ইতিহাস

ওলন্দাজদের বড়কুঠি আর আমার মোহ

ওলন্দাজদের বড়কুঠি আর আমার মোহ- নিয়ন আলোয়

রাজশাহী এসেছি চারদিন হলো; রোজ একবেলা যাই বড়কুঠিতে। দেয়াল হাতড়াই, মেঝেতে বসি, বাতাসের সুবাস নেই, আসবাব ছুঁই, তবুও আমার সন্তুষ্টি হয় না। দালানের দারোয়ানদ্বয় আমার আচরণে বিরক্ত হয়, ভুরু কুচকে তাকিয়ে থাকে কিন্তু আমি তাদের অভিব্যক্তি অগ্রাহ্য করি আর দাঁড়িয়েই থাকি এই সুরম্য অট্টালিকা ছুঁয়ে। দারোয়ানদ্বয় প্রশ্ন করলে তাদের জানাই এই ভবনের নির্মাতা ওলন্দাজদের সাথে আমার সম্পর্ক নিবিড়। আরও জানাই ইউরোপ থেকে বাংলায় আমার প্রথম আসা ওলন্দাজদের সাথেই। প্রাচীন দারোয়ান, যে একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে, আমাকে বলে – ওলন্দাজেরা বাংলায় এসেছিলো তিনশো বছর আগে। আমি তার ভুল ধরিয়ে দেই, বলি- ১৬০২ সালে ওলন্দাজরা ‘ইউনাইটেড ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ গঠন করে ‘নিউ ওয়ার্ল্ডে’ ব্যবসা করবার উদ্দেশ্যে এবং ১৬৩০ সালে প্রথমবারের মতো বাংলায় আসে, সে হিসাবে তারা এসেছে চারশো বছর আগে। পদ্মা নদীর তীরে তারা গড়ে তুলে এই ব্যবসা কেন্দ্র। বুড়িগঙ্গার তীরে বর্তমান মিটফোর্ড হাসপাতালে গড়ে তুলে বাণিজ্যকুঠি এবং তেজগাঁয়ে গড়ে তুলে একটি বাগানবাড়ী।

এরপর আমি তাদের বলি, ইয়েন্দ্রাচ নামের এক ওলন্দাজ জাহাজে করে আমি ১৭৪৯ সালে এখানে আসি। আমার কাজ ছিল জাহাজের বোঝাইকৃত মালামালের ওজন পরীক্ষা করা এবং চাষীদের কাছ থেকে যে রেশম কেনা হতো তার গুণগতমান পরীক্ষা করা। দারোয়ানদ্বয়ের বিভ্রান্ত দৃষ্টি উপেক্ষা করে আমি তাদের আরও জানাই যে দালানের উপরেরতলায় পূবদিকের ছোট ঘরটিতে বসে আমি কাজ করতাম। বনিকনেতা ফ্লোরাস হেনড্রিক ও নিরাপত্তা অফিসার কর্নেল আর্কিস্ট সিগফ্রিড আমাকে খুব স্নেহ করতেন।

সাহেব বাজারের যেখানে এখন মসজিদ আছে, তার পাশে যে হাজীভবন, সেখানে লাল ইটের এক দালান ছিল, সেখানে আমি থাকতাম। সে এক সময় ছিল, আমি সারাদিনের কাজের পর কান্ত হয়ে এই বড়কুঠির সামনে এসে নদীর বাতাসে প্রাণ জুড়াতাম আর সাহিত্য রচনা করতাম। সেই সময় Lucht verandering O’ andere নামে এক পুস্তকও লিখেছিলাম যা স্টকহোমের এক প্রকাশক ১৮০৭ সালে ছেপেছিল। Lucht এর বাংলা হলো বাতাস, verandering এর অর্থ হলো পরিবর্তন আর andere এর বাংলা হলো অন্যান্য।

আমার শরীরের ভাষা, বেখাপ্পা দাড়ি, চুলের ঝুটি আর চোখের ভাবাবেগ তাদের দুজনকে প্রভাবিত করে, তারা প্রশ্ন করে, আপনি কি জাতীতে ওলন্দাজ? আমি বলি না, আমার আদিনিবাস ইউরোপের হ্যেরস্কগ এলাকায় যা বর্তমানের সুইডেনের মধ্যে পরেছে। এরপর তাদের আমি আর প্রশ্ন করতে দেই না, বলতে থাকি- রাজশাহীর এই এলাকায় প্রচুর রেশম চাষ হতো তখন, উৎপাদিত হতো উৎকৃষ্ট মানের রেশম সুতা আর এখানকার আবহাওয়া ছিল স্বাস্থ্যকর। এসব ব্যপার জানতে পেরে সপ্তদশ শতাব্দির শেষের দিকে ওলন্দাজ বণিকরা পদ্মা নদী দিয়ে এখানে এসে আস্তানা গাড়ে। তখন এ এলাকায় ছিল দুটি গ্রাম – রামপুর ও বোয়ালিয়া। এই গ্রাম দুটিই পরে রূপান্তর হয়েছে রাজশাহী শহরে আর এর পেছনে রয়েছে ওলন্দাজ বণিকদের অনেক অবদান। আর এই নির্দিষ্টস্থানে ওলন্দাজ বণিকদের ব্যবসায়-বাণিজ্যের কারনেই একটি কলোনী ও বাজার গড়ে উঠে, নাম হয় যার সাহেবগঞ্জ। কিন্তু সাহেবগঞ্জ একসময় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলে বর্তমান ‘সাহেব বাজারের’ সৃষ্টি হয়।

