টেক

ট্যুরিং টেস্টঃ রোবট ও মানুষকে আলাদা করে যে পরীক্ষা!

ট্যুরিং টেস্টঃ রোবট ও মানুষকে আলাদা করে যে পরীক্ষা!- নিয়ন আলোয়

গল্প শুরুর আগে
একজন লোক কম্পিউটারের সামনে বসে দুইজনের সাথে চ্যাট করছে। অদ্ভুদ ব্যাপার হচ্ছে এই দুইজনের একজন মানুষ আর একজন রোবট। লোকটি কিছুটা চিন্তিত, কারণ তাকে কেবল খোশগল্প করলে চলবে না, তাকে চ্যাট করতে করতেই বের করতে হবে দুইজনের মধ্যে কোনজন মানুষ আর কোনজন রোবট।
খোলাসা করছি একটু পরে। আগে একটু গালগল্প হয়ে যাক।

সোফিয়াকে মনে আছে?
অল্প কিছুদিন আগে সোফিয়া নামে একটা রোবট আমাদের দেশে এসে বেশ হইচই ফেলে দিয়েছিল, মনে আছে নিশ্চয়ই আপনাদের? সোফিয়া চমৎকারভাবে অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারত, হঠাত করে শুনলে ভ্রম হতে পারে কোন মানুষ বুঝি কথা বলছে! আচ্ছা, আসলেই কি কখনো এমন হতে পারে যে, রোবটের সাথে আলাপ করে বোঝা মুশকিল হয়ে পড়ে সে কি আসলেই রোবট নাকি মানুষ?

যদি কখনো সত্যিই এমনটা হয়ে থাকে, তবে বুঝতে হবে ঐ রোবটের কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা রয়েছে (যেহেতু তাদের সত্যিকারের বুদ্ধিমত্তা থাকার কোন সুযোগ নেই) এবং সেটা যাচাই করার জন্য মজার একটা পরীক্ষাও রয়েছে- ট্যুরিং টেস্ট।

অ্যালান ট্যুরিং
ট্যুরিং টেস্ট নিয়ে কথা বলার আগে অ্যালান ট্যুরিংকে নিয়ে একটু কথা বলা দরকার। অ্যালান ট্যুরিং (১৯১২-১৯৫৪) ছিলেন একজন ইংরেজ গণিতবিদ, ক্রিপ্টোগ্রাফার এবং গবেষক। তাকে বলা হয় আধুনিক কম্পিউটারবিজ্ঞান এবং কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার জনক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি জার্মানদের সাইফারের অর্থ উদ্ধার করতে যে ভূমিকা পালন করেন, ধারণা করা হয় এতে ইউরোপে যুদ্ধের সময়ের দৈর্ঘ্য প্রায় দুই বছর কমে যায়। আরেকটা মজার ব্যাপার হল, অ্যালান ট্যুরিং একজন ম্যারাথন দৌড়বিদও ছিলেন! ২০১৪ সালে তার জীবনী নিয়ে “The Imitation Game” নামে চমৎকার একটা মুভি বের হয়েছে, আপনারা সময় পেলে দেখে নিবেন। রোবট ও মানুষের তুলনামূলক বুদ্ধিমত্তা নিয়ে চিন্তা করতে করতে তার মাথায় রোবটের বুদ্ধিমত্তা পরিমাপ করার অভিনব একটা আইডিয়া আসে, যেটা তিনি ১৯৫০ সালে তার গবেষণাপত্র “Computer Machining and Intelligence” এ প্রকাশ করেন, নাম দেন “ট্যুরিং টেস্ট”। এই ট্যুরিং টেস্ট নিয়েই আজকে আমাদের গল্প।

