ফ্লাডলাইট

শুভ জন্মদিন অকারণে গালি খাওয়া বিশ্বের একমাত্র মানুষ!

সমালোচনার শীর্ষস্থানটি হয়তো এই মানুষটির.. যে মানুষটি বাংলাদেশ কে অনেক উঁচু পর্যায়ে নিয়ে গেছে সেই মানুষটিই গালি বা সমালোচনা উপহার হিসেবে পেয়েছেন বার বার!

এখনও পান… নিজের বউয়ের সাথে কোন ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হলে কমেন্ট বক্সটা যে কি থেকে কিসে পরিণত হয় তা ভালোভাবে জানা সবার… যেনো বিয়ে করাটা তার জন্য মহা পাপ ছিলো! সে একজন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার যে এক ম্যাচ খারাপ খেললে আমরা বলি “এ কিভাবে বিশ্ব সেরা?”, “বাজে ক্যাপ্টেনসি”, “দেশপ্রেম নাই”, “টাকার জন্য খেলে” এন্ড ব্লা ব্লা ব্লা!
বুঝতেই পারছেন কার কথা বলছি!

শুভ জন্মদিন অকারণে গালি খাওয়া বিশ্বের একমাত্র মানুষ!

ফেসবুকে সাকিব কোন ছবি শেয়ার করলে তার কমেন্ট বক্সে নিয়মিত আসা কিছু কমেন্টের নমুনা

 

আমি বলছি বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের কথা। আজ তার জন্মদিন!
১৯৮৭ সালের ২৪ শে মার্চ জন্ম হয় আজকের এই সাকিব আল হাসানের, জন্মস্থান মাগুরা। ফুটবলার বাবার স্বপ্ন ছিলো ছেলে তার জাতীয় দলের খেলার অপূর্ণ ইচ্ছাটা পূরণ করবে। ছেলেটি আজ জাতীয় দলেই খেলে; তবে ক্রিকেট, হয়তো ফুটবল খেললেও নিজের প্যাশন ও প্ররিশ্রমের কারণে ফুটবলে আমরা ফুটবলার সাকিব আল হাসানকে পেতে পারতাম! কিন্তু নিয়তি তার ক্রিকেটেই!

আচ্ছা টাকার জন্য খেলে সাকিব আল হাসান?
ছোট বেলায় ক্রিকেটের জন্য মার খেতো, বেশ কয়েকবার ব্যাট ভেঙ্গে ফেলেছেন বাবা, এমনি কি বাবাকে না জানিয়েও খেলতে গিয়েছেন। ক্রিকেট যার প্যাশন সে টাকার জন্য খেলে? হাস্যকর! ক্রিকেটটা তো তার প্রোফেশনও। তার পারিশ্রমিক তো অবশ্যই তার প্রাপ্য! আপনি অবশ্যই বিনা টাকায় আপনার প্রফেশনে সার্ভিস দিবেন না! তবে সাকিবকেই কেন এই কথা শুনতে হয়?
আচ্ছা, এসব কথা না হয় বাদ দেই… চলুন একটু সাকিব আল হাসান কে চিনি।

সাকিবের সাকিব হওয়াঃ
সাকিব আল হাসান, স্পিনার এবং অর্থোডক্স। তবে শুরুতে ছিলেন একজন পেস বোলার, কোনো একটা ম্যাচ খেলতে গিয়ে সাদ্দাম হোসেন গোর্কি স্যারের পরামর্শ হয়ে উঠেন স্পিনার। লোসারটান পরামর্শ ভুল ছিলো না, তাইতো সাকিবের স্পিনের ঘূর্ণিতে পুরো বিশ্ব কাবু। গর্বিত করেছেন গোর্কি স্যার কে। গর্কি স্যারের ভাষায়,

“লোকে যখন মনে করে, আমিই সাকিবের কোচ ছিলাম,
তখন মনে হয় আমার জীবনে আর চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই।”

ক্রিড়া অঙ্গনে অফিসিয়ালি যাত্রা শুরু বিকেএসপির মাধ্যমে! তার বাবা কিন্তু ফুটবলের সিলেক্টর কমিটির সদস্য ছিলেন! তবে না, তিনি বাবার জন্য চান্স পান নি, পেয়েছেন নিজের যোগ্যতায়।

এরপরই শুরু হয় জাতীয় দলে যাওয়ার যাত্রা। ২০০৬ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে তার। তারিখটা ছিলো ৬ আগস্ট, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার প্রথম শিকার ছিলেন এলটন চিগুম্বুরা। বোলিং (৩৯-১) এবং ব্যাট হাতে ৩০ বলে ৩০ রান। শুরু টা খারাপ ছিলো না। এরপর ধীরে ধীরে নিজের জাত চেনাতে শুরু করেন সাকিব। হয়ে যান বোর্ডের সাথে চুক্তি বদ্ধ। ডাক পান ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ১৫ সদস্যের দলে!

