নিসর্গ

চন্দ্রগ্রস্ত রাত… এবং একটি জুমঘর! (৩য় পর্ব)

আমিয়াখুম নিয়ন আলোয় neon aloy

চন্দ্রগ্রস্ত রাত… এবং একটি জুমঘর! (১ম পর্ব)

চন্দ্রগ্রস্ত রাত… এবং একটি জুমঘর! (২য় পর্ব)

আমাদের তখন পুরো পাগল অবস্থা। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। আলো বেশি নেই। কিন্তু ক্যামেরাও নেই আমাদের কাছে। ওটা অনিকের কাছে। ওরা পেছনের ভেলাতে এসেছে আরো প্রায় ঘন্টাখানেক পরে। আমরা ছাড়া ওখানে কেউ নেই আর। ট্রাইপড লাগিয়ে ক্যামেরা অন করতেই বিধিবাম। আর অন হয়না ক্যামেরা। বৃষ্টির পানি ঢুকে গেছে ব্যাটারিতে। পুরো ট্যুরে ওই জিনিস আর চালুই হলো না (দুঃখের ইমোটিকন হবে)!

কারবারিদাও চলে এসছেন পাহাড়ি পথ ধরে। এবার টেন্ট পিচ করতে হবে রাতে থাকার জন্য। আমি আর রক্তিম অনেকক্ষণ আগে এসেছি এখানে। কিন্তু টেন্ট পিচ করার মতন কোন জায়গা নেই। টেন্টের চারকোণা মাটিতে পুঁততে হয়, কিন্তু এখানে সব পাথর। তারপরেও দরকার লাগলে ব্যবস্থা করা যেতো কিন্তু কারবারিদা বললেন ওই যে পাশে জুমঘর আছে, ওটাতে থাকা যাবে। জুমঘরটা আগেই চোখে পড়েছে। জুমঘরে গিয়ে দেখা যায় পুরো ঘরে সব ধান আর ধান। আমাদের সরাসরি মাচানের উপর শুতে হবে। সে যাই হোক এখানে ঘুমাতে না পারলেও সোজা নিচে পাথরের চাতালের উপরেও শুয়ে থাকা যাবে। এতো অসাধারণ জায়গায় এসে ঘুম, ক্ষুধা এসব আজেবাজে জিনিস নিয়ে ভাবার সময়ই নাই আমাদের!

রাত ৮ টা মতন বাজে। শরীর খুব টায়ার্ড। পূর্ণিমার চাঁদটা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। তখন ফুল মুন। ফানুস উড়ানোর জন্য পারফেক্ট টাইম! ফানুস উড়াতে গিয়ে দেখা যায় তিন চারকোণা ছিঁড়ে গেছে। রক্তিম খুব ধৈর্যসহকারে এ ফানুসগুলো এতদূর বাঁচিয়ে এনেছে। পাহাড়ি ছেলেগুলোর মাথায় বুদ্ধি চরম। ভাত রান্না হচ্ছিলো। সেই ভাত আঠার মতন লাগিয়ে ফানুসের ছিদ্র বন্ধ করা হলো এবং মজার ব্যাপার এটা উড়েও গেছে ঝর্ণার উপর দিয়ে কি সুন্দরভাবে!

আমি মাচানে শুয়ে আছি। পাশে কারবারিদাও। অনিক নিচে চাঁতালের উপর বসে আছে। পিটার পাড়া থেকে আসার সময়েই জাল নিয়ে এসছে খুমের মাছ ধরবে। ওরা সবাই চলে গেছে মাছ ধরতে। এখন ভরা পূর্ণিমা। অনেক মাছ নাকি পাবার কথা। সাথে রক্তিম আর ধ্রুবও আছে। কারবারিদা আমাকে বলছেন ‘ আমিয়াখুম’ নামকরণের ইতিহাস। ত্রিপুরাভাষায় আমিয়া বা মিয়া শব্দের অর্থ জেলখানা। আর খুম মানে গর্ত। এটার মানে হলো মাছের জেলখানা। অর্থাৎ এটার মধ্যে মাছ পড়লে আর উঠতে পারে না। তাই এ নাম। আরো অনেক কিছু বললেন। ওনাদের বিয়ের সিস্টেম সম্পর্কে। উনার নিজের বিয়ে নিয়ে। কারবারিদা ব্যাপক মজার মানুষ।  জলপ্রপাতটার গঠন মোটামুটি বুঝে গেছি আমি। অনেকটা পানি এসে ফানেলের মতন একটা জায়গা দিয়ে পড়ছে। পড়ার পরেই সামনে বেশ বড় কিছু পাথরের দেয়ালে বাধা পেয়ে পানিটা স্টিল ওয়াটারের মতন হয়ে গেছে যেটার উপর দিয়ে আমরা ভেলায় চড়ে আসলাম।

মাচানের উপর শুয়ে থাকতেই ভালো লাগছে। মেঘ একবার এসে পুরো জায়গাটা কেমন ঘোলা  করে দেয় আবার পরিস্কার হয়ে যায়। চাঁদের আলো পড়ছে ঝর্ণার পানির উপরে। আমার মনে হচ্ছিলো পুরোপুরি আজগুবি কোন জায়গাতে চলে এসেছি আমরা। স্বপ্নের মতন কোন রাত যদি থাকে সেটা এরকমই হওয়া উচিত!

আমিয়াখুম নিয়ন আলোয় neon aloy

ছেলেগুলো মাছ ধরে এনেছে অনেক। প্রায় ৪ থেকে ৫ কেজি মতন। কি কি জাতের মাছ কিছুই চিনলাম না আমরা। মাছগুলো দেখতেও সুন্দর। অনেকক্ষণ প্রকৃতি উপভোগ করার পর আর পারা যাচ্ছে না। খেতেই হবে! ছেলেগুলো মাছ একটু কেটেকুঁটে রান্না শুরু করে দিয়েছে। সবাই মাচানের উপর শুয়ে-বসে রিলাক্স করছি। রাত ১১টার দিকে রান্না হয়ে গেছে সব। জুমের ভাত আর মাছের তরকারি। জীবনে অনেক জাতের মাছ খেয়েছি। তবে এ মাছগুলোর স্বাদ একেবারে অন্যরকম। আমি শুধু খুমের মাছ খাওয়ার জন্য হলেও আরেকবার যেতে চাই ওখানে! মাছ আছেও অনেক, সবাই খেয়েছে মনমতোই। ওদের খাবার আরেকটা স্টাইল হলো মাছের ময়লাগুলো তেল মরিচ দিয়ে সেদ্ধ করে বাঁশের চোঙ্গার মধ্যে খাওয়া। কারবারিদা খেয়েছিলেন এটা বেশি। রাত ১টার দিকে ঘুমে আর পারা যাচ্ছে না। মেঘ পাহাড় ঝর্না.. সব মিলিয়ে ঠান্ডায় একেবারে কাহিল। আমরা যখন শহর থেকে রওনা দেই চিন্তাও করিনি এখানে এতো ঠান্ডা পড়বে। তাই শীতের কোনকিছু আনা হয়নি। মাঝে চিন্তা করেছি লাইফজ্যাকেট গায়ে জড়িয়ে ঘুমাই থাকি কিন্তু সেগুলাও ভিজে চুপচুপে। পাতলা এক বেডশিটই তাই ভরসা!

রাত ২ টার দিকে কারবারিদার সিভিয়ার ডায়রিয়া শুরু হলো। মাছের ওগুলো খেয়েই মনে হয়। আমি, ধ্রুব আর অনিক ঘুমে পড়ে যাচ্ছি। ডাক্তার হতে গেলে শারীরিক এবং মানসিক ব্যাপক স্ট্যামিনা থাকা উচিত কিনা জানি না… রক্তিম সারারাত কার্বারিদার ট্রিটমেন্ট করেছে। আমাদের সাথে ওষুধ তেমন কিছু ছিলো না। যা ছিলো রক্তিমের কাছেই আছে। ভোরের দিকে শীতে পুরা জবুথবু দশা। চোখ খুলে তাকিয়ে কুয়াশায় পুরো ঢাকা। পুরো জায়গাতে শুধু ঝর্ণার পানি পড়ার শব্দ। রক্তিম সারারাত ঘুমায়নি। ছেলেটার এনার্জি চোখে পড়ার মতন। ওর শরীরে বাড়তি কোন এনজাইম বা প্রোটিন আছে কিনা তা জানি না।

ভোরের দিকে পাহাড়ি ছেলেগুলো আবার মাছ ধরতে চলে গেছে। নিয়েও এসেছে তবে আগের থেকে কম। ওগুলো ভেজে আবার ভাতও রান্না করে ফেলেছে। এদের যত দেখি তত অবাক হই। ধ্রুব আর অনিক চেষ্টা করছে কোনভাবে ক্যামেরা অন করা যায় কিনা। রাতেই ব্যাটারি খুলে শুকাতে দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু ওইটা আর অন হবার নামই নিচ্ছে না। সকাল ৮ টার দিকে সবাই উঠে গেছি। রক্তিমের ওঠার কোন ব্যাপার নাই। সে ঘুমায়ইনি। আমরা সবাই জুমঘরের মাচানের নিচে বসে আছি রোদ থেকে বাঁচার জন্য। মাছ ভাজা খেতে খেতে প্ল্যানিং চলছে আর কি করা যায়। তার মাঝে মুরগি কতগুলা এসে আমাদের ডিস্টার্ব দিচ্ছে। আজ আমরা এর আরো আপস্ট্রিমে যাবো। কার্বারিদা বলেছে এর উপরে এটার মতন আরো জায়গা আছে। দেখা যাক কতদূর যেতে পারি আমরা! কিন্তু যেখানেই যাই দুপুরের মধ্যে ব্যাক করবো এখানে তারপর অন্যপথে নেমে যাবো এ জায়গা থেকে। কারবারিদার শরীর বেশ খারাপ। উনাকে পাড়াতে ব্যাক করতে হবে। উনি একা পারবে না তাই বেণু আর পিটার আমাদের সাথে রয়ে গেছে, বাকিজন কার্বারিদাকে নিয়ে পাড়ার দিকে চলে গেছেন।

পরের পর্বঃ চন্দ্রগ্রস্ত রাত… এবং একটি জুমঘর! (৪র্থ পর্ব)

Most Popular

To Top