নাগরিক কথা

আবেগের ব্যবসা

আবেগের ব্যবসা Neon Aloy

বাঙ্গালী আবেগপ্রবণ জাতি। আমরা যুক্তি তর্ক সব কিছুর উপরে আবেগকে প্রাধান্য দেই। বাঙ্গালীকে ধমক দিয়ে, শাসন করে যতটা না কাজ আদায় করা সম্ভব তার চেয়ে বেশি সম্ভব তার আবেগকে পুঁজি করে।

যেমন ধরুন, মিয়ানমারে গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গাদের পার্শ্ববর্তী অনেক দেশই আশ্রয় দিতে কার্পণ্য করেছে, কিন্তু বাংলাদেশে তারা আশ্রয় পেয়েছে উদারভাবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে খুব বেশি আবেগপ্রবণ। আশ্রয় নিতে আসা মানুষ গুলোর প্রতি রাষ্ট্রীয়ভাবে তিনিও পারছেন না কঠোর হতে।

আমাদের এই আবেগকে পুঁজি করে ঠকবাজির ব্যবসা করে যাচ্ছে অনেকে। কয়েকদিন আগে সন্ধ্যায় খিলগাঁও এর তালতলা এলাকায় বসে আছি। এই এলাকায় বেশকিছু ফুডকোর্ট বসে, এগুলোকে কেন্দ্র করে প্রতিদিনই অসংখ্য লোকের ভিড় জমে এখানে। সেখানটায় বসে একটা ফুডকোর্ট থেকে জুস অর্ডার করে গল্প করছিলাম সঙ্গীর সাথে। এসময় দুটি ছেলে ও একটি মেয়ে আসলো একটা বাক্স হাতে। বললো, পথশিশুদের জন্য সাহায্য চায়। দেখলাম আশাপাশের অনেকেই কোন প্রশ্ন না তুলে ৫ টাকা/ ১০ টাকা দিচ্ছেন। ছেলে মেয়েগুলোর পোশাক পরিপাটি ভদ্রগোছের। কথাবার্তাও মার্জিত, শিক্ষিত তা দেখেই বোঝা যায়। ওদের হাতে কিছু লিফলেটও ছিল, একটা চেয়ে নিলাম। সেখানে লেখা পথশিশুদের দুপুরের খাবার দেয় ওরা কয়েকজন মিলে, সংগঠনের একটা নামও আছে- গ্রীন ড্রীম। ওরা বললো, ‘আপু কি হেল্প করবেন? আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ি, পাশাপাশি পথশিশুদের নিয়ে কাজ করি’।

জানতে চাইলাম, হলে থাকো? তিনজনই হা সূচক মাথা নাড়ালো। কোন হলে? এবার চট করে তারা হলের নাম বলতে পারলো না। আমি সোজাসুজি ওদের চোখের দিকে তাকালাম, এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে না থেকে ওরা চলে গেল।

পেশা সাংবাদিকতা হওয়াতে হয়তো সব কিছুতেই প্রশ্ন তোলাটা একটা স্বভাব। এমনটা বলতেই পারেন। তবে, আমি বলবো, এটা বেশ কয়েকবার ধরা পড়েছে, যে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট চক্র গড়ে উঠেছে রাজধানীতে। ব্যস্ততম এলাকা গুলোতে এই চক্রগুলো কাজ চালায়, বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য প্রায় প্রতিটি দলেই একজন করে নারী সদস্য থাকে। এদের কাজের ধরন, পথশিশুদের জন্য সাহায্য, কোন শিক্ষার্থীর নাম করে তার চিকিৎসার জন্য টাকা তোলা। এসবই আবেগকে কেন্দ্র করে ব্যবসা।

পথশিশুদের প্রতি আমরা সহানুভূতিশীল, তেমনি কোন শিক্ষার্থী ক্যান্সারে ভুগছে, কিডনি ফেলিউর, তার বন্ধুরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে সাহায্য চাইছে- এমন দৃশ্যও অনেকের মনে আবেগ তৈরি করে। এই আবেগকে কাজে লাগায় এরা। বিনা মেধায়, বিনা পরিশ্রমে সহজেই টাকা উপার্জনের একটা পথ এই ব্যবসা।
এমন একটি চক্রকে ১৭ মার্চ রাজধানীর রূপসী বাংলা মোড় থেকে আটক করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক শিক্ষার্থী। পরে তাদের শাহবাগ থানায় সোপর্দ করা হয়।

আবার রাস্তা থেকে এতিমখানার জন্য, মসজিদের জন্য চাঁদা তোলার দৃশ্য চোখে পড়ে। আগে মৌখিকভাবে চাইলেই মানুষ টাকা দিয়ে দিতো, কিন্তু এখন তা আর দিতে চায় না বলে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে তারা হাতে রশিদ নিয়ে ঘোরে। এই রশিদ কি সত্যতার প্রমাণ দেয়? এমন রশিদ বই নীলক্ষেত থেকে অর্ডার দিলেই বানিয়ে দেয়, রেডিমেটও কিনতে পাওয়া যায়। বিভিন্ন সময়ে এমন ভুয়া কাজে টাকা তোলার জন্য অনেকেই গণধোলাই খান। এমন দৃশ্যও রাস্তায় মাঝে মাঝে চোখে পড়ে।

পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা সবাই এই দলে, বিষয়টা কিন্তু এমন নয়। অনেকেই এদের জন্য খুব আন্তরিক ও দায়িত্বশীলতার সাথে কাজ করছে। এই উদ্যোগে তরুণরাই এগিয়ে। এবং এসব সংগঠনের প্রায় সবারই ওয়েবসাইট আছে, বা অফিস আছে। তাই কোন সাহায্য করতে হলে, পথে ঘাটে কোন চক্রের হাতে নয় বরং স্ব-উদ্যোগে খোঁজ নিয়ে দায়িত্বশীল সংগঠনগুলোর হাতেই দেয়া উচিত। যেন সাহায্য প্রার্থীর কাছে ঠিকভাবে পৌঁছায়। আর এর চেয়ে ভালো উপায় হলো, আমরা সরাসরি একজন পথশিশুকে সাহায্য করতে পারি। তাদের দেখা সহজেই পাওয়া যায় রাজধানীতে। একবেলা খাবার কিংবা একটা পোশাক সরাসরি ওদের হাতেই তুলে দেয়া যায়।

আর আবেগকে পুঁজি করে যারা এই ব্যবসা করে তাদের শক্তভাবে প্রতিরোধ করা ও আইনের হাতে তুলে দেয়াটাই হবে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত।

 

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

Most Popular

To Top