নিসর্গ

চন্দ্রগ্রস্ত রাত… এবং একটি জুমঘর! (১ম পর্ব)

আমিয়াখুম নিয়ন আলোয় neon aloy

সময়টা ২০১৪ সাল। ২০১২ সালের পর অনেকদিন আর পাহাড়ে যাওয়া হয় না। কোরবানির ঈদে মোটামুটি সপ্তাহখানেকের বন্ধ। বন্ধুদের অলরেডি একটা বড় গ্রুপ তখন সাকা হাফং (দেশের আনঅফিসিয়াল সবচেয়ে উঁচু পিক) ট্রিপে। বড় বন্ধ হলেই গত কয়েকবছরে আমাদের সবার প্রধান গন্তব্যস্থল হয়ে দাড়িয়েছে পাহাড় তথা বান্দরবান। আর পাহাড়ে যেতে হলে সময় নিয়েই যেতে হয়। আমি চাকরি আর পরিবার নিয়ে এতো বিজি হয়ে গেছি যে বন্ধুদেেরকে দেখলে একটু আফসোস হয় বইকি। অনেকদিন পরে পাহাড়ে যাবার লোভ তাই সামলাতে পারছিলাম না। রক্তিম অফারটা দিয়েছে। দলে বাকি কারা আছে আর খোঁজ নেইনি অতো। যাবার দিন দেখা হবে সবার সাথে।

এবারের ট্রিপ মূলত দুটো জলপ্রপাত দেখা। নাফাখুমের নাম অনেকবার শুনেছি। কিন্তু এটার আপস্ট্রিমে আরো বড়.. আমিয়াখুম। এ দুটো একবারে দেখে আসা। সময় লাগবে ৪ থেকে ৫ দিন। পুরো প্ল্যানটা রক্তিমের মাথায়। ট্যুরের দিন সকালে কোতোয়ালির মোড়ে বাকি দুজন সদস্যের সাথে দেখা। অনিক আর ধ্রুব। এরা রক্তিমের পরিচিত। আমার সাথে প্রথম দেখা। সদস্য মোটে ৪ জন। যেকোন ট্যুরে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়, নতুন কেউ না কেউ থাকেই। আমি এখন পর্যন্ত এমন কোন গ্রুপ পাইনি যাদের সাথে দুটো ট্যুর করেছি। হয় কেউ বাদ পড়বে বা নতুন যোগ হবে। তবে আমি একটু অবাক হচ্ছিলাম। এতো ছোট গ্রুপে এর আগে পাহাড়ে যাইনি কখনো। ছোট গ্রুপের সুবিধা যে কতটা সেটা যথাস্থানে বলবো!

আমিয়াখুম নিয়ন আলোয় neon aloy

আমাদের ছোট অভিযাত্রী দল…

সকালে বান্দরবান পৌঁঁছে হালকা নাশতা সেরেই থানচির বাসে। বান্দরবান থেকে যে তিনটা উপজেলার সরাসরি রোড কানেক্টিভিটি আছে তার মধ্যে এটাই সবচাইতে দূরে। বাকি দুটো রুমা আর রোয়াংছড়ি। রুমা আমি বেশ কয়েকবার গেছি। যারা কেউক্রাডং বা বগালেকের দিকে যায় তাদের ওদিকে যেতে হবে। থানচিতে এবার প্রথম যাওযা। থানচি যেতে বেশ সময় লাগে। প্রায় ৪ ঘন্টা। প্রায় শেষদিকে বলিপাড়া একটা জায়গাতে ব্রেক দেয়। দেন আবার রওনা। থানচি পৌঁছতে প্রায় বিকেল। এখন মুভ করা যাবে না আমরা যেদিকে যেতে চাই ওদিকে। আজ রাতটা থানচিতেই থাকবো। এখন হলো কিভাবে সুন্দরভাবে পুরো ট্রিপটা করে আসা যায় তার প্ল্যানিং। অনেকভাবেই ট্রীপটা করা যায়, তবে আমাদের মূল কথা হলো যত কম সময়ে পারা যায় আমরা দুটোই কভার করবো। প্ল্যানটা মোটামুটি এরকম- আমরা পরদিন দ্যেতং পাড়া নামের একটা ত্রিপুরা পাড়ায় থাকবো, তার পরদিন আমিয়াখুম যাবো। এর পরে ওখান থেকে ব্যাক করবো বা নিচের দিকে নামবো। আসার পথে নাফাখুম পড়বে। এভাবে ট্যুর প্ল্যান সাজানোর কারণ আমিয়াখুমের কাছাকাছি একটা পাড়া হলো এই দ্যেতং পাড়া।

দ্যেতং পাড়ার কার্বারিদার (প্রতিটা পাহাড়ি পাড়াতে একজন প্রধান থাকেন, কার্বারি উনাকেই বলে সবাই) ছেলে জেমস রক্তিমের বেশ পরিচিত। থানচি বাজারেই আবার কারবারিদার মেয়ে থাকেন স্বামীসহ। শচীনদা উনার নাম। শচীনদাই আমাদের বোট ম্যানেজ করে দিলেন পরদিন ভোরে যাবার জন্য। থানচিতে থাকার জন্য একটা হোটেল পেয়েছিলাম আমরা পাহাড়ের উপরে। ওখানে ব্যাগ রেখে বাজারে বসে আড্ডা দিচ্ছি আমরা। পরদিন ভোরে দ্যেতং পাড়া থেকেই একজন আসবেন উনার ব্যক্তিগত কাজে থানচি বাজারে, উনিই আমাদের গাইড হিসেবে নিয়ে যাবেন পাড়ায়। গাইড ছাড়া থানচি বাজার থেকে আপস্ট্রিমে আপনি যেতেই পারবেন না। এটাই এখানকার নিয়ম!

