টুকিটাকি

মানুষের পক্ষে কি সবই সম্ভব?

মানুষের পক্ষে কি সবই সম্ভব?

মানুষের অসাধ্য কিছু নাই- কথাটা আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। আসলেই কি তাই? “চেষ্টায় সবই পাওয়া যায়” ব্যাপারটা কি সর্বাংশে সত্য? মানুষ এই পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান এবং সামর্থ্যবান প্রাণী, কিছুকাল আগেও কল্পনার অতীত ছিল এমন অনেক কিছু মানুষ আজ ডাল-ভাত বানিয়ে ছেড়েছে, তারপরও যদি প্রশ্ন ওঠে- মানুষের পক্ষে কি সবই সম্ভব?

মানবজাতির সামর্থ্যের প্রশ্নে একটু আঘাত দিচ্ছি। প্রযুক্তির যত উন্নতি সাধনই হোক না কেন, মানুষের পক্ষে একটা কাজ কখনই সম্ভব নয়, তা হল মহাবিশ্বের শেষপ্রান্তে পৌঁছানো। যত দ্রুতগতির মহাকাশযানই হোক, ওয়ার্মহোল বা হাইপারডাইভ যার সাহায্যই নেয়া হোক, এই ব্যাপারে গিয়ে মানুষের একটু ঠেকতেই হবে, আর এর জন্য দায়ী এক ভয়ঙ্কর কালো শক্তি, যার নাম ডার্ক এনার্জি!

এই কালো শক্তির ব্যাপারটা আপাতত মূলতবী রাখি। মহাবিশ্বের শেষপ্রান্তে যাওয়ার আগে একটু মহাবিশ্বের বিশালতা সম্পর্কে ধারণা নেয়ার চেষ্টা করি?

মিল্কিওয়ে, এন্ড্রোমিডা এবং আরও প্রায় ৫০টি বামন গ্যালাক্সী নিয়ে গঠিত আমাদের নিকটতম যে এলাকা, তাকে বলা হয় “লোকাল গ্রুপ”। এই লোকাল গ্রুপের ব্যাস ১০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ। অর্থাৎ, আলোর গতিতে ১০মিলিয়ন বছর ভ্রমণ করলে যতটুকু দূরত্ব অতিক্রম করা যাবে, ততটুকু এর ব্যাস।

“লেনিওকিয়া সুপারক্লাস্টার” নামে গ্যালাক্সীদের একটা গ্রুপ আছে, বিশাল একটা গ্রুপ। আমাদের লোকাল গ্রুপের মত একশটিরও বেশি গ্যালাক্সী গ্রুপ নিয়ে এই সুপারক্লাস্টার গ্রুপটি গঠিত।

আবার এমন কয়েক মিলিয়ন সুপারক্লাস্টার গ্রুপ নিয়ে গঠিত অবজার্ভেবল ইউনিভার্স (Observable Unverse)। অবজার্ভেবল ইউনিভার্স হল একটা গোলকাকৃতির এলাকা, যার মধ্যের সকল বস্তু পৃথিবী থেকে দেখা যায় (খালি চোখে না অবশ্যই!)। অবজার্ভেবল ইউনিভার্সে কমপক্ষে ২ ট্রিলিয়ন গ্যালাক্সী রয়েছে। আমাদের লোকাল গ্রুপ হচ্ছে অবজার্ভেবল ইউনিভার্সের মাত্র ০.০০০০০০০০০০১% !

একটু আন্দাজ করা যাচ্ছে কি, মহাবিশ্বটা আসলে কত বড়?
আন্দাজ করা কি সম্ভব আদৌ?

মানুষ যদি সুদূর ভবিষ্যতে অতি-অতি আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে লোকাল গ্রুপ অতিক্রম করেও ফেলে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে কোথাও গিয়ে পৌঁছানো তার পক্ষে সম্ভব হবে না, সে শুধু শূন্য থেকে আরও শূন্যের ভেতর দিয়ে যেতে থাকবে। কেন? এবার আসা যায় ডার্ক এনার্জির কথায়।

বিগ ব্যাং এর পর টাইম-স্পেস প্রচণ্ড গতিতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল, অর্থাৎ মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ঘটতে শুরু করল। পরস্পরের মধ্যে মহাকর্ষ বলের কারণে একটা সময় পরে মহাজাগতিক বস্তুগুলোর গতি কমার কথা ছিল, কমতে কমতে একসময় সংকোচন শুরু হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, ছড়িয়ে পড়ার গতি কমার বদলে কোন এক রহস্যময় কারণে বেড়ে চলেছ। ব্যাপারটা অনেকটা এমন- একটা বল শূন্যে ছুঁড়ে দেয়ার পর সেটা একসময় নিচে নেমে আসার বদলে আরও উপরে উঠে যাচ্ছে, তার উপর সময়ের সাথে গতিও যাচ্ছে বেড়ে!