ভারতবধ কাব্য রচনার তার ছিলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা! টুর্নামেন্টে মোট ৯ টি ম্যাচে ২০২ রান করেন তিনি, গড় ছিল ২৮.৫, নেন ৭টা উইকেট, গড়ে ৪৩. ১৪। সেবার বিশ্বকাপে সপ্তম দল হিসেবে টুর্নামেন্ট শেষ করেছিলো বাংলাদেশ!

ধীরে ধীরে সাকিব যেনো বিশ্বাঙ্গনে নিজের প্রতিপত্তি গেড়ে ফেলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সেবছরই মে মাসের ১৮ তারিখ টেস্টে অভিষেক হয় ভারতের বিপক্ষে। তবে ওডিআইয়ের মতো প্রথম টেস্টের স্মৃতি এতোটা ভালো ছিলো না! তবে সাকিবের টেস্টে প্রথম শিকার নিউজিল্যান্ডের ক্রেইগ কামিং ( বাংলাদেশ ট্যুর অফ নিউজিল্যান্ড, ২০০৭)। টি টুয়েন্টি অভিষেক ঘটে ২৮ নভেম্বর ২০০৬ সালে। ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত আইসিসি টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটে তিনটির বেশি উইকেট নেন সাকিব।

বিশ্বসেরার পথে সাকিবের যাত্রা শুরুঃ
ব্যাটে বলে ভালোয় তকমা দেখানো শুরু করে সাকিব, অলরাউন্ডার হিসেবে মোটামুটি ভালোই পরিচিত পেয়ে যায়। সেই সাথেই শুরু হয় বিশ্বসেরা হওয়ার প্রস্তুতি পর্ব। ২০০৮ সালের সাউথ আফ্রিকা ট্যুরে সাকিবের বোলিংয়ে মুগ্ধ হয়ে সাবেক অস্ট্রেলীয় লেগ স্পিনার ক্যারি ও কীফে তাকে “বিশ্ব সেরা ফিঙ্গার স্পিনার” উপাধি দেন! ভাবা যায়? মাত্র দুই বছর আগে অভিষিক্ত একটি ছেলেকে এমন একটা উপাধি… তাও আবার বিশ্বসেরা!

পরের বছর মানে ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারি সাকিব হয়ে যান নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডার! আইসিসির কোনো পজিশনের নাম্বার ওয়ানের পাশে বাংলাদেশ নাম লেখা! দেখলেই গর্বিত হতে হয় সবাই কে। এই কাজটা কিন্ত সাকিবের জন্যই হয়েছিলো।

অধিনায়ক হিসেবে সাকিবঃ
দেশের বাহিরে প্রথম টেস্ট জয় কবে হয়েছিলো মনে আছে? ২০০৯ সালের জুলাইয়ে তাই তো? প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ! সেই ম্যাচ টার কথা মনে আছে? যেখানে ম্যাশ হাঁটুর ইনজুরিতে পড়েন? অধিনায়ক হিসেবে মাঠে নামেন সাকিব… সাথে মাহমুদুল্লাহ!
অধিনায়ক হিসেবে দেশের বাহিরে প্রথম টেস্ট জয়ের অভিজ্ঞতা দেন এই সাকিব আল হাসানই। বলে রাখা ভালো, ম্যাশের ইনজুরির কারণে সাকিব বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ এবং বিশ্বের মধ্যে পঞ্চম কনিষ্ঠ অধিনায়ক হিসেবে তার অধিনায়ক জীবনের সূচনা করেন।তবে বেশি দীর্ঘ ছিলো না অধিনায়কত্ব! নানা কারনে নিজেই অধিনায়ক পদ থেকে সরে আসেন।

টেস্ট ক্রিকেটে নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডারঃ
২০১১ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তান টেস্ট সিরিজ নিয়ে যায় তাকে আরও একটি সম্মানের দিকে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে ওডিআই ও টেস্টে হন সব্বোর্চ উইকেট শিকারী। পাকিস্তানের সাথে হোম সিরিজে হন সব্বোর্চ রান ধারী ও উইকেট শিকারী। সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে করেন ১৪৪ রান যেটি ছিলো প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে টেস্ট শতক এবং একই সাথে নেন ৫ টি উইকেট। এমন পারফরম্যান্সের ফলে সিরিজ শেষে হয়ে যান টেস্টে নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডার!

