টুকিটাকি

দুর্যোগ শিশু

দুর্যোগ শিশু neonaloy

ইউএস বাংলার এয়ার ক্রাফট নেপালে বিধ্বস্ত হওয়ার পর প্রতিটি যাত্রীর জীবন যেনো আলাদা আলাদা গল্প হয়ে ফুটে উঠেছে টেলিভিশন, পত্রিকার পাতায়। প্রতিটি জীবনই আলাদা আলাদা উপস্থাপন, প্রতিটির শেষই গেঁথে গেছে শুধু দেশ নয় দেশের বাইরেরও লক্ষ কোটি মানুষের মন।

এসবের মাঝে ঐ বিমানের যাত্রী না হয়েও আরও একজনের নাম কাঁদিয়েছে, ভাবিয়েছে, জায়গা করে নিয়েছে মানুষের মনে। সেটি হলো আড়াই বছরের এক শিশু। যাকে তার মা আদর করে ডাকতেন হিয়া পাখি। সেই হিয়া পাখির গল্প জানাতে গিয়েই আজ বাংলাদেশের বিভিন্ন দুর্যোগ দুর্ঘটনায় আলোচনায় উঠে আসা আরও কয়েকজন শিশুর গল্প শুনুন এই ‘দুর্যোগ শিশু’ থেকে।

হিয়া পাখি:

আড়াই বছরের ফুটফুটে শিশু হিয়া উত্তরায় থাকতো শুধু মা নাবিলার সাথে। হিয়ার মা শারমিন আকতার নাবিলা নেপালে দুর্ঘটনা কবলিত ইউএস-বাংলা ফ্লাইটের কেবিন ক্রু ছিলেন। দুর্ঘটনার পরপরই নাবিলা মারা যান। তার লাশ পুড়ে ঝলসে যাওয়ায় এখনও চিহ্নিত করা যায়নি। হিয়ার বাবা মেহেদি হাসানকে কখনও বলা হয়েছে প্রবাসী, কখনও বলা হয়েছে পলাতক মাদকাসক্ত। শেষতক জানা গেছে বৃহস্পতিবার কাশিমপুর কারাগার থেকে একটি মামলা থেকে জামিনে বেরিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ বাবা থেকেও না থাকার মতো।

দুর্ঘটনার দিনই হিয়ার নানী নাবিলার বাসা থেকে হিয়াকে নিয়ে লুকিয়ে ফেলেন। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কম তোলপাড় হয়নি। শেষতক পুলিশের সহায়তায় হিয়া অভিভাবকত্ব নিয়ে পারিবারিক নানান টানাপোড়েনের পর হিয়ার দাদি খাদিজা বেগমের কাছে দেওয়া হয়েছে হিয়াকে।

আড়াই বছরের শিশুটি মায়ের মৃত্যু বিষয়টিই বোঝে না। বোঝেনা সংসারের কোনও রীতিনীতি নিয়মকানুন বা ভবিষ্যত ভাবনা। কিভাবে বেড়ে উঠেবে হিয়া, কি তার ভবিষ্যত। কারাইবা দেখে রাখবে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে হিয়া বলে, আম্মু নাই-আম্মু অফিস গেছে।
এরই মধ্যে হিয়ার নানা আর দাদার পরিবার টানাটানি শুরু করেছে কে তার মা নাবিলার লাশ বুঝে নিবেন তা নিয়ে। এক সময় আসবে ক্ষতিপূরণের লক্ষ লক্ষ টাকা। এসবের মাঝে কতটা সুস্থভাবে বেড়ে উঠবে হিয়া। সে প্রশ্ন আর ভাবনায় অনেকেই কাতর হচ্ছেন এখন।

সিডর শিশু লাকী আর জনি:

২০০৮ সালে প্রলয়ংকরি ঘূর্ণিঝড় সিডরে বাংলাদেশের উপকূলে নিহত হয়েছিলেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। সে সময় প্রায় এক হাজার শিশু বাবা মা হারিয়ে এতিম হয়েছিলো। সেই শিশুরাই পরিচিতি পেয়েছিলো সিডর শিশু হিসাবে। তাদেরই দুজনের গল্প শুনুন আজ।

সিডরের পাঁচ দিন পরের ঘটনা। জায়গাটির নাম বগি। এটি উপকূলবর্তী জেলা বাগেরহাটের স্মরণখোলা উপজেলার সুন্দরবন ঘেঁষা গ্রাম। একটি ত্রাণবাহি এবং সাংবাদিক দল ঘুরে চলে আসছিলেন ঐ এলাকা থেকে। নৌকা চলছে নদীর পার ধরে। দুই পারে বিধ্বস্ত জনপদের ছাপ। হঠাৎ দূর থেকে মনে হলো দুটি ছোট শিশু নদীর পারে বসে আছে। তাদের গায়ে ঝিলমিলে রঙ্গিন পোষাক। গায়েও আবছা বোঝা যায় যে রঙ্গিন ঝলমলে কিছু যেনো ঝুলেছে। আশপাশে কোনও বাড়িঘরের অস্তিত্ব নেই, নেই কোনও জনমানুষ।

