টুকিটাকি

সেফটি সাইনের জন্ম কথা

সেফটি সাইনের জন্ম কথা Neonaloy

সেফটি সাইন (Safety Sign)– নিরাপত্তা সংকেত বা সতর্কতা সংকেত কথাটির সাথে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। রাস্তা পার হবার সময় “পথচারী পারাপার” কিংবা “নো ইউটার্ন” এর সাইনবোর্ড গুলো আমরা দেখি, সেগুলো সবই সেফটি সাইন। রাস্তা নিরাপদে পার হওয়ার জন্য যেমন সেফটি সাইন আছে, শিল্প-কারখানা, রসায়ন পরীক্ষাগার কিংবা হাসপাতালের জন্যও রয়েছে সেফটি সাইন।

আচ্ছা, সেইফটি সাইন ব্যাপারটার জন্মই বা হল কেন? উচ্চশক্তির বৈদ্যুতিক মেশিনের উপর বিদ্যুত প্রবাহের সংকেত না দিয়ে স্রেফ লিখে দিলেই তো হতো- হাই ভোল্টেজ? কিংবা পেট্রল পাম্পে ধূমায়িত সিগারেটের ছবির উপর ক্রস না দিয়ে কেবল বাংলা ভাষায়- ধূমপান নিষিদ্ধ লিখে দিলেই হতো না? না, হতো না।

কারণটা কিছুটা সাইকোলজিক্যাল, কিছুটা টেকনিক্যাল। লেখার চাইতে ছবি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বেশি এবং মনেও থাকে বেশি। তাছাড়া, চিত্র ছাড়া কেবল লেখার আরেকটা অসুবিধা হল পৃথিবীর কোন ভাষাই সার্বজনীন নয়, চিত্রকর্ম ছাড়া।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন প্যারিসের এক রেস্টুরেন্টে গিয়ে ভাষাগত সমস্যার কারণে খাবার অর্ডার করতে বিপদে পরেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত গরু-খাসীর ছবি এঁকে অর্ডার করেছিলেন- সেই গল্পটা মনে আছে নিশ্চয়ই? মূলত, দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এই সেইফটি সাইন গুলোর প্রয়োজন।

এই সেইফটি সাইনগুলো ডিজাইন করা হয় কীভাবে সেটা কি আমরা কখনও ভেবে দেখেছি? একটা সংকেত ডিজাইন করার সময় বেশ কিছু ব্যাপার মাথায় রাখতে হয়- সংকেতটি সকল ভাষা এবং সংস্কৃতির লোক বুঝতে পারবে কি না, সংকেতটি এক প্রজন্ম অতিক্রম করে পরের প্রজন্মে একই অর্থ নিয়ে পৌঁছাতে পারবে কি না ইত্যাদি ইতাদি। একটা ছবি এঁকে সাইনবোর্ডে বসিয়ে দিলেই সেটা সেইফটি সাইন হয় না, একটা সার্বজনীন সেইফটি সাইন ডিজাইন করতে প্রয়োজন হয় প্রফেশনাল বিশেষজ্ঞ যেমন ইঞ্জিনিয়ার, নৃতাত্বিক, মনোবিদ।

একটা সেইফটি সাইন ডিজাইন করতে কতটুকু সতর্কতা এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে করা উচিৎ, সেটা একটা উদাহরণের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করি। এর মধ্যে সেইফটি সাইন কীভাবে এবং কীসের উপরে ভিত্তি করে ডিজাইন করা যেতে পারে সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে বলে আশা করি।

১৯৬৬ সালে ডাউ কেমিক্যাল কোম্পানি, একটি অস্ট্রেলিয়ান মাল্টিন্যাশনাল কেমিক্যাল কর্পোরেশন, কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ার এবং ডিজাইনারদের সমন্বয়ে একটি টিম গঠন করে Biohazard (জৈবিক বস্তু যা প্রাণীর স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ) এর সংকেত তৈরি করার জন্য।

টিম সংকেতের ৬ টি ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণ করল-
১. ভিজুয়ালি স্ট্রাইকিং- অর্থাৎ সহজে দৃষ্টি আকর্ষণ করার ক্ষমতা রাখবে।
২. অন্য অর্থের সাথে গুলিয়ে ফেলা যায় এমন সংকেত চলবে না
৩. সহজে মনে রাখা যাবে
৪. সহজে আঁকা/ডিজাইন করা যাবে
৫. সিমেট্রিকাল ডিজাইন হতে হবে, যেন সবদিক থেকে মোটামুটি একই রকম মনে হয়
৬. সকল ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে

তারা ২৪টি সংকেতের একটি সেট তৈরি করল। এর মধ্যে ৬টি একেবারেই নতুন, বাকী ১৮টির কিছু স্বল্প এবং কিছু বহুল প্রচলিত। সেটটি ৩০০ জন মানুষকে দেখিয়ে পরীক্ষার মাধ্যমে দুটি তথ্য যাচাই করা হল-

ক. কোন সংকেতটি মানুষ সবচেয়ে বেশি মনে রাখতে পারে?
খ. কোনটি সবচেয়ে বেশি অর্থহীন, অর্থাৎ কোনটি দেখে এর কোন অর্থ অনুমান করা কষ্ট?

