ইতিহাস

“চিটাগাং” নামটা থাকলে ক্ষতি কি?

"চিটাগাং" নামটা থাকলে ক্ষতি কি?- নিয়ন আলোয়

ঘাঁটাঘাঁটি করে যতটুকু জানলাম, দশম ও একাদশ শতকে দক্ষিণ পূর্ববঙ্গে ও আরাকানে চন্দ্র রাজারা ছিল চট্টগ্রামের শাসক। আরাকানের চন্দ্রবংশীয় রাজা সু‌-লা‌-তাইং-সন্দয়া ৯৫৩ সালে বাংলা অভিযানে বের হন, কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে নাকি তিনি চট্টগ্রাম অতিক্রম না করে সীতাকুণ্ডে একটা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন, এর শিলালিপিতে লেখা হয় “চেৎ‌-ত-গৌঙ্গ” যার অর্থ হলো ‘যুদ্ধ করা অনুচিৎ’

জানি না বাবা কার কি মতি! তাঁর কেনই বা মনে হলো এ জায়গা শান্তির, এখানে যুদ্ধ করাটা উচিৎ না, যুদ্ধ করার জায়গা এই প্রিয় ভূমিটা না! আরাকানী পুঁথি থেকে জানা যায়, এরপর থেকে এই এলাকার নাম হয় “চেত্তগৌং”; কালক্রমে চেত্তগৌং থেকেই নাকি ‘চিটাগাং’, ‘চট্টগ্রাম’, ‘চাটগাঁ’ নামগুলোর উৎপত্তি।

কোন নামটি কার আগে এসেছে, সেটা নিশ্চিৎ করে বলা মুশকিল। ‘চট্টগ্রাম’ শব্দটা যেমন আমাদের প্রতিটা শ্বাসে মিশে আছে, ‘চিটাগাং’ শব্দটাও আমাদের রক্তে রক্তে যেন মিশে গেছে। এটা কোনো টস না যে ছুঁড়ে মেরে একটা নামকে রেখে আরেকটা মুছে দিবো!

বরং কিছু ক্ষেত্রে আমি বলবো ‘চিটাগাং’ শব্দটা আমাদের কাছে কিছুটা বেশি ব্যবহৃত, কিঞ্চিৎ হৃদয়ের কাছের শব্দ। আমরা গর্ব করে নিজেদের পরিচয় দিতে গিয়ে নিজেদের ‘সিটাইঙ্গে’, ‘চিটাইঙ্গে’, তথা ‘চিটাইংয়ে’ মানে ‘চিটাগাংয়ে’ বলে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি! কখনো কেউ চিটাগংয়ে ভাষায় নিজেরে ‘চট্টগ্রাইম্যে’ বলে পরিচয় দিয়েছে বলে অন্তত আমার মনে পড়েনা। জ্বী হ্যাঁ, এই নামটা এতটা কাছের!

হঠাৎ করে এমন কি সামঞ্জস্যতা বিধান করা জরুরী হলো আমি জানিনা! আমার জানা মতে আমার দেশের ভাষা এতটাও নিরেটভাবে কাঠিন্যে আবৃত না। কেন বাংলা ইংরেজিতে এতটাই সামঞ্জস্য আনতে হবে ব্যাপারটা আমার বোধগম্য হলো না। এমন হলে তো ইংরেজিতে Table আর বাংলায় লেখা ‘টেবিল’ এর মতো অসংখ্য পারিভাষিক শব্দ এ বাংলার রাজকীয় শব্দভান্ডারে স্থান করে নিতো না…কখনো নিতো না!

এই সিদ্ধান্তে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ভৌগলিক, অর্থনৈতিক সবকিছুতেই প্রভাব পড়বে। শুধুমাত্র চিটাগাং বন্দরের নাম পরিবর্তন বাবদেই কত কোটি টাকা যে কর্ণফুলীতে গিয়ে পড়বে তার হিসেবটা জানা সম্ভব না!

আজ থেকে এতবছর আগে Dacca থেকে Dhaka হলো, এখনো অনেক নিউজে, ওয়েদার ফরকাস্টে এখনো ঢাকাকে Dacca লিখতে দেখি। আজ এতবছরেও হয়নি, পারেনি তারা, তারা যেন মেনে নেয়নি Dacca আজ Dhaka হয়েছে। আর তারা কিনা আমাদের চিটাগাংকে ‘ছাটাগ্রাম’ উচ্চারণ করবে? এ কেমন সিদ্ধান্ত আমি বুঝিনা।

ইউনিফিকেশনের দরকার, তবে সেটা এতটাও না! দূরে যেতে হবেনা, ‘মায়ানমার’ নামে বার্মাকে যতজন না বলে তার চাইতেও বেশি রিপোর্টে তাকে ‘বার্মা’ বলে সম্বোধন করে। ‘রেঙ্গুন’ যবে ‘ইয়াঙ্গুন’ হলো, নামের অসামঞ্জস্যতা তত বাড়লো। একটা প্রতিষ্ঠিত ব্যাপারে তাই যত ইতিবাচক পরিবর্তনই আনা হোকনা কেন, সেটা কখনোই খুব ভালো ফল আনে না। ভারতের ‘মুম্বাইকে’ এখনো তো ‘বম্বে’ বলেও ডাকে, তাতে ক্ষতি কি? আরে চায়নার অনেক জায়গাকে ইংরেজিতে একভাবে লিখলেও স্থানীয়রা অন্য নামেই তাকে ডাকে। এমন আরো অনেক ভুরিভুরি উদাহরণ আছে! কই? ওদের তো এত সামঞ্জস্যতার দরকার পড়েনি! এক নামই হতে হবে, এ ক্যামন কথা? দেশে এতকাজ পড়ে থাকতে এসব কেন? সরকারকে তুমি সমর্থন করতে পারো, তবে নিজের রুট ভুলে এখানেও সমর্থন জুগালে সেটা সমর্থন না, অনেকাংশে দালালি হয়ে বসবে! সমর্থন আর দালালি ভিন্ন বিষয়। সরকার ফেরেশতা না যে ভুল সিদ্ধান্ত নিবেনা। ভুল সিদ্ধান্ত আসাটাও স্বাভাবিক! ভালো চাইলে দাঁড়িকমা সব সমর্থন না করে গঠনমূলক সমালোচনাটাও করতে হয়…করতে জানতে হয়।

সবকিছুর বাংলা ইংরেজি তাহলে কেনই বা এক হতে হবে? সবকিছুকে অভ্রর পাতায় এত বিচ্ছিরিভাবে, অদ্ভুতভাবে কেন টেনে আনতে হবে? এটা তো শুধু একটা পরিবর্তন না, শতসহস্র পরিবর্তনের সূচনা এটা। আমার মনে হয়না মানুষ এতটাও পরিবর্তন প্রিয়! অন্তত আমার পক্ষে কখনো আমার ভার্সিটিকে ‘চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ার এন্ড টেকনোলজি’ হিসেবে মেনে নিতে কষ্ট হবে…অনেকটা অসম্ভবই হবে!

আরে ভাই, যে নামটার অর্থটাও যুদ্ধ করতে নিষেধ করে, সেখানে সেই নামটা নিয়েই হঠাৎ কেন এত যুদ্ধ?

লিখেছেনঃ সাদেকুল করিম

চিটাগাং-এর ঐতিহ্য মেজবান সম্পর্কে জানতে পড়ুনঃ মেজ্জান হাইবেন না?

আরো পড়ুনঃ শুধুমাত্র চিটাইঙ্গারাই কি চায়ে বিস্কুট চুবিয়ে খায়?

Most Popular

To Top