আমিয়াখুম নিয়ন আলোয় neon aloy

ঝিরির মাঝে জোঁকের স্বর্গরাজ্যে আমরা, সাথে গাইড দাদার ছোট্ট মেয়েটি।

অক্টোবর মাস তখন। বৃষ্টির সময়। ঝর্ণা দেখতে অবশ্য এরকম সময়েই যাওয়া উচিত। খুব বেশি বর্ষায় এসব জায়গাতে  যেতে কলিজার জোর দরকার অবশ্য। এখন অতোটা বৃষ্টির সময় না। তারপরেও আমরা লাইফ জ্যাকেট নিয়ে নিযেছি থানচি বাজার থেকে। পাহাড়ে চড়ার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো জুতা! প্লাস্টিকের বা রবারের জুতা বেশ কাজের। কারণ পাহাড়ি রাস্তায় একবার ঝিরিতে নামতে হয় আবার পাহাড়ে চড়া আবার নামা এভাবেই চলা লাগে।

থানচি বাজারের পাশেই বেশ বড় ব্রিজ। রাতে অনেকক্ষণ আড্ডা দিয়ে ঘুমাতে প্রায় ৩ টা বেজে গেছে। আমরা আসলে ঠিক কোথায় যাচ্ছি কারোরই ধারণা নেই। পরদিন ভোরে উঠে খাওয়ার পর যখন বোটে উঠছি কেমন অদ্ভুত ফিলিংস হচ্ছিলো। লম্বা লম্বা রো টাইপ বোট এগুলো। সাথে একটা পিচ্চি মেয়েও আছে দেখি। ওটা গাইড দাদার মেয়ে। উনার নাম ভুলে গেছি। থানচি থেকে আপস্ট্রিমে বোটে যাবো। অল্প কতদূর যাবার পরেই নেমে গেলাম আমরা। পদ্মঝিরি জায়গাটার নাম। এর আরো আপস্ট্রীমে তিন্দু, তারপর রেমাক্রি বাজার। আমরা পদ্মঝিরি দিয়ে শর্টকাটে দ্যেতং পাড়া চলে যাবো। ও জায়গাটাতে বসে আমরা ৪ দিনের খাবার সবার ব্যাগে নিয়ে নিয়েছি। যেখানে যাচ্ছি ওখানে আদৌ খাবার কি পাবো ধারণা নাই প্লাস পাহাড়ে তেল, মশলা এসবের যোগান থাকে না বেশি। তাই আমরা চিটাগং থাকে আসার সময়ই কিসমিস, তেল, মশলা, নুডলস, চকোলেট, বিস্কিট মোটামুটি যতটা পারা যায় নিয়ে নিয়েছি। আমার পুরো ব্যাকপ্যাক ভর্তি দুটো টেন্ট, আর লাইফ জ্যাকেট। কাপড়চোপড় রাখার জায়গা নাই আর! রক্তিমের হাতে স্পেশাল কিছু… ৪ টা ফানুস। আসল কথাটা বলা হয়নি এতোক্ষণ… আমাদের মূল টার্গেট আমিয়াখুমের ধারে ক্যাম্প করা আর মাঝরাত্তিরে ফানুস উড়ানো!

ওই দাদার সাথে দেখা হলো। উনার সাথে পরিচয় হবার পর কেমন নির্ভার লাগছে। কথা বলতে বলতে এগোচ্ছি আমরা। কিছুদূর হাঁটার পর পদ্মঝিরির দেখা পেলাম। বিশাল উঁচু এক পাহাড় থেকে পানি পড়ছে। পানিতে গা না ভেজালে কেমনে কি। আমরা বাঁদরের মতন লাফটাফ দিয়ে এক পাথরের উপর উঠে গেছি। জায়গাটা বেশ পিচ্ছিল, একটু হড়কালে হাত-পা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া অস্বাভাবিক না। তবে বরফঠান্ডা পানিতে দাঁড়িয়ে থাকার সুখ অন্যরকম একদম!

এক পাহাড়ে উঠি, আবার নামি, আবার চড়াই, আবার নামা… মাঝে বেশ কয়েকবার ঝিরি পার হওয়া। পাড়ায় পৌঁছতে প্রায় সন্ধ্যা তখন। মাঝে কয়েকজায়গায় জোঁকের যন্ত্রণায় পুরা কাহিল। মোটা জিন্স প্যান্টের ভেতরে কিভাবে জোঁক কামড়াতে পারে সেটা একটা রহস্য! জোঁক জিনিসটা আমি একদমই সহ্য করতে পারিনা। একটা জায়গায় নামার সময় পায়ে দেখি রংবেরং কালারের এক জোঁক। এটাকে ভালোমতোন চিনি। এটাকে টাইগার জোঁক নামেই ডাকে সবাই। দেখতে সুন্দর, কিন্তু ভয়ানক জাতের এটা। আমি জোঁক ছাড়াচ্ছি আর দাঁত-মুখ খিঁচে পাহাড়ের গুস্টি উদ্ধার করছি। পাহাড়ি দাদার মেয়েটা আমাকে দেখে হাসতে হাসতে শেষ। আমি ওকে জিজ্ঞেস করি “তোমারে জোঁকে ধরেনাই?”, সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে কোন উত্তর না দিয়ে। পরে বুঝলাম ও আসলে বাংলা ভাষাটা বোঝে না। তবে ওটা কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার না। ওর মাতৃভাষাটাই ও ভালোমতোন জানুক। পরে প্রয়োজন হলে নিশ্চয় বাংলা শিখে নেবে।

পরের পর্বঃ চন্দ্রগ্রস্ত রাত… এবং একটি জুমঘর! (২য় পর্ব)

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top