ইতিহাস

বিশ্বের খ্যাতনামা দশ অপরাধী

বিশ্বের খ্যাতনামা দশ অপরাধী neonaloy

অপরাধ জগতের বাসিন্দাদের জীবন সম্পর্কে আমাদের কৌতুহল একটু বেশিই। আর তা যদি হয় অপরাধ সাম্রাজ্যের অধিকর্তাদের তাহলে কথাই নেই। কে তারা, কি তাদের পরিচয়, কিভাবে অপরাধ করতেন তা জানার আগ্রহে বইপত্র, ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি চলে প্রায়ই। আমারও এ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ। এই জগতের বাসিন্দারা হয় তুমুল মেধাবী ও বুদ্ধিমান। কিন্তু তারা তাদের এই মেধাকে মানবতার কল্যাণে না লাগিয়ে, বরং ধ্বংস করে নিজের বিত্তের সাম্রাজ্য বাড়িয়েছেন। দুর্ধর্ষ সব অপরাধীদের সম্পর্কে জানতে আমার মতো যাদের আগ্রহ তাদের জন্য এই আয়োজন।
বিশ্ব কাঁপানো দশ অপরাধী নিয়ে সাজানো হয়েছে এই লিখাটি। আজ রইলো তালিকার চারজনের গল্প।

১০। লিওনিড মিনিন-

লিওনিড এফিমোভিচ মিনিন ছিলেন একজন আন্তর্জাতিক অস্ত্রপাচারকারী। ২০০০ সালের ৪ আগস্টে ইতালির মিলানের কাছে সিনাইসলে বালসমোমা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ইতালি প্রশাসন। বিশেষ করে পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে সন্দেহজনক অবৈধ অস্ত্র লেনদেনের জন্য ১৯৯২ সাল থেকে মিনিন গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিলেন। ১৯৪৭ সালে ইউক্রেনে জন্ম মিনিনের তবে ১৯৭০ সাল থেকে ইসরায়েলে বসবাস করতে শুরু করে মিনিন। একইসাথে বলিভিয়া, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, মোনাকো এবং ইতালির পাসপোর্টধারী ছিল সে। ইসরায়েলে মিনিন কাঠ ব্যবসায়ী হিসেবে নিবন্ধিত ছিল কিন্তু এর আড়ালে মিনিনের মূল ব্যবসা ছিল অস্ত্র কেনা বেচা। ইসরায়েলে বসবাস করলেও মিনিনের অস্ত্রের ব্যবসা পরিচালিত হতো ইউক্রেন থেকে আর বিক্রি করা হতো আফ্রিকার সংঘাতপূর্ন অঞ্চলের বিদ্রোহীদের কাছে। মিনিনের ছিল শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। তাই তাকে ধরা এতো সহজ ছিল না গোয়েন্দা পুলিশের জন্য। এভাবে মিনিন গড়ে তোলে এক বিশাল সাম্রাজ্য। অর্থ, বিত্ত ও প্রাচুর্যে ভরা বিলাসী জীবন যাপন করতো মিনিন।

বিশ্বের খ্যাতনামা দশ অপরাধী neonaloy

 

১৯৭০ এর দশকের মাঝামাঝি লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও ইউরোপ জুড়ে কয়েকটি দেশে তেল ও কাঠের ট্রান্সপোর্টার হিসেবে কাজ করার ফলে বিভিন্ন আন্ডারগ্রাউন্ড লোকজনের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে তার। ১৯৯০ সালের দিকে পুলিশের তালিকায় জালিয়াতি এবং মানি লন্ডারিং হোতা হিসেবে নাম ওঠে মিনিনের। কিন্তু তখন পর্যন্ত পুলিশ জানতো না মিনিনের মূল ব্যবসা সম্পর্কে। ১৯৯৯ সালে লাইবেরিয়ায় ৬৮ টন অস্ত্র চোরাচালান আটকের তদন্তে প্রথম মিনিনের নাম পুলিশের সামনে আসে। এরপরই তদন্তে পুলিশ জানতে পারে মিনিনের বিশাল অস্ত্র কারবারের সাম্রাজ্যের কথা। ২০০০ সালে ইতালি কর্তৃক মিনিনকে গ্রেপ্তারের পর তাকে তুলে দেয়া হয় ইউক্রেন সরকারের হাতে। কিন্তু ইউক্রেন সরকার তাকে গ্রেপ্তারের বদলে আসলে রক্ষা করে। ইউক্রেন তাকে মাত্র দুই বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত করে, সে সময়ে মিনিনকে নিয়ে মিডিয়ায় অনেক সংবাদ প্রচার হয়েছিলো, কিন্তু রহস্যজনক বিষয় হলো এরপর তার কারাবাসের কথা বা সে কোথায় আছে এ বিষয়ে কিছুই জানা যায় না।

০৯। চার্লস পুঞ্জি-

পুঞ্জি স্কীমের নাম শুনেছেন? অর্থনীতিতে বহুল প্রচলিত এক চিটিং এর নাম পুঞ্জি স্কীম। বেশি মুনাফার লোভ দেখিয়ে ভুয়া ব্যবসায় অর্থ লগ্নির ফাঁদ পাতার নামই হলো পুঞ্জি স্কীম। এই নাম আসে একজন ব্যক্তির নাম থেকে। যিনি ইতিহাসে ‘ফিন্যান্সিয়াল জিনিয়াস’ নামে পরিচিত। অবশ্য এই জিনিয়াস তকমা তার কোন সুখ্যতির জন্য নয়, বরং মানুষকে ঠকিয়ে সম্পদের বিশাল পাহাড় বানানোর জন্য তাকে এই উপাধি দেয়া হয়েছে। নাম তার ‘কারলো পিয়েত্রো জিওভানি গুজলিয়েলমো টেবালদো পুঞ্জি’ ছোট করে চার্লস পুঞ্জি।

