নাগরিক কথা

বিল-মিলিন্ডা ফাউন্ডেশনঃ জনসেবা নাকি ব্যবসা?

বিল-মিলিন্ডা ফাউন্ডেশনঃ জনসেবা নাকি ব্যবসা? Neonaloy

২০০৯ সালে ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের কয়েকটি আবাসিক বিদ্যালয়ে একদিন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসে ঘোষণা দিল যে, আগামীকাল নয় থেকে পনের বছর বয়সী ছাত্রীদেরকে বিনামূল্যে প্যাপিলোমা ভাইরাসের ভ্যাকসিন দেওয়া হবে সবাই যেন উপস্থিত থাকে। স্বনামধন্য “মার্ক” ফারমাসিউটিক্যাল কোম্পানির তৈরি “গারডাসিল” নামের এই ভ্যাকসিনটি ভারতের রাজ্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে তিন বার দেওয়া হবে এবং তাদেরকে এক বছর পর্যবেক্ষণ করা হবে।

সেই জেলার প্রায় ষোল হাজার মেয়ে শিশুকে এই ভ্যাকসিনটি দেওয়া হয়।
কয়েকমাস পরে ভ্যাকসিন পাওয়া এই ছাত্রীদের মধ্যে অনেকেই পেটে ব্যাথা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা, জ্বর, খিঁচুনিসহ নানা উপসর্গ নিয়ে স্থানীয় সরকারি হাসপাতাল গুলোতে ভর্তি হতে থাকে। পরবর্তীতে এসব মেয়েদের মধ্যে পাঁচজন ২০১০ সালে মারা যায়।

অপরদিকে পাশের রাজ্য গুজরাটের ভাদাদোরা এলাকাতেও এমন দুটি মৃত্যুর খবর জানা যায়। সেখানে স্কুল পড়ুয়া প্রায় চৌদ্দ হাজার মেয়েকে বিনামূল্যে প্যাপিলোমা ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছিল, পার্থক্য শুধু এই যে সেখানে গ্ল্যাক্সোস্মিথকাইন কোম্পানির “সারভারিক্স” ভ্যাকসিন ব্যবহার করা হয়।

পৃথিবীর আরেক প্রান্ত কলম্বিয়াতেও তখন তেলেঙ্গানা রাজ্যের  মতো বিনামুল্যে প্রাপ্ত “গারডাসিল” ভ্যাকসিনের কারণে মেয়েদের মৃত্যু নিয়ে হইচই লেগেছে।

এই ঘটনা তদন্তের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে একটা কমিটি গঠন করা হয় এবং সেই কমিটি তদন্ত শুরু করে দেয় এ বিষয়ে।
তখন জানা যায় যে, এই ভ্যাক্সিনেশন কর্মসূচীটা ছিল ওই প্যাপিলোমা ভাইরাসের ভ্যাক্সিনের জন্য একটা গবেষণামূলক কর্মসূচী। কোনো গবেষণামূলক কর্মসূচী চালানোর আগে অবশ্যই যার উপর এ কাজটা করা হচ্ছে তার কাছ থেকে বা তার অভিভাবকদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নিতে হয়, কিন্তু এক্ষেত্রে তার কিছুই করা হয়নি। তদন্তকারী কমিটি দেখতে পায় যে যতজনকে এই ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে তাদের অর্ধেকেরও বেশি ছাত্রীর নামে কোনো “কনসেন্ট ফর্ম” বা অনুমতিপত্র নেই। আর যাদের নামে কনসেন্ট ফর্ম আছে সেখানে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে তাদের অশিক্ষিত অভিভাবকদের কাছে যারা নূন্যতম নিজের নামটাও স্বাক্ষর করতে পারেনা বলে টিপসই দিয়েছে কাগজে।

অপঘাতে মৃত্যু ঘটার কারণে যে মামলা হয়েছিল সেখানে তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলে যে, এই মেয়েদের মৃত্যুর কারণ ভ্যাকসিনেশন নয়, মেয়েরা কেউ পানিতে ডুবে মারা গেছে কিংবা ভাইরাল জ্বরে, আত্মহত্যা করে মারা গিয়েছে, একটা মেয়ের ক্ষেত্রে আবার কোনো ময়নাতদন্ত না করেই লিখে দেওয়া হয়েছে যে সে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে মারা গিয়েছে।

