ইতিহাস

বিশ্বের খ্যাতনামা দশ অপরাধী (শেষ পর্ব)

বিশ্বের খ্যাতনামা দশ অপরাধী (শেষ পর্ব)

অপরাধ জগতের বাসিন্দাদের জীবন সম্পর্কে আমাদের কৌতুহল একটু বেশিই। আর তা যদি হয় অপরাধ সাম্রাজ্যের অধিকর্তাদের তাহলে কথাই নেই। কে তারা, কি তাদের পরিচয়, কিভাবে অপরাধ করতেন তা জানার আগ্রহে বইপত্র, ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি চলে প্রায়ই। আমারও এ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ। এই জগতের বাসিন্দার হয় তুমুল মেধাবী ও বুদ্ধিমান। কিন্তু তারা তাদের এই মেধাকে মানবতার কল্যাণে না লাগিয়ে, বরং ধ্বংস করে নিজের বিত্তের সাম্রাজ্য বাড়িয়েছেন। দূর্ধর্ষ সব অপরাধীদের সম্পর্কে জানতে আমার মতো যাদের আগ্রহ তাদের জন্য এই আয়োজন।
বিশ্ব কাঁপানো দশ অপরাধী নিয়ে সাজানো হয়েছে এই লিখাটি। আজ রইলো তালিকার শীর্ষ তিনজনের নাম।

০৩। জন ডিলিঞ্জার

‘পাবলিক এনিমিজ’ ছবিটি দেখেছেন? জনি ডেপের অভিনয়ে ডাকাত জন ডিলিঞ্জার ও এফবিআইয়ের উত্থানের ঘটনা চিত্র নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র। ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে নির্মাণ করা ছবি অনেকেই পছন্দ করেন। এর মাধ্যমে ইতিহাস জানা যায়, কিন্তু সিনেমায় বিনোদনের বাড়তি আয়োজনের জন্য কিছু বিষয় অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়, কোথাও যোগ করা হয়, কোথাও বিয়োগ। তবে মূল বক্তব্য একই থাকে। তেমনি “পাবলিক এনিমিজ” চলচ্চিত্রটি দেখলে তাতে দূধর্ষ ব্যাংক ডাকাত জন ডিলিঞ্জার সম্পর্কে জানা যায়। যাকে সেসময় এফবিআই তালিকায় বলা হতো পাবলিক এনিমিজ নাম্বার ওয়ান।

বিশ্বের খ্যাতনামা দশ অপরাধী neonaloy

১৯০৩ সালে ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যে জন্ম ডিলিঞ্জারের। ১৯৩২ থেকে ৩৪ সময়কালে তিনি ২৪টি ব্যাংক ডাকাতি, পুলিশ স্টেশনে হামলা, খুনসহ বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত ছিলেন। আমেরিকার অর্থনৈতিক মন্দার সেই সময়ে জন ডিলিঞ্জার রেকর্ড পরিমাণ অর্থের মালিক হন। একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার দায়ে গ্রেপ্তার হন ১৯৩৪ সালে, যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয় তার। এরপর ডিলিঞ্জারের জেল পালানো হয়ে যায় ইতিহাসের অংশ। কাঠ কেটে পিস্তল বানিয়ে তাতে জুতার কালি রঙ মাখিয়ে সত্যিকার রূপ দেন ডিলিঞ্জার। এরপর সেটা সোজা জেল পাহারাদারের কপালে ঠেকিয়ে পালিয়ে যান জেল থেকে, সাথে করে নিয়ে যান শেরিফের নতুন কেনা গাড়ি। এই ঘটনার কিছুদিন পরেই গার্লফ্রেন্ড নিয়ে সিনেমা দেখে হল থেকে বের হওয়ার সময় এফবিআই এজেন্টের গুলিতে মারা যান ডিলিঞ্জার। ডিলিঞ্জার অবশ্য পালানোর চেষ্টা করেননি, এমন বুদ্ধিমান, দূধর্ষ ডাকাতকে আটকে রাখা কষ্টকর হতে পারে ভেবে হয়তো সোজাসুজি গুলি করা হয়েছিল তাকে।

০২। পাবলো এসকোবার

মেডেলিন কার্টেল এর নাম শুনেছেন কখনো? বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ ক্ষমতাধর মাদক চক্র মেডেলিন কার্টেল, এর প্রধান ছিলেন পাবলো এসকোবার। তাকে ডাকা হতো কোকেন সম্রাট নামে। ব্যাপক জনপ্রিয় টিভি সিরিজ নার্কোস নির্মিত হয়েছিলো পাবলো এসকোবারের জীবনীর উপর। ৭০ থেকে ৮০’র দশকে বিশ্বের কোকেন ব্যবসার বেশিরভাগ নিয়ন্ত্রণ ছিল যার হাতে তিনিই আবার ছিলেন কলোম্বিয়ার মেডেলিনের মানুষের কাছে সুপারহিরো। একদিকে একের পর এক খুন করে গেছেন, নির্দেশ দিয়েছেন অসংখ্য নিরীহ সাধারণ মানুষ হত্যার আবার মেডেলিনের গরীব অধিবাসীদের জন্য নির্মাণ করেছেন আবাসিক ভবন, হাসপাতাল, স্কুল, পার্ক।

