ইতিহাস

খেতাব না পাওয়া এক “বীরশ্রেষ্ঠ”

খেতাব না পাওয়া এক "বীরশ্রেষ্ঠ" neonaloy

বীরশ্রেষ্ঠ হিসেবে ঘোষণা পাওয়া শহীদ জগৎজ্যোতি দাস। মুক্তিযুদ্ধে ভাটি বাংলার এ বীর যোদ্ধাকে বীরত্বের খেতাব হিসেবে বীরশ্রেষ্ঠ পদক প্রদানের ঘোষণা দিয়েছিল অস্থায়ী সরকার। কিন্তু পরে তা আর দেয়া হয়নি, কারণটাও জানা যায়নি। ১৯৭২ সালে শহীদ জগৎজ্যোতি দাসকে বীর উত্তম খেতাব প্রদান করা হয়।

বাংলার এই বীর সন্তানের জন্ম ১৯৪৯ সালে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলায়। আজমিরীগঞ্জেই শৈশব কৈশোর কাটে তার। এসএসসি পর্যন্ত লেখাপড়াও সেখানেই করেছিলেন, এরপর যান ভারতের আসামে। সেখানে উচ্চ মাধ্যমিক শেষে চাকরিতে যোগ দেয়ার কথা ছিল। সেই সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন, তার আগে জন্মস্থানে আসেন সবার সাথে দেখা করার জন্য। তবে, দেশে এসে আর চাকরিতে যোগ দিতে ভারত যান নি জগৎজ্যোতি। ৭৫ টাকা বেতনে নিজ গ্রাম জলসুখার কৃষ্ণগোবিন্দ পাবলিক হাইস্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর আবার এই চাকরি ছেড়ে স্নাতকে ভর্তি হন সুনামগঞ্জ কলেজে।

১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময়ে জগৎজ্যোতি ছিলেন সুনামগঞ্জ কলেজের ছাত্র এবং কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী। এসময় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য ভারতের শিলংয়ে প্রশিক্ষণ নিতে যান তিনি। তার সাহস ও দক্ষতার জন্য তাকে মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা দলের নেতৃত্ব দিয়ে পাঠানো হয় ভাটি অঞ্চলের দায়িত্ব দিয়ে। তার নেতৃত্বের গেরিলা দলটিই পরিচিতি পায় দাস পার্টি নামে। মুক্তিযুদ্ধে পাকসেনাদের কাছে দাস পার্টি ছিল এক আতংকের নাম। একের পর এক যুদ্ধে তারা পাকসেনাদের হারিয়ে জয় ছিনিয়ে আনতে থাকে। নেত্রকোনার ভেড়ামোহনা, কালনী, কুশিয়ারা, সুরমা, দিরাই, শাল্লা, আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, কিশোরগঞ্জের নৌপথ দখল মুক্ত করতে লড়াই করে এই দাস পার্টি। তাদের আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পাকিস্তানি সেনারা।

অনেকগুলো সফল অপারেশন সম্পন্ন করে দাসপার্টি। তার মধ্যে অন্যতম ছিল পাকিস্তানীদের কার্গো বিধ্বস্ত করা, বার্জ নিমজ্জিত করা, পাহাড়পুর অপারেশন, বদলপুর অপারেশন। দাস পার্টিকে মোকাবেলা করতে পাকিস্তানি সেনারা শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। বদলপুর অপারেশনের সময় হেলিকপ্টারও ব্যবহার করে পাকসেনারা।

এই অপারেশনের সময় তুমুল যুদ্ধের এক পর্যায়ে জ্যোতি তার দলকে নিরাপদ স্থানে সরে যাবার নির্দেশ দেন। এরপর সহযোদ্ধা ইলিয়াছ ও একটি মাত্র এলএমজি নিয়ে একাই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। একাই খতম করেন ১২ জন পাকসেনা। হঠাৎ ইলিয়াছ গুলিবিদ্ধ হন। জ্যোতি মাথার গামছা খুলে ইলিয়াসের বুকে‌ বেঁধে দিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করেন। ইলিয়াছ তাকে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিলেও শোনেননি তিনি। যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন জ্যোতি, সাথে ইলিয়াছও। যুদ্ধের এক পর্যায়ে শত্রুর গুলি লাগে জ্যোতির চোখে। বিলের পানিতে ঢলে পড়েন এই অকুতোভয় বীর। ১৬ নভেম্বর ১৯৭১, শহীদ হন বাংলা মায়ের এই বীর সন্তান। জ্যোতির লাশ নিয়ে উল্লাসে মেতে ওঠে পাকবাহিনী ও রাজাকাররা। জ্যোতির মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয় আজমিরীগঞ্জ বাজারে। তাঁর দেহ আজমিরীগঞ্জের গরুর হাটে একটি খুঁটির সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। বাজারের মানুষের সামনে পেরেক মারা হয় তার সারা দেহে। এরপর জ্যোতির নিথর দেহটি ঝুলিয়ে রাখা হয় সেখানে। পরে এই বীরের দেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয় কুশিয়ারা নদীতে।

জ্যোতির শহীদ হওয়ার সংবাদ প্রচার করা হয় রেডিও ও পত্রিকায়। তার বীরত্বকে সম্মান দেখাতে অস্থায়ী সরকার তাকে মুক্তিযুদ্ধের মরণোত্তর সর্ব্বোচ্চ খেতাব দেয়ার ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণা প্রচার করা হয়েছিলো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top