মহাবিশ্বের সাথে অনেকটা এমনটাই হচ্ছে। লোকাল গ্রুপের বাইরে যে গ্যালাক্সী, ক্লাস্টার বা সুপারক্লাস্টার আছে, তারা লোকাল গ্রুপ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। দূরে সরে যাওয়ার গতিও সময়ের সাথে বাড়ছে। অর্থাৎ, মহাকর্ষ বলের বিপক্ষে কিছু একটা কাজ করছে। সেই “কিছু একটা” যে কী তা এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা নির্ণয় করতে পারেননি। তবে একটা কাজ করেছেন, ব্যাপারটার একটা সুন্দর নাম দিয়ে রেখেছেন- ডার্ক এনার্জি। এই এনার্জি সম্পর্কে আমরা কিছু জানিনা বলেই এর নাম ডার্ক এনার্জি।

ডার্ক এনার্জির বিষয়টি বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও অস্পষ্ট। ধারণা করা হয়, এটি শূন্যস্থানের একটি বৈশিষ্ট্য। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ যত বাড়ছে, তত বাড়ছে শূন্যস্থানের পরিমাণ, তত বাড়ছে ডার্ক এনার্জি। ফলে বাড়ছে সম্প্রসারণের গতি। ধারণাটা অনেকটা এরকম, সম্প্রসারণের ফলেই বাড়ছে সম্প্রসারণ!

তবে লোকাল গ্রুপের ভেতরে কিন্তু তা ঘটছে না, এর ভেতরে মহাকর্ষ বলের কার্যকারীতার কারণে গ্যালাক্সীগুলো একে অপরকে আকর্ষণ করছে, ফলে লোকাল গ্রুপটি সময়ের সাথে ছোট হয়ে আসছে। একটা সময় আসবে যখন পুরো লোকাল গ্রুপ মিলে একটি অতি-দানবীয় উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সীতে পরিণত হবে, যার নাম “মিল্কড্রোমিডা” (মিল্কিওয়ে+এন্ড্রোমিডা)। মিল্কড্রোমিডার অধিবাসী হতে চাইলে আপনাকে আর মাত্র কয়েক বিলিয়ন বছর অপেক্ষা করতে হবে।

ভবিষ্যত মিল্কড্রোমিডাবাসীর মহাকাশ-সম্পর্কিত ধারণা কিন্তু আমাদের মত হবে না। আমরা আমাদের অবজার্ভেশন থেকে অনেক “ঘাপলা”র অস্তিত্ব পেয়েছি, পরে সেই ঘাপলা সম্পর্কে খোঁজখবর করতে গিয়ে অনেক গুপ্তকথা বের হয়ে এসেছে। ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জির ধারণা, বিগ ব্যাং থিওরী এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সুযোগটাই অনেকটা সীমিত হয়ে আসবে মিল্কড্রোমিডাবাসীদের জন্য, কারণ এই সুপারগ্যালাক্সীর বাইরে যা কিছু আছে সবই একসময় তাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাবে। এদের থেকে প্রতিফলিত আলো মিল্কড্রোমিডায় আসতে আসতে এত দুর্বল হয়ে পড়বে যে সেটা গ্রহণ করা শ্রেষ্ঠতম প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েও সম্ভব হবে না। বাইরের বিশ্ব থেকে কোন তথ্য আসবে না সেই দুনিয়ায়। তাদের বিশ্বের বাইরেও যে কিছু একটা আছে, তা জানার একমাত্র উপায় হবে অতীতের পুঁথিপত্র। মহাবিশ্বের বাকী অংশ থেকে মিল্কড্রোমিডা হয়ে পড়বে বিচ্ছিন্ন। পুরো মহাবিশ্বে মিল্কড্রোমিডা হবে একা একটা অস্তিত্ব।

সামর্থ্যকে ছাড়িয়ে যাওয়া বলতে একটা কথা আছে। আশা করি, মানুষ একসময় কথাটা প্রমাণ করবে, সম্ভব-অসম্ভবের সংজ্ঞা পাল্টে পৌঁছে যাবে সৃষ্টির শেষপ্রান্তে ।

Most Popular

To Top