ক্ষমতা

মুসলমান মানেই জঙ্গী নয়…

ইমদাদুল রাশিদী নিয়ন আলোয় neon aloy

মুসলমান মানেই কি জঙ্গী? ইসলাম মানেই কি সন্ত্রাসবাদ? একেকজন হয়তো এ প্রশ্নের একেক রকম উত্তর দিবেন। কেউ হয়তো দিবেন মাওলানা আজিজের উদাহরণ, যার কট্টোরপন্থী মতবাদ ধ্বংস করে দিচ্ছে একটি গোটা দেশকে। আবার হয়তো কেউ উদাহরণ দিবেন রইস উদ্দিন ভুঁইয়ার, যার মহানুভবতার সবটুকু উৎসরিত হয়েছে ইসলামের হাত ধরেই। তবে সেই সাথে মাথায় রাখতে হবে পশ্চিমা মিডিয়াগুলোর দ্বিচারিতার কথাও। যেখানে কোন অপরাধের সাথে মুসলমানের নাম পাওয়া গেলে কোন তদন্তের আগেই ধরে নেওয়া হয় পুরো ঘটনাটি সন্ত্রাসবাদীদের করা; কিন্তু একই অপরাধ কোন শ্বেতাঙ্গ খ্রিষ্ঠান অপরাধীর হাতে সংঘটিত হলে টিভি চ্যানেলগুলো তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি হিসেবে।

আর এ কারণেই হয়তো বিগত দুই দশকে বিশ্বজুড়ে “মুসলমান” শব্দটার প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে “টেররিস্ট”, “মিলিশিয়া” ইত্যাদি। তবে এই “সুখ্যাতি” অর্জনের পিছনে ওসামা বিন লাদেন কিংবা আবু বকর আল বাগদাদী থেকে শুরু করে আমাদের স্বদেশী হোলি আর্টিজানে হামলাকারী জঙ্গী নিবরাসদের ভূমিকাও কম না! তবে এত এত ওসামা বিন লাদেনের ভীড়েও কিছু মানুষ আজও বিলিয়ে বেড়াচ্ছেন শান্তির ধর্ম ইসলামের বাণী, নিজের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে! আর এরকম একজন মানুষেরই কথা জানাচ্ছি আজকে।

গত ২৫ মার্চ এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মুখোমুখি হয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলবাসী। কিন্তু এর থেকেও বড় আরেকটি দাঙ্গাকে শান্তির বাণী প্রচারের মাধ্যমে থামিয়ে দেন ইমাম মাওলানা ইমদাদুল রাশিদী।

আসানসোলের রেল পাড়া এলাকায় গেল মঙ্গলবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় গুম হয়ে যায় সিবতুল্লা রাশিদী নামক একটি বালক, যে কিনা এ বছরের দশম শ্রেণীর বোর্ড পরীক্ষার্থী। ঘন্টাখানিক বাদে ছেলেটিকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। রবিবার থেকে শুরু হওয়া রাম নবনী দাঙ্গার চতুর্থ শিকার সিবতুল্লা। আসানসোল জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা ইমদাদুল রাশিদী এই ছেলেটির পিতা। গত বৃহস্পতিবার নিজের ছেলেকে দাফন করার পর এক সভার সভাপতিত্ব করেন এবং শান্তির আহ্বান করেন। এ সময় ক্ষোভে ফুঁসছিলো হাজারখানেকেরও বেশি বিক্ষুব্ধ মুসলমান। তাদের উদ্দেশ্যে রাখা বক্তব্যে মাওলানা ইমদাদুল রাশিদী বলেন-

“যদি আমার পুত্রের মৃত্যুর জন্য কোনও প্রতিশোধ নেওয়া হয়, তবে আমি এই মসজিদ আর শহর ছেড়ে চলে যাব।”

