শিল্প ও সংস্কৃতি

সিনেমার পর্দায় সিরিয়াল কিসার, বাস্তবে যিনি একজন সুপারহিরো বাবা!

সিনেমার পর্দায় সিরিয়াল কিসার, বাস্তবে যিনি একজন সুপারহিরো বাবা!- নিয়ন আলোয়

ছেলেটিকে বলা হয় বলিউডের BAD BOY কিন্তু বাস্তব জগতে তাঁর এই BAD BOY ইমেজ অনেক GOOD GIRL দের পছন্দ। মুম্বাই ইউনিভার্সিটি থেকে গ্রাজুয়েশন করার পর ছেলেটি যখন বেকার জীবন কাটাচ্ছিলো তখন তাঁর ফ্যামেলীর মানুষ তাকে উপদেশ দেয় – মামা মহেশ ভাটের প্রোডাকশন হাউসে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার জন্যে। সিনেমা পরিচালনায় অল্প বিস্তার আগ্রহ ছিলো বিধায় ছেলেটিও একবাক্যে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু, কাজ করতে গিয়ে ছেলেটি বুঝতে পারে ক্যামেরার সামনে কাজ করার চেয়ে ক্যামেরার পিছনে কাজ করাটা দ্বিগুণ কষ্টের। সিনেমার সেটে এসে সর্বদাই উদাসীন থাকতো এবং কোনো কাজই ঠিক মতো করতো না। মামা মহেশ ভাট ভাগ্নের এই উদাসীন মনোভাব দেখে বুঝতে পেরেছিলেন ক্যামেরার পেছনে কাজ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব না। তাই, কোনো প্রকার সন্দিহান ছাড়াই মহেশ ভাট ছেলেটিকে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন।

সিনেমার পর্দায় সিরিয়াল কিসার, বাস্তবে যিনি একজন সুপারহিরো বাবা!

২০০৩ সালে প্রথম মুভি মুক্তি পায়, মুভির নাম Footpath। মুভিটি বক্স অফিসে ফ্লপ হলেও ক্রিটিক্যালি অনেক প্রশংসা পায়। মুম্বাই শহরের ফুটপাতে ড্রাগ ডিলার চরিত্রে ছেলেটি বেশ প্রশংসনীয় অভিনয় করেন। মজার ব্যপার হলো ছেলেটির প্রথম মুভিতে একটিও কিস সিন ছিলো না এরপর Murder মুভিতে ছেলেটি “সুবহা তক পেয়্যার” করেছেন মল্লিকা শেরাওয়াত এর সাথে। মুভিটি মুক্তি দেওয়ার আগে পরিচালক অনুরাগ বসু এবং ছেলেটি অনেক টেনশনে ছিলেন। কারণ, ২০০৪ সালে বলিউড দর্শক কড়া ইন্টিমেট সিন যুক্ত এমন মুভি গ্রহণ করবে কি না তা নিয়ে। কিন্তু মার্ডার মুভিটি ২০০৪ সালে বক্স অফিস মার্ডার করে দিয়েছিলো আইমিন মুভি সুপারহিট তকমা পায়। অবাক করার বিষয় হলো- এই মুভির বেশিরভাগ দর্শক ছিলো সে সময়ের মধ্যবিত্ত পরিবারের ত্রিশ উর্ধ্ব মহিলারা। মুভিতে তিনি মল্লিকার সাথে সকাল-বিকাল , রাত-বিরাতে সমুদ্রের তীরে , বাড়ীর ছাঁদে, কার্নিশে ফ্রেঞ্চ কিস করলেও Koffee with Karan শো তে তাঁকে যখন করণ জোহর জিজ্ঞেস করেছিলেন, “অন স্ক্রিন কোন নায়িকার সাথে তোমার কিস করতে বেশি ভালো লেগেছে এবং খারাপ লেগেছে?” ছেলেটি উত্তরে বলেছিলো, “এখন পর্যন্ত অন স্ক্রিন কিস করতে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে জ্যাকুলিন ফারনান্দেজের সাথে আর সবচেয়ে খারাপ লেগেছে মল্লিকা শেরাওয়াত”।

সিনেমার পর্দায় সিরিয়াল কিসার, বাস্তবে যিনি একজন সুপারহিরো বাবা!

সাল ২০০৫ মাস ডিসেম্বর। সপ্তম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করে আমি আর আমার কাজিন গিয়েছি মামা বাসায় বেড়াতে। মূলত, মামী গ্রামের বাড়ীতে গিয়েছেন। মামার বাসায় ডিভিডি প্লেয়ার ছিলো আর খালি বাসা পেয়ে আমারা দুই কাজিন মিলে ঠিক করলাম
Aashiq Banaya Aapne মুভিটি দেখবো। তো যে ভাবা সে কাজ, ১০ টাকা দিয়ে মুভির সিডি ভাড়া করে দুই কাজিন মিলে দেখতে বসে গেলাম। মুভিটি নিয়ে বেশি কিছু বলবো না শুধু এইটুকুই বলবো, টিনেজ বয়সের সকল কর্মকান্ড আমি ভুলে গেলেও দুটো জিনিস কখনো ভুলবো না। এক, টিনেজ বয়সের ক্রাশ; দুই, এই মুভি দেখার অনুভূতি।

