড়ে টিপে ধরে রাখা হয়েছিল অনেকক্ষণ। তাতে মস্তিস্কে রক্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে পারেনি, যার ফলে খিঁচুনি। HIE stage 3। তার ছোট্ট যৌনাংগ কেটে বড় করা হয়েছে, যৌনমিলনের উপযোগী করে নেয়া হয়েছে, উদ্দেশ্য হাসিল করা হয়েছে, রক্তপাত থামাতে না পেরে মাটির ঢেলা গুঁজে দেয়া হয়েছে। সেখানে অবায়বীয় মাধ্যমে জন্মেছে পোকা। গূড়গূড় করে বাসা করেছে সেখানে।

ধর্ষিত শিশু পুজা (বামে) এবং আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়া ধর্ষক সাইফুল

কিছুক্ষণ এর মাঝে Multidimensional Management শুরু হয় তার। গাইনিতে দৌড়াই আমি। Neurosurgery তে দৌড়াল ছোট ভাই ডাঃ এ.বি. সিদ্দিক।

ডাক্তার হাসিনা ম্যাডাম, ডাক্তার বিকাশ স্যার, ডাক্তার তোফায়েল স্যার, গাইনি বিভাগ এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলল। শিশু ওয়ার্ড-এ এসে এসে সেই ক্ষত স্থানের ড্রেসিং করত ডা: পাপড়ি।

রাহাত আল রাজিব ভাইকে পাই প্রথম থেকেই। মিডিয়ার সম্মুখীন হতে হয়েছে কতবার তাকে আর ডাক্তার হাসিনা ম্যাডামকে। কাহিনিকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিতে সদা প্রস্তুত মিডিয়া জগত। তাদেরকে সব সত্য তথ্য দিয়ে দেশবাসীকে বাচ্চাটার অবস্থা সম্পর্কে অবগত রেখেছেন।

কত দিন এরপর থেকে খেতে পারিনি। ঘুম আসতো না। বীভৎস সেই দৃশ্য শুধু চোখে ভাসে।

তিন দিন পর পুজাকে ঢাকা নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে রেফার করা হয়। সব তথ্য প্রমান এত মজবুত ছিল। আশা ছিল সুবিচার পাবে আমাদের পুজা। সে আশায় গুড়ে বালি।

পুজার ধর্ষক সাইফুলকে পুজা জেঠু ডাকতো। সেই করেছিল সর্বনাশটা। পুরাতন পোড়া বাড়িতে। এদেশে পুজার মত একটা দেবশিশুর যৌনাংগ যতটা সহজে সবার অগোচরে কেটে ফেলেছিল সাইফুল, ততটা সহজেই আইনের ফাঁক গলে বের হয়ে গেছে।

যত দিন এমন জালিম দেশে বুক ফুলিয়ে চলতে পারে, ততদিন কারো ঘরে কন্যাশিশু জন্ম না নিক

যারা তার অবাধ চলাচলের সুযোগটা করে দিয়েছেন, আমার এই লিখা তাদের মোবাইলের স্ক্রিন পর্যন্ত পৌছাবে কিনা জানিনা। এই ভয়াবহ বর্ণনা দিতে চাই নি কখনো! আজ দিলাম। কারণ এক বার ভাবুন, সাইফুলের পরবর্তী এমন নির্মম শিকার আপনার কন্যা নয় তো!

লিখেছেনঃ সোনিয়া জেমিন প্রীতি

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

 

Most Popular

To Top