আসানসোলের রেল পাড়ের এলাকায় সোমবার সন্ধ্যায় সংঘর্ষের পর মঙ্গলবার দুপুরে তার দশম শ্রেণীর বোর্ড পরীক্ষার জন্য হাজির হয়েছিলেন সিবতুল্লা রশিদী। বিভিন্ন তথ্য মতে জানা যায়, তিনি একটি ভিড়ের মাঝে গুম হয়ে গিয়েছিলেন। বুধবার রাতে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয় এবং বৃহস্পতিবার সে লাশ শনাক্ত করা হয়। সন্দেহ করা হচ্ছে আঘাতের ফলে তার মৃত্যু ঘটে।
মাওলানা রাশিদী দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন-

“আমার পুত্র যখন ঘর থেকে বের হয়েছিলো তখন দাঙ্গার শুরু হয়। এক দল দুর্বৃত্ত তাকে তুলে নিয়ে যায়। আমার বড় ছেলে এ ব্যাপারে পুলিশকে জানায়, কিন্তু পুলিশ তাকে অপেক্ষা করতে বলে। আমরা পরবর্তীতে জানতে পারি পুলিশ একটি মৃতদেহ উদ্ধার করেছে এবং সকালে নিশ্চিত হই যে যে এটি সিবতুল্লা’র মৃতদেহ।”

সিবতুল্লাকে কবর দেয়ার পর সন্ধ্যার দিকে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয় ঈদগাহে। ছাটেলাডাঙ্গা জামে মসজিদের ইমাম রাশিদী তাদের উদ্দেশ্যে বলেন,

“আমি শান্তি চাই। আমার পুত্রকে আমি হারিয়েছি। আমি চাই না আর কারো পরিবার তার প্রিয়জনকে হারাক। চাই না কোনও বাড়ি আগুনে পুড়ুক। আমি জনসমাবেশে পূর্বেই বলেছি আমি আসানসোল ছেড়ে চলে যাবো যদি আমার পূত্রকে নিয়ে একটিও প্রতিবাদের আওয়াজ উঠে। তোমরা যদি আমাকে ভালোবাসো, তবে এ নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলবে না।
আমি ত্রিশ বছর এ জাগায় বাস করছি। এটি আমার দায়িত্ব যে মানুষের কাছে সত্যের আর শান্তির বাণী প্রচার করা। আমাকে আমার শোক কাটিয়ে উঠতে দাও। আসানসোলের মানুষ খারাপ না। এটি একটি চক্রান্ত।”

আসানসোলের মেয়র জিতেন্দ্র তিওয়ারি বলেন-

“ইমাম প্রশাসনকে সহায়তা করেছেন এবং কোন প্রকার বিশৃঙ্খলা করতে তরুণ সমাজকে বারণ করেছেন। আমরা সত্যি তাকে নিয়ে গর্বিত।”

আসানসোলের ২৫ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নাসিম আনসারী বলেন-

“আমরা আসলে পুত্রহারা এক পিতার নিকট এ ব্যবহার কখনই আশা করিনি। এটি শুধু বাঙালিদের জন্য নয়, বরং পুরো দেশবাসীর নিকট একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে। জনগণ তার কথা শুনে কেঁদে ফেলেছে। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। আমি শুধু বিস্মিত হয়ে শুনেছি। মৃতদেহ পাওয়ার পর তরুণ সমাজ যে পরিমাণ রাগান্বিত হয়েছিলো, তা তার শান্তির বাণীর কাছে হার মেনে গেলো। তিনি আসানসোলের একজন প্রিয়মুখ। তিনি শান্তির বাণী প্রচার না করলে আজ পুরো আসানসোল জুড়ে আগুন লাগতো।”

বলা হয়ে থাকে, পিতার কাঁধে সবচাইতে ভারী বোঝা তার পুত্রের মরদেহ। পৃথিবীর সবচাইতে ভারী বোঝা কাঁধে নিয়ে মহানুভবতার যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ইমাম মাওলানা ইমদাদুল রাশিদী, সে দৃষ্টান্ত কি হাজারো কট্টোরপন্থীর কোলাহলে হারিয়ে যাবে, নাকি সহনশীলতার শিক্ষা দিবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে উপমহাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষদের- সেটা হয়তো সময়ই বলে দিবে!

Most Popular

To Top