ফ্লাডলাইট

নিদাহাস ট্রফিঃ আশার বেলুন ও কিছু বাস্তবতার কথা

নিদাহাস ট্রফিঃ আশার বেলুন ও কিছু বাস্তবতার কথা- নিয়ন আলোয়

শ্রীলঙ্কার মাটিতে শ্রীলঙ্কাকেই দুই দুইবার হারিয়ে নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে। উত্তেজনা চরমে। উত্তেজনার চোটেই ভারতকে হারিয়ে দেব।

কিন্তু হল না, শেষমেষ হতাশায় পুড়তে হল।

আমি সবসময় একটা কথা বিশ্বাস করি,যে পানিতে আগুন লাগানো আর হতাশায় পুড়ে ছাই হওয়া, দুটোই একপ্রকারের অর্থহীন ব্যাপার। তাই হতাশাকে পাশে রেখে একটু বাস্তবতায় আলোকপাত করি।

সাব্বিরের ইনিংস নিয়ে একটু খচখচানি আছে আমার। ৭৭ রানের মধ্যে বাউন্ডারি মেরে ৫২ রান করেও বাকি ২৫ রান সে করেছে ৩৯ বলে। টি২০ ক্রিকেটে এটা গুরুতর অন্যায়!

তবে শুধু সাব্বির বলেই মাফ করে দিলাম। জ্বি ডট বলটাও বাদ দিলাম। অফফর্মে থেকেও এমন খেলাটা কিছুটা হলেও ক্রেডিট ডিসার্ভ করে। সাব্বির সেই তুলনায় দূর্দান্ত খেলেছে। তাই সাব্বিরকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

তো সাব্বির তো ৭৭ হলেও করেছে। বাকিদের পারফর্ম্যান্স কি? ওরা(ভারত) এক্সট্রা দিয়েছে ৬ রান। বাকি থাকে ১৬০। ১৬০ থেকে ৭৭ বাদ দিলে থাকে ৮৩। মানে এক সাব্বির বাদে বাকি সবাই মিলে করেছে ৮৩! সেকেন্ড হায়েস্ট রান রিয়াদ ভাইয়ের ২১।

একটা ফাইনাল ম্যাচে এই ব্যাটিং দিয়া জয় আশা করেন? আবেগের দিক থেকে আশা করা যায়, কিন্তু লজিকালি? তাও আবার ইন্ডিয়ার সাথে?

এইগুলা চিন্তা করলে জানবেন আমাদের বোলাররা আজকে কি করেছে। যে ভারত রেগুলার ২০০ চেজ করে, এই ১৬৬ চেজ করতে সেই ওদেরই ২০ ওভার পুরোটা খেলতে হয়েছে। যে মুস্তাফিজ পুরাটা টুর্নামেন্টে সেকেন্ড স্পেলে মার খেয়েছে সে আজ পুরো চার ওভার মিলে দিয়েছে ২১ রান।  যে রুবেল, যার উপরে আপনারা সবাই ক্ষেপা, ঐ ২২ রান বাদ দিলে আগের ৩ ওভারে সে রান দিয়েছে ১৩। অপু এবং সাকিব্বাই ভাল বোলিং করেছে।

শেষ ওভারে মাত্র ১২ রান ডিফেন্ড করা দুনিয়ার সেরা বোলারদেরও কাম্য না। সেখানে সৌম্য সরকার একজন পার্টটাইমার হয়ে শেষ ওভারে ১২ রান ডিফেন্ড করে ফেলেছিল প্রায়। ওরও ক্রেডিট প্রাপ্য।

ফিল্ডিং নিয়েও কথা বলা যাক। এতগুলো রানআউট মিস করার পরেও যে খেলা শেষ ওভারের শেষ বল পর্যন্ত  গেছে, সেটাও কম আশ্চর্যের বিষয় নয়। কিন্তু ব্যাপার হল,এমনটা কেন হল? আমাদের খেলোয়াড়রা কি ফিল্ডিং এ খারাপ?

উত্তরঃ মোটেও না। তবে এরকম হাই ভোল্টেজ ম্যাচে ফিল্ডিং যতটা না শারীরিক ব্যাপার, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার। এই মনস্তত্ত্বটাই মূল সমস্যা। আমরা এমন হাই ভোল্টেজ সিচুয়েশনে খুব কম পড়ি। অথচ ভারতীয়রা আইপিএল হোক আর সৈয়দ মুস্তাক আলী ট্রফিই হোক বা  রাজ্যভিত্তিক টি২০ টুর্নামেন্টই হোক, ওরা এমন সিচুয়েশনে নিজেদের পোক্ত বানিয়ে এরপরেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলতে নামে।

তবে এ থেকে  উত্তরণের পথ কি? সেটাও উপরেই দেয়া আছে।  ওদের মত ৩ স্তরের টি২০ কাঠামো দরকার নেই, অন্ততