নিসর্গ

চন্দ্রগ্রস্ত রাত… এবং একটি জুমঘর! (২য় পর্ব)

আমিয়াখুম নিয়ন আলোয় neon aloy

আগের পর্বঃ চন্দ্রগ্রস্ত রাত… এবং একটি জুমঘর! (১ম পর্ব)

পাড়ায় পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় রাত ৮ টা তখন। আমরা যথেস্ট রিলাক্স টাইপ পাবলিক সবাই। অতো তাড়াহুড়া করে আসিনি। একটা জায়গায় বসছি তো কতক্ষণ আরাম না করে উঠি না! এজন্যই এতো দেরি। পাড়ায় ঢোকার আগে হাত পা ফ্রেশ করছি একটা ঝিরির মতোন জায়গায়। ওরা একটা প্লাস্টেকর নল লাগিয়ে দিয়েছে দূরের কোন ঝর্ণা থেকে। ওখান থেকে কি সুন্দর পানি আসছে! এতোক্ষণ হাঁটার পর ত্যক্তবিরক্ত হয়ে আমি জিন্স খুলে ফেলেছি। পরনে শুধু শর্টস আর উপরে গেন্জি পরা। আমাকে ওই অবস্থায় তারা যে কি ভেবেছিলো একমাত্র উপরওয়ালাই জানে!

পাহাড়ি ঢালে দ্যেতং পাড়াটা। এটার পাশেই আরো উঁচু দ্যেতং পাহাড়। বেশ উচুঁতেই আছি আমরা… মেঘ দেখে বুঝলাম। কার্বারিদার বাড়িতেই রাতে থাকবো। এতোক্ষণ হাঁটার পর ক্ষিদায় মনে হচ্ছে ঘাস লতাপাতা খাওয়া শুরু করি! নুডলসের প্যাকেট বের করে অনিক এর মধ্যেই রান্নাঘরে বসে আছে কবে একটু খাবে! সে রীতিমতো রান্না শুরু করে দিয়েছে এমন। ওয়ান টাইম প্লেটে ম্যাগি নুডলসগুলোতে একটু গরম পানি দিয়েই খাওযা শুরু করে দিয়েছি। কাঁচাও মনে হয় খাওয়া যায়! সে গল্প পরে বলবো।

খেয়ে বাইরে বের হয়ে গেছি। বাইরে চাঁদ উঠে গেছে। তবে কুয়াশায় ঢাকা। রক্তিম বলে ফানুস উড়াতে হবে। এ ছেলেটা কোন অবস্থাতেই বিরক্ত হয়না… আজব ক্যারেক্টার! যাই হোক, ফানুস উড়ানোর সময় পাড়ার পিচ্চিগুলো সব বের হয়ে এসেছে… ওরা এটার নাম দিয়েছে রকেট। এ পাড়াতে সাধারণত তেমন ট্যুরিস্ট আসে না। আমরা এসেছি বলে মোটামুটি সরগরম হয়ে গেছে পুরো পাড়া। ফানুস উড়ে যাচ্ছে আর পিচ্চিগুলাও চিৎকার শুরু করেছে। কোন কিছু উদযাপন করার জন্য এর থেকে ভালোকিছু হতেই পারেনা মনে হয়!

আমিয়াখুম নিয়ন আলোয় neon aloy

দ্যেতং পাড়ায় ফানুস উড়ানো

কার্বারিদার বিশাল পরিবার। এরমধ্যেই আমাদের মধ্যে বেশ খাতির জমে গেছে। রাতের মেন্যুতে মূলত দেশি মোরগ। তেল, মশলা আমরা নিয়ে এসেছি। তবে এটাকে পাহাড়ি মোরগ বলাটা সবচাইতে যুক্তিযুক্ত, হাড়গুলা প্রায় স্টিলের মতোন। তার উপর ভালো সিদ্ধ হয়নি কিনা জানিনা, মাংসও চিবুতে পারছিনা। উনারাও খেতে বসেছিলেন। আরেকটা খাবার ছিলো শামুক। রক্তিম আর ধ্রুব কিভাবে পটাপট দুই তিনটা মুখে নিয়ে খেয়ে ফেললো বুঝলাম না। আমি একটা মুখে নিয়েছি আর কেমন একটা গন্ধ… খাবারের পুরো ১২টা বেজে গেছে আমার। বমি হয়নি এটাই বেশি!

পুরো প্ল্যানটা সেট এখন। এখান থেকেই মূলত ট্যুরটা শুরু আমাদের। আমরা পরদিন ভোরে রওনা দিবো। সামনের পাহাড়ের মাথায় উঠে তারপর নামা। আমরা ৪ জন। আমাদের পোর্টার লাগবে এ ট্যুরে। কারণ কিছু স্পেশাল ব্যাপার আছে সামনে। সাধারণত যেকোন পাহাড়ি পথে একজন গাইডই যথেস্ট। কার্বারিদাও যাবেন আমাদের সাথে। সাথে আরো তিনজন। মোট ৮ জন পরদিন ভোরে রওনা দিলুম। সামনের পাহাড় ডিঙ্গাতেই মাথা খারাপ অবস্থা আমাদের। পাহাড় চুড়া থেকে নিচের পাড়াটাকে অসাধারণ সুন্দর লাগে। আসলে পাড়াটা সবদিকে এ বড় পাহাড়টা দিয়ে ঘেরাও। অনেক পাড়া দেখেছি, কিন্তু এটার পজিশনিং একদমই অন্যরকম। পাড়াটা মূলত আগে এ পাহাড়ের উপরেই ছিলো। পরে শিফট হয়েছে মূলত জলের সোর্সের কারণে। এই বড় পাহাড়ের কাছে জলের সোর্স নাকি তেমন নেই।

পাহাড়চুড়ায় উঠে রেস্ট নিচ্ছি। উপরে জুমঘরের মতন সুন্দর ঘর আছে। এখন শুধু নামতে হবে। কার্বারিদা মজার সব গল্প করছেন। গাইড ছেলেগুলোর নাম বলা হয়নি; বেণু, পিটার আর আরেকজনের নাম ভুলে গেছি। বেণু আর পিটার ট্যুরের শেষঅব্দি ছিলো আমাদের সাথে। এবার নামা শুরু। এবং শুরুতেই ঝামেলা। এ বছর এদিকে জুম হয়নি। তারমানে ঘনঝোপ। কিন্তু আমাদের নামতেই হবে। কারবারিদা পেছনে ছিলেন। একদম সামনে পিটার, বেণু দা দিয়ে সমানে ঝোপ কাটছে আর আমরা জাস্ট মাথা নিচু করে ফাঁক গলে বের হচ্ছি। কাঁটাগাছে হাত পা ছিলে যাচ্ছে তবে দেখার টাইম নাই। এটা যে কিরকম প্যাথেটিক অবস্থা চিন্তা করাটা কঠিন। মাঝে মনে হচ্ছে পাশে খাদ আছে। এর থেকে ভালো ঝাপ দেই। একটাসময় পর ঝোপ শেষ। এরপর সামনে একদম উন্মুক্ত। খাড়া পাহাড় বেয়ে নামতে হবে আমাদের। সচরাচর যেমন পাহাড় এর থেকে বেশি খাড়া এ পথটা। দুপাশেই খাদ। একটু পা হড়কালে আর দেখা লাগবে না সোজা ২ হাজার ফুট নিচে! যাই হোক, সুন্দর জিনিস দেখতে রিস্ক নিতেই হয়।

পাহাড়ি পথে উঠার থেকে নামাটা তুলনামূলক রিস্কি। গ্রাভিটি ব্যাপারটা সবসময় সুবিধার না! আমরা কোন রিস্ক নিলাম না। দাঁড়িয়ে নামতে গেলে ব্যালান্স পাচ্ছি না, তাই বসে নামতে লাগলাম। জিন্স প্যান্ট প্রেফার করি আমি এই একটামাত্র কারণে, নরমাল প্যান্ট যেকোনসময় ফেঁসে যেতে পারে! নামা মানে শুধুই নামা। প্রায় ২ ঘন্টা মত শুধু নামতেই লেগেছে আমাদের। অনেকটা নামার পর আমরা পানির শব্দ পাচ্ছি। বেণু, পিটার ওরা অনেক আগেই নেমে গেছে ঝিরিতে। আমি সবার আগে ছিলাম, শেষের দিকে বিরক্ত হয়ে মোটামুটি দৌড়েই নেমেছিলাম। তবে এমনটা করা ঠিক হয়নি। আমার পেছনে ছিলো ধ্রুব।অনিকের নামতে বেশ কস্ট হচ্ছিলো, রক্তিম ওর পেছনে ধীরে ধীরে নামছিলো। সবার পেছনে ছিলো কার্বারিদা। উনি চাইলে অনেক আগে যেতে পারতেন। তবে মূলত উনি পেছনে ছিলেন যেকোন সমস্যার সাপোর্ট করার জন্য। ঝিরিতে পৌঁছেই মনটা খুশি হয়ে গেছে। জায়গাটা অনেক বড়। উপর থেকে পানি নেমে আসছে বড় বড় পাথরের ফাঁক দিয়ে। বেশ অনেকক্ষণ রেস্ট নিয়ে আমরা আবার চলা শুরু করেছি। এবার যেতে হবে ঝিরির আপস্ট্রিম ধরে।