প্রথম প্রশ্নটির তাৎপর্য সহজেই অনুধাবনযোগ্য, পরেরটা বুঝিয়ে বলছি। এটি উপরে বলা ৬টি ক্রাইটেরিয়ার দ্বিতীয়টির সাথে সম্পর্কযুক্ত। কোন সংকেত যদি এমন হয় যে এটা পূর্বে অন্য অর্থে ব্যবহৃত হতো, কিংবা সংকেতের সাথে এমন কোন বস্তু বা প্রতীকের মিল রয়েছে যার সাথে টার্গেটের অর্থাৎ বায়োহ্যাজার্ড এর কোন সম্পর্ক নেই, তখন সঙ্কেতের অর্থ বোঝা মানুষের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়বে। অপরদিকে, সংকেত যদি এমন হয় যে তাকে দেখে মানুষের মনে কোন ধারণা তৈরী হয় না, তখন কাঙ্খিত অর্থ তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া সহজ হয়।

তো, দুইটি প্রশ্নে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে যে সংকেতটি উত্তীর্ণ হল সেটাই আজ বায়োহ্যাজার্ডের সার্বজনীন সংকেত।

সেফটি সাইনের জন্ম কথা Neonaloy

 

সেফটি সাইন নির্বাচনের এই পদ্ধতিটি চমৎকার এবং কার্যকরী। তবে এই পদ্ধতি যে সবক্ষেত্রেই হুবহু অনুসরণযোগ্য তা কিন্তু নয়। হাসপাতাল এবং শিল্প-কারখানার মতো স্পেশালাইজড জায়গায় সেইফটি সাইনের ব্যবহার আর প্রয়োগে ভিন্নতা থাকবে সেটাই স্বাভাবিক, সুতরাং ডিজাইনের সময়ও ভিন্ন ক্রাইটেরিয়া থাকতেই পারে।

জলি রজার (Jolly Roger) সংকেতটা আমরা সবাই কোথাও না কোথাও দেখেছি। কালো ব্যাকগ্রাউন্ডের উপর সাদা খুলি আর ক্রস করা দুটো হাড়- সংকেতটি যে খুব ভয়ঙ্কর কিছুর সেটা অনুমেয়, তবে ঠিক কীসের সংকেত সেটা বুঝতে একটু বেগ পেতে হয়।

সেফটি সাইনের জন্ম কথা Neonaloy

 

সংকেতটা ব্যবহৃত হতো মধ্যযুগে- অনুমান করুন তো কীসের সংকেত? পাইরেটস? ব্ল্যাক ম্যাজিক? বিপদজনক এলাকা?
উঁহু- সংকেতটা হচ্ছে “বিষ” এর। (জলদস্যুরা যে সংকেত ব্যবহার করত সেটা খুলির সাথে ক্রস করা হাড় নয়, ক্রস করা তলোয়ার!)

সংকেতটা যদি আমরা এখন বিষ বোঝাতে ব্যবহার করতে চাই, সেটা যে কী ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করবে তা কি বোঝা যাচ্ছে?  সংকেতটার এতগুলো সম্ভাব্য অর্থ রয়েছে যে মানুষের পক্ষে মূল অর্থটাই ধরা কঠিন হয়ে পড়বে! একটা অসফল ডিজাইনের উদাহরণ হিসেবে সংকেতটার কথা উল্লেখ করলাম।

সেইফটি সাইন ডিজাইনের জন্য আরও কিছু পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে বিভিন্ন সময়। এর একটি হল- সতর্কতার ব্যাপারটা ধারাবাহিক ছবির মাধ্যমে বুঝিয়ে দেয়া। ধরুন- একটা ছবিতে একজন লোক এক বোতল তরল পদার্থের খুব কাছে আগুন ধরাচ্ছে। পরের ছবিতে দেখা গেল লোকটার গায়ে আগুন ধরে গেছে, আগুনের উৎস হচ্ছে সেই তরলের বোতল। দাহ্য পদার্থের সতর্কতা সংকেত হিসেবে এই ইলাস্ট্রেশন ব্যবহার করা যেতে পারে। এই পদ্ধতির সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করবে দর্শক ছবিটা কিভাবে ব্যাখ্যা করছে তার উপর- যা এই পদ্ধতির একটা সীমাবদ্ধতা।

আরেকটা মজার পদ্ধতি চিন্তা করা হয়েছে। বিভিন্ন বিখ্যাত স্থাপনার বিকৃত আকৃতির ছবি যদি “বিপদজনক” বোঝাতে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটা মানুষের মনে কেমন প্রতিক্রিয়া ফেলবে? ধরুন, একটা দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া পিরামিড কিংবা চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া তাজমহল? এই জাতীয় ছবি মানুষের মনে অস্বস্তি এবং বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ভিজুয়ালি স্ট্রাইকিং এবং মনে রাখার দিক থেকে এই পদ্ধতি সম্ভবত খুবই কার্যকর, তবে সমস্যা হচ্ছে, এই পদ্ধতি সবাই বুঝবে না। যে ব্যক্তি পিরামিড চেনে না, বিকৃত আকৃতির পিরামিড দেখে তার ভাবান্তর হওয়ার কথা না!

প্রতীক, ধারাবাহিক চিত্র, বিকৃত অবকাঠামো ইত্যাদি ছাড়া আরেকটা মজার প্রস্তাবের কথা বলি। প্রস্তাবটি যৌথভাবে দিয়েছিলেন দার্শনিক ফ্রান্সোয়াজ বাস্তিদ এবং পাওলো ফাবরে। তাদের প্রস্তাবটি ছিল জেনেটিকাল মিউটেশনের মাধ্যমে বায়োলুমিনেন্ট বিড়ালের জন্ম দেয়া হোক, যেটা তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে জ্বলে উঠবে, যা তেজস্ক্রিয় পদার্থের সেফটি সাইন হিসেবে কাজ করবে!

আমাদের নিরাপদ রাখার জন্য আজ যে সেফটি সাইনগুলো ব্যবহার করা হয়, তা কিন্তু হুট করে চলে আসেনি। অনেক যাচাই বাচাই এবং বিশ্লেষণের পর এগুলো ঠাঁই পেয়েছে ল্যাবে, কারখানায়, রাস্তায় কিংবা হাসপাতালে।

Most Popular

To Top