বিশ্বের খ্যাতনামা দশ অপরাধী neonaloy

১৮৮২ সালে ইতালিতে জন্ম নেয়া চার্লস পুঞ্জি পেশা জীবন শুরু করেন ডাক বিভাগের চাকরির মাধ্যমে। এরপর হোটেল বয়, ব্যাংক ম্যানেজার, অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত দিয়ে মানব পার- এমন অনেক কাজই করেছেন চার্লস পুঞ্জি। এসময় কখনো চুরি, কখনো সই জালের মাধ্যমে অর্থ জালিয়াতি করে বার বার জেল খেটেছেন তিনি। ১৯১১ সালে তার দুই বছর একমাসের জন্য জেল হয়। পরে জেল থেকে বের হয়ে শুরু করেন ডাক মাশুলের ব্যবসা। প্রতিষ্ঠা করেন সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ নামে নিজের একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের মূল কথা ছিলো ‘টাকা দিলে দ্বিগুণ লাভে ফেরত’। কিছুদিন মানুষকে দ্বিগুণ মুনাফা দিয়ে একসময় যখন ব্যবসার পরিধি বাড়ে তখন হাতিয়ে নেন সব টাকা। সেই সময় বিনিয়োগকারীদের পুঞ্জিকে দেয়া অর্থের পরিমাণ ছিল দুই কোটি ডলার। বোস্টন পোস্ট নামে এক পত্রিকা তখন পুঞ্জির নামে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করলে খুলে যায় সব পর্দা। এরপর গ্রেপ্তার হন চার্লস পুঞ্জি। ১৯৩৪ সালে মুক্তি পেয়ে প্রথমে ইতালি ও পরে ব্রাজিল চলে যান। শেষ জীবন অনেক কষ্টে কেটেছিলো চার্লস পুঞ্জির।

০৮। জেসি জেমস

ব্যাংক ডাকাত, ট্রেন ডাকাত, গেরিলা, দস্যু, খুনী কি ছিলেন না জেসি জেমস। মূল নাম জেসি উইডন জেমস, ১৮৪৭ সালে জন্ম নেন আমেরিকার মিসৌরিতে। কথিত আছে তিনি ধনীদের কাছ থেকে লুট করে গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। তাই তাকে রবিন হুডের সাথে তুলনা করা হয়। তবে ইতিহাসে এমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। লুটপাটের জন্য জেসির ছিল নিজস্ব এক গ্যাং। এই গ্যাংয়ের সদস্যদের ডাকাতির জন্য অতিষ্ঠ হয়ে উঠে প্রশাসন। তাই ধার্য করা হয় জেসির মাথার দাম। পুরষ্কারের লোভে তারই গ্যাং এর সদস্য রবার্ট ফোর্ড গুলি করে হত্যা করে জেসি জেমসকে। সালটা ছিল ১৮৮২।

বিশ্বের খ্যাতনামা দশ অপরাধী neonaloy

 

০৭। আমাদো ক্যারিলো ফুয়েন্তেস

অপরাধ জগতের এক ভারী নাম আমাদো ক্যারিলো ফুয়েন্তেস। যেমনটি দেখেন দুর্ধর্ষ অপরাধ জগতের চিত্র নিয়ে তৈরি বা কোন মাফিয়া ডনের উপর ভিত্তি করে তৈরি চলচ্চিত্রে, তার চেয়েও ভয়ংকর অপরাধী ছিলেন ফুয়েন্তেস। বৃহত্তর মেক্সিকোতে মাদকের সাম্রাজ্য স্থাপন করেছিলেন তিনি। নিজের বসকে খুন করে তার মাদকের কারবার আয়ত্ত্বে নিসে আসেন ফুয়েন্তেস। তিনি ছিলেন পুলিশের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকার শীর্ষে। পুলিশের চোখকে ধোঁকা দিতে প্লাস্টিক সার্জারি করিয়ে চেহারা পরিবর্তন করতেন তিনি।

বিশ্বের খ্যাতনামা দশ অপরাধী neonaloy

 

আমাদো ক্যারিলো ফুয়েন্তেসের মালিকানায় ছিল ৭২৭ টি বিমান। এসব বিমানের মাধ্যমে তিনি তার ড্রাগ বাণিজ্য চালিয়ে যেতেন। তাকে ডাকা হতো ড্রাগ লর্ড নামে। বিশাল এই ড্রাগ বাণিজ্য প্রায় নির্ঝঞ্জাট ভাবেই চালিয়ে গিয়েছিলেন নিজের মেধা ও দক্ষতা দিয়ে, একসময় তিনি আমেরিকা ও মেক্সিকো প্রশাসনের নজরদারীতে আসেন। বাড়তে থাকে এই ড্রাগ লর্ডকে ধরার চেষ্টা। এই চেষ্টাতে ছাই দিতে আবারো প্লাস্টিক সার্জারীর আশ্রয় নেন ফুয়েন্তেস। তবে এবার বিধি বাম হয় তার। বার বার প্লাস্টিক সার্জারী করানোয় এবারের অস্ত্রোপচার জটিল হয়ে পড়ে। মেক্সিকোর সান্তা হসপিটালে প্লাস্টিক সার্জারীর সময় মারা যান ফুয়েন্তেস।

আরো পড়ুনঃ মাদক সম্রাট এলচাপোর উত্থান-পতন, পাবলো এসকোবারের কাহিনী

Most Popular

To Top