এরপরে কেঁচো খুড়তে বেড়িয়ে আসে সাপ, জানা যায় যে “প্রোগ্রাম ফর এপ্রোপ্রিয়েট টেকনোলজি” বা “পাথ” নামের একটা আমেরিকান এনজিও এই কর্মসূচী চালাচ্ছে আর তাদেরকে এ কাজে সহায়তা করছে বিল গেটসের দাতব্য সংস্থা “বিল গেটস এন্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন”।

আদালতে কয়েকটি সমাজসেবী সংগঠন এই বিষয়ে তদন্ত চালানোর জন্য মামলা করলেও কোনো এক অদৃশ্য কারণে মামলার ফলাফল ধামাচাপা দেওয়া হয় এবং এখনো ভারতে “প্রোগ্রাম ফর এপ্রোপ্রিয়েট টেকনোলজি” কাজ করে বেড়াচ্ছে।
এগুলো কিন্তু কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, এসব এনজিওগুলো সহ আরো নানা রকম স্বাস্থ্য সংস্থা আছে যারা এমন কাজ করে যাচ্ছে গোপনে।
এদের মধ্যে দু’একটা ঘটনা হঠাৎ করে প্রকাশ পেয়ে যায় এবং আমরা জানতে পারি, কিন্তু সেগুলো আবার হারিয়ে যায়।

বর্তমানে বিশ্বে যে ব্যক্তিগত দাতব্য প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্য খাতে কাজ করছে সেটির নাম হচ্ছে “বিল গেটস এন্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন”। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাতেও তারাই অনুদান দেওয়া একক সংস্থাগুলোর মধ্যে সব থেকে বেশি অনুদান দাতার পদ ধরে রেখেছে।

কিন্তু বাস্তবে চিত্রটা কি তেমনই?
মাইক্রোসফট নিয়ে একচেটিয়া ব্যবসা করার পরে যখন মাইক্রোসফট কোম্পানির নামে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গুঞ্জন উঠে তখন বিল গেটসের ভাবমূর্তি অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তখন বিল গেটস মাইক্রোসফট কোম্পানির সিইও হিসেবে নিজেকে রেখে দিয়ে মনোযোগ দেন বিল গেটস ফাউন্ডেশন নামে দাতব্য প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে কাজ করায়।
নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে বিল গেটসের এই দাতব্য প্রতিষ্ঠানের কাজ শুরু হয় নিম্নোক্ত উদ্দ্যেশ্য নিয়েঃ

“Our Global Health Division aims to harness advances in science and technology to save lives in developing countries. We work with partners to deliver proven tools—including vaccines, drugs, and diagnostics—as well as discover pathbreaking new solutions that are affordable and reliable. Equally important is innovation in how we bring health interventions to those who need them most. We invest heavily in vaccines to prevent infectious diseases—including HIV, polio, and malaria—and support the development of integrated health solutions for family planning, nutrition, and maternal and child health.”

কিন্তু এসব অঙ্গীকারগুলো সত্যিকার অর্থেই বিল গেটস ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমে কখনোই প্রতিফলিত হয়নি।
আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে বিলগেটস এবং মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম স্বচ্ছ না হলেও প্রভাবশালী পত্র-পত্রিকাগুলো এ সম্পর্কে কখনোই তেমন সমালোচনা করেনা কিংবা প্রতিবেদনও ছাপায় না।
শুধুমাত্র বিভিন্ন গবেষক এবং ব্যক্তিগত অনুসন্ধানীরাই এ সম্পর্কে সোচ্চার এবং সবক্ষেত্রে তাদের মতামত প্রকাশ করে আসছেন।

বিল গেটস ফাউন্ডেশন বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সমালোচকদের আপত্তি রয়েছে,তবে এদের মধ্যে প্রধান সমস্যাগুলো হলঃ

১) গেটস ফাউন্ডেশনের সমস্ত কার্যক্রমের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার রয়েছে শুধুমাত্র বিল গেটস এবং মেলিন্ডা গেটসের, তবে কয়েকবছর আগে ফাউন্ডেশনে যোগ দেওয়া আরেক ধনকুবের ওয়ারেন বাফেটও এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারেন। এখন যেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করা হচ্ছে সেখানে এই দুইজন মানুষের ভূমিকা কেমন তা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন রয়ে যায়।

