টুকিটাকি

পাহাড় মাটি কাঁপানো অগ্নিকন্যা কাকন বিবি

পাহাড় মাটি কাঁপানো অগ্নিকন্যা কাকন বিবি neonaloy

দেখতে দেখতে ৫০ বছরইতো হয়ে গেল। ভাবুন তো সেই সময়ে এক খাসিয়া নারী বাংলার মুক্তি সংগ্রামে লড়ছেন, শুধু যে সাধারণ কোন লড়াইয়ে তা নয়। গতানুগতিক সম্মুখ সমরতো আছেই, সে সাথে একাধারে করছেন গুপ্তচরবৃত্তিও।

ভাবুন তো পাহাড় ঝিরি জল জঙ্গল পারি দিচ্ছেন হাতে স্ট্যাগান বা রাইফেল নিয়ে, ঝুলিয়ে রেখেছেন গ্রেনেড, ৩০ থেকে ৪০ কেজির গোলাবারুদের বাক্স ঘাড়ে তোলে ঘন্টার পর ঘন্টা এক পাহাড় দুপাহাড় করে চলে যাচ্ছেন যুদ্ধের ময়দানে। খাসিয়া ট্রেডিশনাল পোষাক ঝেড়ে ফেলেছেন, পাকবাহিনীর নির্যাতনের পাল্টা ছোবল দিতে মুখের বলি রেখা ফুটিয়ে, আঁচল শক্ত করে টেনে বেঁধে শুধু রাইফেল চালনাতেই দিনকে দিন দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

পাহাড়ি কন্যা বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে চঞ্চল উচ্ছল কোন তরুণী। হা, তেমনই ছিলেন কাকন বিবি। সেই চঞ্চলতাই তার ভেতরে সাহস জুগিয়েছে মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ লড়াই করার।

তিনি কাকন বিবি। মুক্তিযুদ্ধে জিতলেও জীবন যুদ্ধে একরকম পরাজিত সৈনিক হয়ে সবাইকে কাঁদিয়ে মঙ্গলবার রাতে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। সিলেটের ওসমানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন এই বীর নারী। গতবছর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এবার ছিল প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট।

টেংরাটিলাযুদ্ধে শরীরে বিঁধেছিল একাধিক গুলি। শরীরের সে চিহ্ন নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। টেংরাটিলা যুদ্ধের পর আমবাড়ি, বাংলাবাজার, টেবলাই, মহব্বতপুর, বেতুরা, দূরবীনটিলা, আধারটিলায় মোট নয়টি সম্মুখ যুদ্ধে অসম সাহস নিয়ে দেশের জন্য লড়ে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন কাকন বিবি। জীবনের শেষ সময়টাতে কাকন বিবি থাকতেন সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারের আলীপুর ইউনিয়নের ঝারগাঁও গ্রামে।

ভারতবর্ষের মেঘালয়ের এক খাসিয়া পল্লীতে জন্ম  কাকন বিবির। ১৯৭০এ সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের শহীদ আলীর সাথে প্রথম ঘর বেঁধেছিলেন কাকন বিবি। সে সময় খাসিয়া নাম ঝেরে ফেলে নতুন নাম হয় নুরজাহান বেগম। কন্যা সন্তান সখিনার জন্ম হয় শহীদ-কাকনের ঘরে। শহীদ কন্যা সন্তানে খুশি হতে না পেরে মৌখিখভাবেই আলাদা হয়ে যান কাকনের কাছ থেকে। এর কয়েকমাস পর সৈনিক মজিদখানের সাথে বিয়ে হয় কাকন বিবির। মজিদের ঘরে থাকার সময়ে নিজ সন্তান সখিনাকে দেখতে আসেন কাকন বিবি। ফিরে গিয়ে জানেন মজিদের চাকুরিরস্থল বদল হয়েছে।

ততদিনে যুদ্ধ ছড়িয়ে পরেছে। পাক হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পরে তিনদিন অমানুষিক নির্যাতনের স্বীকার হন কাকন বিবি। তিনদিন তাকে বাংকারে আটকে রাখা হয়। সেখান থেকে মুক্ত হয়েই ঝাঁপিয়ে পরেন যুদ্ধে। খোঁজে নেন মুক্তিযোদ্ধাদের। কর্ণেল শওকত আলীর কাছে তাকে নিয়ে যান মুক্তিযোদ্ধারা। শুরু হয় দেশের জন্য কাকন বিবির জানবাজি যুদ্ধ।

একাধারে সম্মুখ যুদ্ধ আর গুপ্তচরবৃত্তি করতে গিয়ে আবারও ধরা পরেন হানাদা বাহিনীর হাতে। গরম রড দিয়ে কাকনের শরিরে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্যাতন করে পাক বাহিনী। সেখান থেকেও বেঁচে ফিরে আবার যুদ্ধে চলে যান কাকন।

যুদ্ধ শেষে মেয়ে সখিনাসহ দুয়ারাবাজারের একজনের বারান্দায় আশ্রয় নিয়ে জীবন শুরু করে। অভাব অনটনে খুদায় কষ্টে বছরের পর বছর কেটেছে কাকন বিবির। সে সময়টা কাকন বিবির গৌরবগাঁথা পুরোটাই ছিলো লোক চক্ষুর অন্তরালে।

১৯৯৬ সালে স্থানীয় একজন সাংবাদিকের কলমে প্রথম উঠে আসে কাকন বিবির কথা। জানতে পারে দেশ। সেসময়ই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাকন বিবিকে এক একর সম্পত্তি দেন। সিলেটের সেসময়ের মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান করে দেন একটি কুঁড়ে ঘর। শুরু হয় দেশব্যাপী আলোচনা। পরিচিতি পান কাকন বিবি। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালেই মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বপূর্ণ অবদানের সম্মানসূচক বীরপ্রতিক উপাধিকে ভূষিত হন কাকন বিবি।

Most Popular

To Top