টুকিটাকি

শোকের ধাপ

শোকের ধাপ Neon Aloy

প্রিয়জন চলে যাওয়ার দুঃখ বা কষ্ট শুধু তারাই বোঝে যাদের প্রিয়জন নেই। কেউ মারা গেলে আমরা সাধারণত হালকা দুএকটা শোকের কথা বলে শোক প্রকাশ করেই নিজের দায়িত্ব শেষ বলে মনে করি। এরপরে যে আরো কিছু থাকতে পারে বলে আমাদের জানা নেই।

দু’সপ্তাহ আগে আমার এক কাছের বন্ধুর বাবা মারা গেল। তো সবাই শুধু ফোন দিয়ে সান্তনা দিল। এরপর যে যার মতো কাজে চলে গেল। আসলেও কি এরকম হওয়া উচিৎ? আচ্ছা যার প্রিয়জন চলে গেল তার মনের মধ্যে কি চলে? সে কি ভাবে? আমরা কি কখনো এই ব্যাপারগুলো ভেবে দেখার চেষ্টা করেছি যে তার মধ্যে কি চলছে? আমরা শুধু দেখি যে তার মন খারাপ, আগের মতো কোন কিছুতে তেমন উৎসাহ নাই।

বিজ্ঞানীরা বলেন একজন ব্যক্তির প্রিয়জন হারানোর শোক কেটে উঠতে ৬-১৮ মাসের মতো সময় লাগে। অনেকে এই কম সময়ের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে আবার অনেকেই পারে না। অনেক গবেষকের নানা মতবাদ আছে যে, এই কঠিন সময়ে মানুষ কিছু ধাপের মধ্যে দিয়ে যায়। এই নিয়ে অনেক গবেষণা, অনেক রিসার্চ থাকলেও কুবলার রস মডেলকে সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক মনে মনে করা হয়।

এই মডেলের প্রথম ধারণা আসে এলিজাবেথ কুবলার রসের কাছ থেকে। এলিজাবেথ কুবলার রস ১৯৬৯ সালে তার বই “On Death and Dying”-  এ এই ব্যাপারে প্রথম লেখেন। শিকাগো ইউনিভার্সিটি মেডিকেল স্কুলের মৃত্যুপথযাত্রীদের নিয়ে তিনি এই বই লিখেন। তার মতে শোকের সময়ে প্রত্যেক ব্যক্তি ৫টি ধাপের মধ্যে দিয়ে যায়। এটি কুবলার রস মডেল নামে পরিচিত। আসুন জেনে নেওয়া যাক ধাপগুলো কি কি-

অস্বীকার করা- শোকের প্রথম ধাপ হল এটা। এই ধাপে মনে হয় যে যা হয়েছে সব মিথ্যা। এগুলা কিছুই সত্যি না। মৃত ব্যক্তি এখনো বেঁচে আছে। পুরো বিষয়টাকে অস্বীকার করা হয়। যা হচ্ছে তা সবই ভুল আর মিথ্যা। এগুলা কিছুই হয়নি। একটু পরেই হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। হয়তো সবার কোন ভুল হচ্ছে কিংবা হ্যালুসিনেশন হচ্ছে এরকমই মনে হয়।

রাগ- যখন মানুষ বুঝতে পারে যে যা হচ্ছে তা মিথ্যা নয় বরং সত্য তখনই মানুষ রেগে যায়। রেগে যায় এই ভেবে যে তার সাথেই কেন এটা হল? অন্য কেউ নয় কেন? তখন রাগ থাকে যে, অন্য সবার থেকে তাকে কেন আলাদা করে দেওয়া হল।

লেনদেন- শুনে অবাক লাগতে পারে যে শোকের সময় আবার লেনদেন হয় কি করে? কিন্তু এটা সেই ব্যবসায়িক লেনদেন না। বরং কেউ মারা গেলে প্রায়ই তাদের প্রিয়জনকে বলতে শোনা যায় যে, ঈশ্বর ওকে ফিরিয়ে দাও আমি ভাল হয়ে যাব কিংবা তুমি যা চাইবে তাই দিবো। আসলেও তো এরকম হয় না কিন্তু এটা মানুষকে এক প্রকার সান্তনা দেয়।

বিষন্নতা- যখন রাগ চলে যায়, লেনদেনও হয়না তখন মানুষ বিষন্নতায় ভোগে। এজন্য প্রায় শোকে মানুষকে বলতে শোনা যায় যে, “আমি এখন কি নিয়ে বাঁচবো কিংবা আমার কি হবে এখন”। অনেকেই জীবনের আশা হারিয়ে ফেলে। হাল ছেড়ে দেয়। বিষন্নতায় ভোগে। এসময় প্রচুর সহযোগিতার প্রয়োজন হয়।

মেনে নেওয়া- যখন মানুষ বুঝতে পারে যে, যা হওয়ার তা হয়ে গেছে তাকে আর কখনো ফিরিয়ে আনা যাবে না তখন সেই বিষয়টি মানুষ মেনে নিতে শুরু করে। আস্তে আস্তে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। নতুন করে আবার সবকিছু শুরু করে। মানুষের তখন আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে।

 

শোকের ধাপ Neon Aloy

কুবলার রসের মডেল

 

কুবলার রসের এই মডেল শুধু মৃত ব্যক্তির শোক নয় বরং এছাড়াও আমাদের নানা দুঃখের সাথেও জড়িত। আমাদের সামাজিক জীবনে প্রতিনিয়ত আমাদের সাথে কিছু না কিছু ঘটে। আমাদের মন খারাপ থাকে কিংবা আমরা দুঃখ পাই। সেখানেও এই মডেলের প্রভাব রয়েছে।

অনেকের সাথে এই মডেলের সব ধাপ মিললেও কারো কারো সাথে মিলে না।অনেকেই শুধু বিষন্নতায় ভোগে আবার অনেকেই শুধু রাগ। আবার অনেকেই আপনা থেকেই পুরো ব্যাপারটা মেনে। এখানে একেক ব্যক্তির সাথে একেক ব্যক্তির পার্থক্য ছাড়াও ঘটনাও একটা প্রভাব ফেলে।

কুবলার ছাড়াও ওরডেন টাস্কস অফ মোর্নিংও শোক কাটিয়ে উঠার আরেক উপায়।

শোকের ধাপ Neon Aloy

ওরডেন টাস্কস অফ মোর্নিং মডেল

 

এখানে মানুষ প্রথমে পুরো বিষয়টাকে মেনে নেয়, তারপর কষ্টটাকে কাটিয়ে উঠা, তারপর সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া এবং সব শেষে এগিয়ে যাওয়া।

আরো পড়ুনঃ তবে কি আসলেই এলিয়েন আছে? 

Most Popular

To Top