২) গেটস ফাউন্ডেশন ভ্যাকসিন আবিষ্কার বা টেকনোলজি সংক্রান্ত জিনিস নিয়ে যতটা আগ্রহী স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য নানা সামাজিক বিষয় নিয়ে কাজ করতে ততটা আগ্রহী নয় তারা। এবোলা ভাইরাসের সংক্রমণের পরে ভ্যাকসিন তৈরি করা হলেও সেটা নির্দিষ্ট জায়গায় পৌছানোর জন্য “সিস্টেমেটিক ওয়ে” তারা তৈরি করেনি। তাহলে কোটি কোটি ডলার খরচ করে এসব আবিষ্কারের কিইবা দরকার যদি সেগুলো সঠিক সময়ে মানুষের কাছে পৌছাতেই না পারে?

৩) বিভিন্ন ওষুধের “জেনেরিক পেটেন্ট” নিয়ে বিল গেটসের ফাউন্ডেশন নানা রকম আইনি ঝামেলা তৈরি করে রেখেছে। এর ফলে এক টাকার ওষুধ সাধারণ মানুষকে কিনে খেতে হচ্ছে দশ টাকা দিয়ে। ধরুন আমেরিকাতে একটা ওষুধ বানাতে যন্ত্রপাতি, শ্রমিক অন্যান্য সহ খরচ পড়ল দশ হাজার টাকা, অথচ বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে কম খরচে শ্রমিক এবং অন্যান্য উপকরণ পাওয়া যাওয়া। তাই এখানে সেই ওষুধ বানানো যাবে পাঁচ হাজার টাকায়। এতে গরিব মানুষদের হাতের নাগালে অনেক দামী ওষুধ কম খরচেই চলে আসবে এবং এতে বরং গেটস ফাউন্ডেশনের খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু বিল গেটস ফাউন্ডেশন এটা করতে ইচ্ছুক নয়, তারা কম খরচে ওষুধ দিতে নয় বরং নিজেদের হাতে ওষুধ বানানোর প্রযুক্তি রাখতে আগ্রহী।

৪) বিল গেটস ফাউন্ডেশনের নামে এটাই সবচেয়ে মারাত্মক অভিযোগ এবং এটার প্রমাণ অনেক ক্ষেত্রেই পাওয়া গিয়েছে। বিল গেটস ফাউন্ডেশন ভ্যাকসিনসহ বিভিন্ন ওষুধের চিকিৎসার জন্য তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোতে এই ভ্যাকসিন এবং ওষুধের গোপন “ট্রায়াল” করতে দেয়। অনেক সময় এসব গোপন গবেষণার অনুমতি দেওয়ার জন্য তারা স্থানীয় প্রশাসনকে বিভিন্ন অনৈতিক প্রলোভনও দেখিয়ে থাকে।

ইন্ডিয়ার তেলেঙ্গানা রাজ্যের ঘটনাটি এমন অজস্র ঘটনার মধ্যে অন্যতম, এছাড়া আফ্রিকা, কলম্বিয়া এবং মেক্সিকোসহ অন্যান্য গরিব বা অনুন্নত দেশগুলোতেও এসব গবেষণা করা হয় কোনো রকম “এথিকস” না মেনেই।

বিল গেটস এবং মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন স্বাস্থ্যখাতে পোলিও নির্মূলসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভালো অবদান রেখেছেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাদের সব কাজই আমরা ভালো বলে চালিয়ে যাব কিংবা সব কাজই খারাপ বলে যাব।
তবে কোনো একটা প্রতিষ্ঠানের হাতে যখন অর্থের জোরে সারা বিশ্বের স্বাস্থ্যখাত নিয়ে নিজের মনের মতো কাজ করার ক্ষমতা চলে আসে আর সেটা যাচাই বাছাই করার মতো তৃতীয় কোনো ব্যক্তি থাকেনা তখন মনে কিছু প্রশ্ন রয়েই যায়।
এক্ষেত্রে এন্ডি বাকেট এর ব্রিটেনের দি গার্ডিয়ান পত্রিকার শিরোনাম আমার খুবই মনে ধরেছে “বিল গেটসের বিশাল দাতব্য রাজত্ব কি বিশ্বকে উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে? নাকি তিনি নিজেকে তৃতীয় বিশ্বে গরীবের ঈশ্বর হিসেবে দেখাতে চাচ্ছেন?”

আরো পড়ুনঃ তুমি একটা নির্লজ্জ চোর বিল গেটস- স্টিভ জবস   

 

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top