শুভ জন্মদিন অকারণে গালি খাওয়া বিশ্বের একমাত্র মানুষ!

তিন ফরম্যাটে নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডারঃ
২০১৫ সালে সাকিব তিমি ফরম্যাটে নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডার ঘোষিত হয়। এরপর থেকে যেন নাম্বার ওয়ান প্লেসটাকে নিজের সম্পত্তি করে নিয়েছেন সাকিব। তিনি সেখানকার নিয়মিত বাসিন্দা! বর্তমানে শুধু টি-টুয়েন্টি ম্যাচ কম খেলার কারণে টি-টুয়েন্টিতে আছেন দ্বিতীয় স্থানে!

কিছু রেকর্ডঃ
সাকিব মানেই রেকর্ড, রেকর্ড মানেই সাকিব!
তাইতো ভক্তদের দেওয়া নাম রেকর্ড আল হাসান। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই করেন নানা রেকর্ড!

প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে টি-টুয়েন্টিতে তিনটি বেশি উইকেট নেন ২০০৭ সালের আইসিসি টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপে। ২০০৮ সালে ৩৯ ম্যাচ খেলে ওয়ানডে তে ১০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন! ব্যাটিং এভারেজ ছিলো ৩৫.৩৭! তিন ফরম্যাটে একসাথে নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডার থেকে বাংলাদেশের হয়ে এক অনন্য রেকর্ড করেন এই সাকিব আল হাসানই।

২০১২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে হোম সিরিজে ২য় বাংলাদেশী হিসেবে ১০০ উইকেট শিকারী হন এবং বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে লিডিং উইকেট টেকার হন। এই সিরিজেই অলরাউন্ডার হিসেবে টেস্টে দ্রুততম ১০০ উইকেট শিকারী ও ১০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। ২০১৪ সালে তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে একই টেস্টে ১০ উইকেট ও একটি সেঞ্চুরির রেকর্ড করেন! ২০১৫ সালে হয়ে যান টেস্ট ফরম্যাটে নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডার!

২০১৮ সালে তামিম ভাইয়ের পর দ্বিতীয় বাংলাদেশী হিসেবে তিন ফরম্যাটে ১০০০০ রানের ক্লাবে ঢুকেন তিনি! তিন ফরম্যাটে দ্রুততম খেলোয়াড় হিসেবে ১০ হাজার রান ও ৫০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করতে দরকার আর দুইটি উইকেট! বর্তমানে উইকেট সংখ্যা ৪৯৮টি।

এছাড়াও আরও অনেক রেকর্ড আছে। লিখতে গেলে হয়তো সারাদিন লাগবে। ভাবুন একটা সময় বাংলাদেশের কি হাল ছিলো, পরে একজন জেনুইন অলরাউন্ডার হিসেবে সাকিবের আগমন। আগমনের শুরু থেকে নানাভাবে বাংলাদেশকে নিয়ে গেছেন বিশ্ব ক্রিকেটের বিভিন্ন উঁচু রেকর্ডের দিকে!

শুভ জন্মদিন অকারণে গালি খাওয়া বিশ্বের একমাত্র মানুষ!

দেশের জন্য এতো করেও সব থেকে বেশি গালি খেতে হয় সাকিবকেই! অনেকেই হয়তো বলবেন বেশি বাড়িয়ে বলছি। কেন সম্প্রতি হেরে যাওয়া নিদহাস ট্রফির ফাইনালে গালি খায় নি সাকিব? হয়নি তার সমালোচনা? মানুষ টার হাতের ইনজুরি ভালো না হওয়া সত্ত্বেও খেলতে নামার সাহস দেখিয়েছিলো! কারণ সবাই সাকিব শুন্যতা নিয়ে কথা বলছিলো। প্রথম ম্যাচে বল করার পর ব্যাটিংয়ের সময় ব্যাথায় কাতরানো মুখটা কয়জন খেয়াল করেছেন? এসব কেন খেয়াল করবেন?

যাক, বাংলাদেশে সাকিব একজন। সময় থাকতে সমালোচনা বাদ দিয়ে তার গুরুত্ব বুঝতে চেষ্টা করেন। আজকে সাকিব ভাইয়ের জন্মদিনে এটা আশা করবো যেন সকল সমালোচনার অবসান হয়।

শুভ জন্মদিন নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান।

জন্মদিনের অনেক অনেক শুভকামনা…
আরও সামনে এগিয়ে যান এবং সেই সাথে বাংলাদেশকে নিয়ে যান সম্মানের শিখরে!

Most Popular

To Top