আমি তাদের আরও বলি- এরও অনেক আগে, ষোলশতকে পর্তুগিজরা ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সামুদ্রিক পথ খুঁজে পায় এবং এখান থেকে ব্যাপকহারে মশলা ও রেশম কিনতে শুরু করে। ইউরোপে বিশাল বাজার থাকাতে সতেরো শতকের প্রথম দিকে ইংরেজ, ফরাসী ও ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিগুলি গঠিত হয়। পর্তুগিজরা এ ব্যবসা শুরু করলেও ওলন্দাজ ও ইংরেজদের কাছে তারা মার খেয়ে যায়।

এ পর্যায়ে দারোয়ানদ্বয় চূড়ান্ত প্রভাবিত হয় আমার গলার স্বরে; আমাকে খানিকটা দ্বিধা নিয়ে প্রশ্ন করে- আপনার মৃত্যু হয় কিভাবে? আমি বলি, আমার মৃত্যু হয়নি তো; ইংরেজরা যখন ১৮১৪ সালে এই দালান ওলন্দাজদের থেকে কিনে নেয়, আমি তখনো ছিলাম এখানে, আমাকে ইংরেজরা চাকরীতে বহাল রাখে। কিন্তু আমি কিছুকাল পর নীলচাষীদের উপর ইংরেজ নীলকরদের করা অত্যাচার সইতে পারিনা। তখন এই দালানের নীচের ঘরগুলোতে নীল চাষে অবাধ্য কৃষকদের বন্দি করে ইংরেজরা চামড়া মোড়ানো বেতের লাঠি দিয়ে পিটাতো। আমি প্রতিবাদ করি। প্রতিবাদ করায় ও নীলকরদের বিরোধিতা করায় আমার বিরুদ্ধে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। একপর্যায়ে আমাকে এ শহর ছেড়ে যেতে হয়। পরে শুনেছি ১৮৩৫ সালে এখানে এক কলেরা মহামারীতে মুল কুঠিয়ালসহ সব কর্মকর্তা মারা যায়; ধস নামে তাদের ব্যবসায়; পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে এই কুঠিবাড়ি।

প্রাচীন দারোয়ান, যে একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে, আমাকে জানায়, “জ্বী, আমরা শুনেছি ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এই দালান বেসামরিক সরবরাহ বিভাগের গুদামঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে ভাইস চ্যান্সেলরের বাসভবন ও কার্যালয় এখানে স্থাপন করা হয়”। এরপর নবীন যে দারোয়ান, যে আমাকে প্রথমে ঢুকতে দিতে চায়নি দালানে, প্রশ্ন করে কণ্ঠে অসহায়ত্ব নিয়ে- আপনি নীলচাষীদের জন্য কিছু করতে পারলেন না? ঠেকাতে পারলেন না বাংলার উপর ইংরেজদের শোষণ? আমি এ প্রশ্ন শুনে ঘাবড়াই না, উত্তরে বলি – বাংলায় কর্মরত ওলন্দাজ বনিক ও কর্মকর্তাদের রাজ্যজয়ে তেমন উৎসাহ ছিলো না যেমন ছিল ইংরেজ ও ফরাসীরা। তাই ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি যখন মীরজাফরকে সাথে করে বাংলা দখলের ষড়যন্ত্র করে, ওলন্দাজরা দর্শকের ভূমিকা পালন করে। কিন্তু পলাশীর যুদ্ধের পর বছরখানিক পর তারা বুঝতে পারে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি তাদেরও ঘাড় মটকাবে, তাই চেষ্টা করে টিকে থাকতে। কিন্তু ততদিনে ইংরেজরা তাদের সামরিক শক্তি বাড়িয়ে নেয়। ১৭৫৯ সালের ২০ নভেম্বর ইংরেজরা যখন বরানগরের ওলন্দাজ বাণিজ্যকুঠি দখল করে এবং চন্দননগর ও চুঁচুড়ার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত বদেরা এলাকাতে এক যুদ্ধে ওলন্দাজদের পরাজিত করে তখনই আসলে ইতিহাস লেখা হয়ে যায় যে ইংরেজরা হতে যাচ্ছে এ অঞ্চলের এক মাত্র শাসক। তবে সেই সময় লন্ডনস্থ কর্তৃপক্ষ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানিকে নিষেধ করে ওলন্দাজদের প্রতি কঠোর হতে কারন ইংরেজ কর্মকর্তারা ওলন্দাজদের হুন্ডি কিনে দেশে টাকা পাঠাত। আমি ক্ষুদ্র মানুষ, আমার করবার কিছু ছিল না।

দারোয়ানদ্বয় আমাকে এবার উপরের তলায় যেতে দেয়, আমি যে ঘরে বসে কাজ করতাম, সে ঘরে যাই, চেয়ার দেয়া আছে, বসি। জানালা দিয়ে তাকাই, আগে এখান থেকে নদী দেখা যেত, এখন দেখি শুধু মাঠ, চর উঠে তাতে ঘাস জন্মে গেছে। আমি হতাশ চোখে দারোয়ানদ্বয়ের দিকে তাকাই, ওরা বলে – ফারাক্কা। আমি বুঝে নেই বাকীটা। আমি সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামি, গুদামঘর দেখি যেখানে রাখা হতো রেশম আর বারুদ। দেখি রক্তের কাল দাগ। কিছু জিজ্ঞেস করি না।

আমার মনে হতে থাকে যে দারোয়ানদ্বয়কে বুঝাতে পেরেছি আমার হৃদয়ের আর্তি কিন্তু আজ সকালে ফের বড়কুঠিতে এলে ওরা আমাকে ঢুকতে দেয় না; বলে কর্তৃপক্ষের নিষেধ আছে। আমি বলি এই শেষবার। পাঁচ মিনিট মাত্র। ওরা কঠোর। আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছি, ওদের মন গলে না।

Most Popular

To Top