কিছুটা কাছে এগিয়ে যেতেই বোঝা গেলো শিশু দুটিকে স্পষ্ট। তাদের গায়ে নতুন পোষাক ঠিকই। আর গলায় ঝুলানো আছে ত্রাণ থেকে পাওয়া বিশ পঁচিশটি ছোট ছোট কেকের প্যাকেট। একটা করে খাচ্ছে দু ভাই-বোন লাকি আর জনি।
দুজনেই জানালো, সিডরের রাতেই তাদের দুজনকে রেখে চিরতরে চলে গেছে তাদের বাবা। বাবা হারিছ এই নদীর পারে ছোট একটা কুঁড়ে ঘর বেঁধে নদীতে মাছ ধরে সংসার চালাতেন। সিডরের রাতে বানের পানিতে প্রথমেই বাবা হারিছ ভেসে যান। মা লাকিকে নিয়ে একটা গাছ ধরে বেঁচে ছিলেন বেশ কিছুক্ষণ। শেষতক না পেরে মেয়ে লাকীকে নিজের গায়ের শাড়ি কাপড়টি দিয়ে ভালো করে গাছের ডালে বেঁধে দিয়ে নিজে ভেসে যান পানিতে। পরদিন লোকজন গাছ থেকে লাকিকে উদ্ধার করে। আর জনি নিজেই একটি গাছ ধরে ভাগ্যগুনে ভাসতে ভাসতে বেঁচে গিয়েছিলো সে রাতে।
লাকি আর জনির কথা সেসময় সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসলে তাদের দায়িত্ব নিয়েছিলো একটি বেসরকারি সংস্থা।

পাহাড় ধ্বসের শিশু আরও এক লাকি:

২০০৬ এর চট্টগ্রামের স্মরনকালের ভয়াবহ পাহাড় ধ্বসের কথা অনেকেই হয়তো এখন ভুলে গেছেন। সে সময়ে চট্টগ্রাম শহরের আশপাশেই কেবল মারা গিয়েছিলেন দেড়শ মানুষ। তাদেরই এক পরিবারের কথা।

চট্টগ্রাম শহরের একদম প্রাণ কেন্দ্র রেলওয়ে কলোনি এলাকার বস্তিতে ছয় সদস্যের আলিমের পরিবারের ৫ জনই মারা গিয়েছিলেন পাহাড় ধ্বসে। মৃত্যু শুধু পাহাড় ধ্বসের মাটি চাপা পড়ে হয়েছিলো তাই নয়। যে ঘরটিতে তারা থাকতেন সে ঘর মাটি চাপায় ধ্বসে প্রায় হাঁটুপানির নিচে চলে গিয়েছিলো।
কাকতালিয় হলেও সত্যি যে রাতে দুর্ঘটনা ঘটলেও, পরদিন সকালে উদ্ধার কর্মীরা সে বিধ্বস্ত ধ্বংসস্তুপের একটি খাটের কোণা থেকে উদ্ধার করে এক মাসের এক শিশু মেয়ে সন্তানকে। সেই উদ্ধারের পরই শুরু হয় হুলুস্থুল। সংবাদ মাধ্যম হয়ে শিশুটির নাম রাখা হয় লাকি। লাকিকে নিতে এগিয়ে আসেন অনেকেই। শেষমেশ সরকারি শিশু সদনে জায়গা হয় লাকির।
এরপর দক্ষিণ কোরিয়া প্রবাসী লাভলু নামে সেসময়ের এক যুবক নিজের মেয়ে পরিচয়ে ঐ শিশু সদনেই সব খরচ চালিয়ে বড় করতে থাকেন লাকিতে। লাভলুকেই বাবা হিসাবে চেনে লাকি। দেখতে দেখতে পাহাড় ধ্বসের শিশু লাকি এখন প্রায় ১২ বছরের কিশোরী।

সড়কের শিশু জান্নাতুল ফেরদৌস:

যতটা না জান্নাতুলের কথা মানুষ জেনেছে মৃত্যু সময়ে তাকে জড়িয়ে থাকা তার মায়ের ছবিটি কাঁদিয়েছে সারা দেশের মানুষকে। এতোক্ষণ আমরা দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া কয়েকজন শিশুর গল্প শুনলেও জান্নাতুলের গল্পটা যেনো প্রাণ গেলেও মানুষের মনে বেঁচে থাকা এক শিশুর গল্প। যে ছবি সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসার এক অকৃত্রিম প্রতীক হয়ে জেগে থাকবে মানুষের হৃদয়ে।
গত বছর ২৮ জুন। খাগড়াছড়িতে ভয়াবহ সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যান তিন জন। সে দুর্ঘটনার এক মর্মস্পর্শী ছবি ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সন্তানের জন্য মায়ের মন যে মৃত্যু সময়েও ব্যাকুল থাকে তাই যেনো প্রমাণ করেছিলো ছবিটি। ছবিতে দেখা গেছে, মৃত্যুর সময়েও জান্নাতুলের মা কিভাবে বুকে আঁকড়ে রেখেছিলেন পরম মমতায় তার শিশুকে।
আরমান হোসেন নামে একজন ইউনিয়ন ওয়ার্ড কমিশনার তার মোবাইল ফোনে ছবিটি তুলেছিলেন। সে দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন খাগড়াছড়ির হাফছড়ি এলাকার তরিকুল, রিপন আকতার ও তার মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস।
মা সন্তানের অকৃতিম বাঁধনের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠা সে ছবি এখনও ঘুরে ঘুরে আসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শেয়ারে।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top