বিশ্বের খ্যাতনামা দশ অপরাধী neonaloy

১৯৪৯ সালে কলোম্বিয়ার এক দরিদ্র কৃষক পরিবারের জন্ম এসকোবারের। কবরের নামফলক চুরি দিয়ে অপরাধের শুরু। এরপর সারা বিশ্বে কোকেন ছড়িয়ে দেয়া, শতাধিক বিচারককে হত্যা, কলোম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হত্যা, ভাইস প্রেসিডেন্টকে হত্যার জন্য একটি আস্ত বিমান বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিরীহ ১০৭ জনকে হত্যা করা সহ ভয়ংকর অপরাধী ছিলেন এসকোবার। আমেরিকা ও কলোম্বিয়ান বাহিনী যাকে ধরার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে। তার একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে হত্যা করা থামাতে এক পর্যায়ে সরকার এসকোবারের সাথে সমঝোতায় যেতে বাধ্য হয়। কোকেন সম্রাটের অর্থ বিত্ত এতো বেশি ছিল যে, বিশ্বের সেরা দশ ধনীর তালিকায় উঠে আসে নাম। আমেরিকায় কোকেন পাচার করতে গাড়ি, বিমান, জাহাজ অনেক কিছুই কিনেছেন তিনি। আমেরিকা থেকে তার জন্য ডলার আসতো জাহাজে করে। জাহাজের জাজিমের ভেতর তুলার বদলে ভরা হতো ডলার। ১৯৮০ সালে একবার সরকার, এসকোবারের ১৪১টি বাড়ি, ২০টি হেলিকপটার, ১৮২টি বিমান, ৩২টি ইয়াট বাজেয়াপ্ত করে, তবে এতে এসকোবারের সম্পদের এক কোনাও যায় নি। ৯০ এর দশকে সরকারের জ্ঞাত হিসাবে এসকোবারের সম্পদ ছিলো ৩০ বিলিয়ন ডলার। ভয়ংকর এই ব্যক্তি নিজ স্ত্রী সন্তানের প্রতি খুব দূর্বল ছিলেন। নানা সময়ে তাকে পালিয়ে থাকতে হয়েছে, যেখানেই গিয়েছেন স্ত্রী সন্তাদের সাথে রেখেছিলেন। এসকোবারের স্বপ্ন ছিলো কলোম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হবার। একবার কংগ্রেস মেম্বারও হয়েছিলেন। তবে অপরাধের তথ্য প্রমাণে বহিষ্কার হয়েছিলেন। শেষে আমেরিকা ও কলোম্বিয়ার যৌথ প্রচেষ্টায় ১৯৯৩ সালে পুলিশের হাতে ধরা পড়া থেকে পালানোর সময় গুলি খেয়ে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে মারা যান এই অপ্রতিরোধ্য কোকেন সম্রাট।

০১। আল কাপোনে

অপরাধ দুনিয়ায় সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম আল কাপোনে। এই গ্যাংস্টার ছিলেন এক মাফিয়া ডনের বডিগার্ড, এরপর নিজেই হয়ে যান মাফিয়া ডন। শিকাগো আউটফিট নামে তার ছিল একটি নিজস্ব গ্যাং। পতিতালয় চালানো, চোরাচালান, জুয়ার আসরের মতো তার ছিল বহু অবৈধ ব্যবসা। আবার সমাজসেবার জন্য গরীবের চোখে তিনি ছিলেন দেবতার সমান।

বিশ্বের খ্যাতনামা দশ অপরাধী neonaloy

 

বিশ্বের আলোচিত গ্যাংস্টারদের মধ্যে সাধারণ মানুষের কাছে আল কাপোনের জনপ্রিয়তাই ছিল সবচেয়ে বেশি। খুন, জখম, মাদকের ব্যবসা যিনি বিস্তার করেছিলেন আমেরিকার আনাচে কানাচে, তিনিই আবার ছিলেন সংগীত প্রেমী। এছাড়া আল কাপোনে কোকেনে আসক্ত ছিলেন। ১৮৯৯ সালে নিউইয়র্ক শহরের ব্রুকলিনে জন্ম হয় তার। ফেডারেল নিষেধাজ্ঞা লংঘনের দায়ে ১৯২৯ সালে কাপোনে প্রথম গ্রেপ্তার হন এফবিআই এজেন্টদের হাতে। এরপর একই বছর ফিলাডেলফিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় উপকন্ঠে ২য় দফা গ্রেপ্তার হন অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে। এই অপরাধে স্বল্প সময় কারাভোগের পর, ১৯৩০ সালের মার্চে মুক্তি পাওয়ার এক সপ্তাহ পর, শিকাগো ক্রাইম কমিশনের ব্যাপক প্রচারিত তালিকায় ক্যাপোনের নাম “পাবলিক এনিমি” হিসেবে নথিভুক্ত হয়। দীর্ঘ কারাবাসের পর মুক্তি পেয়ে লম্বা সময় চিকিৎসা নেন আল কাপোনে। ১৯৪৭ সালে কার্ডিয়াক এট্যাকে মারা যান এই মাফিয়া সম্রাট।

আরো পড়ুনঃ মাদক সম্রাট এল চাপোর উত্থান পতন

Most Popular

To Top