ট্যুরিং টেস্ট
শুরুতে যে দৃশ্যের অবতারণা করেছিলাম, বলতে গেলে সেটাই ট্যুরিং টেস্টের মূল অংশ। এই পরীক্ষার জন্য আমাদের প্রয়োজন দুইজন পরীক্ষার্থী এবং একাধিক বিচারক। দুইজন পরীক্ষার্থীর একজন হতে হবে মানুষ, আরেকজন রোবট। তিনজন তিনটি আলাদা রুমে থাকবে, এবং বিচারক জানবেন না কোন রুমে রোবট এবং কোন রুমে মানুষ। এখন, বিচারক দুইজন পরীক্ষার্থীর সাথে কিছুক্ষণ কথোপকথন চালাবেন, এবং এই কথোপকথনের মাধ্যমে তাকে বের করতে হবে কে মানুষ আর কে রোবট। কথোপকথনটা কিন্তু হতে হবে লেখার মাধ্যমে, কারণ কন্ঠস্বর শুনে বিচারক তো সহজেই ধরে ফেলতে পারেন কোনটা কে! এতে তো আর বুদ্ধিমত্তা যাচাই হল না!

অ্যালান ট্যুরিং এর মূল আইডিয়া অনুযায়ী, কথোপকথন শুরুর ৫ মিনিটের মধ্যে যদি শতকরা ৩০ ভাগ বিচারক পুরোপুরি নিশ্চিত হতে না পারেন যে কে মানুষ আর কে রোবট, তবে রোবট বুদ্ধির পরীক্ষায় পাশ। এখন আর তাকে হেলাফেলা করা যাবে না, সে রীতিমত বুদ্ধিমান রোবট! (এইখানে বলে রাখি, এটা যে মানুষের মত দেখতে হাত-পাওয়ালা রোবটই হতে হবে তা নয়, বরং মানুষের প্রোগ্রাম করা যে কোন ধরনের মেশিন হতে পারে।)

কতটা কঠিন এই পরীক্ষা?
অনেকের একটা জিনিস মনে হতে পারে, মাত্র পাঁচ মিনিট মানুষের মত কথা চালিয়ে যাওয়া কি এখনকার অতি আধুনিক কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তাগুলোর পক্ষে খুব কঠিন? উত্তর হল, হ্যাঁ, অন্তত এখন পর্যন্ত খুবই কঠিন। মানুষ সবসময় কম্পিউটারের মত দ্রুত এবং মাল্টিফাংশনাল নাও হতে পারে, তবে চিন্তাভাবনা এবং মত প্রকাশের দিক থেকে মানুষ তার নিজের মত করে আলাদা। রোবট হয়ত তার রেকর্ড করা মেমোরী থেকে অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, তবে বিচার বিবেচনা করে মানুষের সাথে তাল মিলিয়ে কথা বলতে গেলে গেলে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তাকে যে পর্যায়ে যেতে হবে, সে এখনও ততটা পথ পাড়ি দেয় নি।

খোদ অ্যালান ট্যুরিং ধারণা করেছিলেন, ২০০০ সাল নাগাদ কমপক্ষে ১০০ মেগাবাইট মেমরীসম্পন্ন চ্যাটবট (চ্যাট করতে পারে এমন রোবট) ট্যুরিং টেস্টে পাশ করে যাবে, যদিও এর থেকে অনেক অনেক বেশি মেমরীওয়ালা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এখন পর্যন্ত এই পরীক্ষায় পাশ করতে পারেনি, কেবল একটি ব্যতিক্রম ছাড়া। সেই ব্যতিক্রমের কথা বলি।