২০০৬ সালে মুক্তি পায় Gangster সিনেমাটি। সেটিও হিটের তালিকায় নাম লেখায়। পর পর দুই বছর (২০০৭ ও ২০০৮ সাল) ছেলেটির দুটি সুপারহিট মুভি মুক্তি পায়। যথাক্রমে AwarapanJannat। যদিও আওয়ারাপান মুভিটি সাউথ কোরিয়ান মুভি A Bittersweet Life এর রিমেক তবুও ছেলেটির পারফর্মেন্স বেশ প্রশংসনীয়। আর জান্নাত মুভিতে “জারা সা” গানটিতে গাড়ির হার্ড ব্রেক কষে নায়ক যখন নায়িকার গাড়ীর সামনে এসে নায়িকাকে প্রোপোজ করে সেই সিনটা সত্যিই অসাধারণ আর মুভির ক্লাইমেক্সটাও চরম।

সুপার হিট মুভি উপহার দেওয়ার পরও ছেলেটিকে অনেক সমালোচক বলতেন, “তুমি তো চকলেট হিরো ভিন্নরকমের ক্যারেক্টারে তুমি নিজেকে কখনোই খাপ খাওয়াতে পারবে না”। সেসব সমালোচকদের জবাব দিতে তিনি Once Upon a Time in Mumbaai, Shanghai, বায়োপিক Azhar এর মতোন মুভিতে কাজ করেছেন। Once Upon a Time in Mumbaai এ দাউদ ইব্রাহিম বেইসড শোয়েব খান এবং সাংহাই এ an adult film maker হিসেবে যোগিন্দর পারমার এই দুটি ক্যারেক্টারে তাঁর অভিনয় ব্যক্তিগত ভাবে আমার দেখা এখন পর্যন্ত ছেলেটির সেরা দুটি কাজ।

সিনেমার পর্দায় সিরিয়াল কিসার, বাস্তবে যিনি একজন সুপারহিরো বাবা!

ইমরান হাশমি ও তার পরিবার

সহধর্মিণী পারভিন সাহানি ও একমাত্র ছেলে আয়ান হাশমিকে নিয়ে মানুষটি খুব সুখেই ছিলেন। কিন্তু, হঠাৎ চার বছর বয়সী আয়ানের ফার্স্ট স্টেজ ক্যান্সার ধরা পড়ে। কোনো বাবাই চান না তার ছেলে চোখের সামনে মারা যাক। মানুষটিও মেনে নিতে পারেননি যে তার ছেলে এতো অল্প বয়সে তারই চোখের সামনে মারা যাবে। তাই তো ক্যান্সার থেকে ছেলেকে মুক্তি করার লড়াইয়ে নামেন বাবা। আয়ান কিছুতেই ওষুধ খেতে চাইতো না। চার বছরের বাচ্চা ওষুধ খেতে চাইবে না সেটাই স্বাভাবিক। ওষুধ খাওয়ানোর জন্যে সারাদিন শুটিং করার পর মানুষটি রাতে সুপারহিরো ব্যাটম্যান বেশে ছেলের সামনে উপস্থিত হতো। কারণ, আয়ানের সব থেকে পছন্দের সুপারহিরো ব্যাটম্যান। আর এভাবেই মানুষটি প্রতিনিয়ত ব্যাটম্যান সেজে ছেলেকে ওষুধ খাওয়াতেন। ব্যাটম্যান রুপী বাবার আদেশে হাসপাতাল, ওষুধ, ইঞ্জেকশন, সার্জারি, কেমোথেরাপি সবকিছুই হাসিমুখে পেরিয়ে আসে আয়ান। অনেক পাহাড় ডিঙিয়ে, অনেক কাঁটা-বিছানো পথ পেরিয়ে এক সময়ে বাবা – ছেলে মিলে সেই কালো হুড পরা ক্যান্সারের ছায়াটা উধাও করতে সক্ষম হন। ছেলে আয়ানের ক্যান্সার জয়ের এ বীরগাঁথা নিয়ে মানুষটি একটি বইও লিখেছেন। বইয়ের নাম দিয়েছেন, “দ্য কিস অফ লাইফ: হাউ আ সুপারহিরো অ্যান্ড মাই সন ডিফিটেড ক্যান্সার”

সিনেমার পর্দায় সিরিয়াল কিসার, বাস্তবে যিনি একজন সুপারহিরো বাবা!

ছেলে আয়ানের সাথে ইমরান হাসমি

মানুষটির BAD BOY কিংবা সিরিয়াল কিসার ইমেজ থেকে অনেক দূরে একটি পৃথিবী আছে। সেখানে সমুদ্রতীর নেই, বিকিনি পড়া নায়িকা নেই, নেই নেপথ্যে বেজে যাওয়া পিয়ানোর কর্ড, প্রগ্রেশনে নারীকণ্ঠে শ্বাসাঘাত নেই। সেই পৃথিবীর প্রধান বাসিন্দা তাঁর একমাত্র সন্তান আয়ান।

শুভ জন্মদিন ইমরান হাশমি।

Most Popular

To Top