আমিয়াখুম নিয়ন আলোয় neon aloy

বিশ্রামের এক ফাঁকে

আমরা ঝিরিটা আড়াআড়িভাবে পার হলাম। এরপর হাঁটা। বড় বড় সব পাথরের চিপা দিয়ে, নিচ দিয়ে, উপর দিয়ে- মানে যেভাবে যাওয়া যায়। ঝিরিটা বেশ কবার পার হতে হয়। জায়গাগুলো এতো অসাধারণ আমার মনে হচ্ছে জুরাসিক যুগ টাইপ কোন জায়গায় চলে গেছি। এভাবে প্রায় ঘন্টাখানেক পরে একটা জায়গায় পৌঁছলাম। বিশাল উচুঁ পাথরের দেয়াল দিয়ে পুরোটা ঢাকা। এখান থেকে হেঁটে যাবার কোন সুযোগ নাই আর। বাঁশের ভেলা বানিয়ে যেতে হবে। ওখানে ছোট চরের মতন আছে। ক্ষুধায় কাহিল অবস্থা সবার। কার্বারিদা দ্রুত আগুন জ্বালিয়ে ফেলেছে। আমরা পাড়া থেকে আসার সময় ডেকচি, থালাবাসন অনেককিছু নিয়ে এসছি। আর ওয়ান টাইম গ্লাস, প্লেট তো নিয়েই গেছি শহর থেকে। নুডলস খেতে খেতে একটু রেস্ট নিচ্ছি সবাই। পিটার খুব চালু ছেলে। ও বাকি দুজনকে নিয়ে প্রায় ২০ টার মতন বাঁশ কেটে এনেছে। ওগুলো সব পাহাড়ি লতা, দড়ি দিয়ে বেঁধে ওই পয়েন্টে নিয়ে এসছে। স্ট্যামিনা যে কি জিনিস এটা এদেরকে না দেখলে কল্পনা করা কঠিন।

আমিয়াখুম নিয়ন আলোয় neon aloy

সেই বিখ্যাত ভেলা!

আমিয়াখুম নিয়ন আলোয় neon aloy

ভেলা থেকে তোলা ছবি…

এবার ট্যুরের সবচাইতে ইন্টারেস্টিং পার্ট শুরু। ভেলায় চড়ে যেতে হবে। ভেলায় তিনজনের বেশি উঠা যায় না আবার কোমর সমান ডুবে থাকে পানিতে। তখন বিকেল ৪টার উপর বাজে। সন্ধ্যার আগে পৌঁছানো দরকার। সময় বাঁচানোর জন্য ঠিক হলো কার্বারিদা আর আরেকজন পাহাড়ের উপর দিয়ে চলে যাবে। ওটা আমাদের পক্ষে সম্ভবপর না। আমরা বাকি ৬ জন এভাবে যাবো। ধ্রুব আর রক্তিম প্রথমে রওনা দিলো। ধ্রুব চেষ্টা করছিলো ভেলায় যাবার সময়টা ভিডিও করবে। কিন্তু বিধিবাম। বৃষ্টি শুরু হয়েছে চরমভাবে। সাথে সাথে DSLR পলিথিনে ঢুকিয়ে নেয়া হল। কিন্তু ভেলাটা কিছুদূর যাবার পর মনে হয় ঠিকমতোন ব্যালান্স হচ্ছিলো না। আবার এসে গেছে ওরা। নতুন করে ভেলাটা শক্তপোক্ত করে বাঁধা হলো। এবার আমি আর রক্তিম রওনা দিলাম। থ্রিল জিনিসটা কি একটু একটু করে ফিল হচ্ছে এবার। কোমর সমান ডুবানো পানিতে। বেশি নড়াচড়া যায় না। খুমের পানিতে তেমন স্রোত নেই, তবু আমরা স্রোতের বিপরীতেই যাচ্ছি। আর পানির গভীরতা ৪০ থোকে ৫০ ফিটের কম না। আমি, রক্তিম আর পিটার ভেলাতে, বেণু পানিতে সাতার কেঁটে পেছনে আসছে। আমি আর রক্তিম পৌঁছে যাবার পর ওরা আবার ওদেরকে নিয়ে আসবে। একবার আসা যাওয়াতে ১ ঘন্টা মিনিমাম লাগে। ট্যুরের শুরুতে বলেছিলাম সদস্যসংখ্যা কম হবার সুবিধা। আমরা মাত্র ৪ জন। আরো বেশি থাকলে রাত ৮ থেকে ৯ টা বেজে যেতো এই ভেলা পারাপারেই! রক্তিম আর আমি পৌঁছে গেছি। বেশ কয়েকটা পাথর ডিঙ্গিয়ে উঠে গেছি এক পাথরের চাতালের উপরে।ঝর্নাটা একদম সামনেই আমাদের… আমিয়াখুম!

পরের পর্বঃ চন্দ্রগ্রস্ত রাত… এবং একটি জুমঘর! (৩য় পর্ব)

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top