একজন “মানবিক” রোবট
১৯৯১ সাল থেকে Hugh Loebner নামের একজন ব্যক্তির উদ্যোগে ট্যুরিং টেস্টের একটি প্রতিযোগিতা হয়। এখন পর্যন্ত মাত্র একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম এই টেস্টে পাশ করতে পেরেছে, অর্থাৎ, ৫ মিনিটের কথোপকথনে কমপক্ষে ৩০ ভাগ বিচারককে ধোঁকা দিতে সক্ষম হয়েছে, তার নাম Eugene Goostman। প্রোগ্রামটিকে তৈরী করা হয়েছে ১৩ বছর বয়সী এক ইউক্রেনিয়ান ছেলের আদলে, যার দ্বিতীয় ভাষা ইংরেজি (বলা বাহুল্য, পরীক্ষাটি নেয়ার সময় কথোপকথন হয় ইংরেজিতে)। তার এই টেস্টে পাশ করার পেছনে কিন্তু একটি মজার কারণ রয়েছে। একে তো তার বয়স কম, তার উপর ইংরেজি তার মাতৃভাষা না। বিচারকরা এটা নিয়ে নিশ্চিত ছিলেন না যে ছেলেটি কি তার অল্প বয়স আর ভাষাগত সমস্যার কারণে উত্তর দিতে হিমশিম খাচ্ছে, নাকি সে একটা কম্পিউটার প্রোগ্রাম বলে (বুঝতেই পারছেন, প্রতিযোগিতায় জেতার জন্য প্রোগ্রামারদের শুধু মেধাই না, কিছুটা দুষ্টু বুদ্ধিও প্রয়োগ করতে হয়েছে!)।

ট্যুরিং টেস্ট এবং কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যত
আচ্ছা, এখন একটু খোলা মনে চিন্তা করি তো, ট্যুরিং টেস্টের তাৎপর্যটা কোথায়? একটা রোবট যদি পাশ করেই ফেলে এই টেস্টে, তাতে তাবৎ দুনিয়ার কি আসে যায়?

অনেক কিছুই আসে যায়! অনেক কিছুই নতুন করে ভাবতে হবে আমাদের। বুঝতে হবে, প্রযুক্তি এমন জায়গায় চলে এসেছে যে, মানুষের সাথে টেক্কা দিচ্ছে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা। আজ হয়তো তারা আমাদের মত চিন্তা করতে বা কথা বলতে শিখছে, কাল হয়তো তারা আমাদের সাথে প্রতিযোগিতায় নামবে। যদিও কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার এই কীর্তি হবে মানুষেরই সাফল্য, তবে এই সাফল্য যেন সুদূর ভবিষ্যতে আফসোসের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, সেটাও চিন্তা করতে হবে। বলে রাখি, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার রোবটেরা একসময় পৃথিবী দখল করে নেবে, এমন দুশ্চিন্তা করা জ্ঞানীগুণী মানুষ কিন্তু কম নেই, আর এর শুরুটা হতে পারে ট্যুরিং টেস্টে পাশ করার মাধ্যমেই! তবে, দিল্লী অনেক দূর!

জানেন কী?
অনেক ভারী ভারী কথা হয়ে যাচ্ছে। একটা মজার কথা বলি। আমরা কি জানি যে আমরা মানুষরাও যে প্রায়ই ট্যুরিং টেস্ট দিয়ে যাচ্ছি?
ইন্টারনেটে বিভিন্ন একাউন্টে সাইন-আপ করার সময় ক্যাপচা টেস্ট তো নিশ্চয়ই দিয়েছেন? ওই যে, বিভিন্ন আঁকাবাঁকা অক্ষর দেখিয়ে কিংবা অডিও শুনিয়ে সেটা টাইপ করতে বলে? সেটা কিন্তু এক ধরনের ট্যুরিং টেস্ট! কীভাবে?
Food for thought!

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা একদিন অনেক অনেক দূর যাবে। আজকে অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে এমন অনেক কিছুই সম্ভব হবে এর দ্বারা। তবে তার ভিত্তি হিসেবে মানুষ সবসময়ই স্মরণ করবে প্রতিভাবান বিজ্ঞানী অ্যালান ট্যুরিং এর মস্তিষ্কপ্রসূত ট্যুরিং টেস্টকে, যা আধুনিক কম্পিউটার-বিজ্ঞানের ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

Most Popular

To Top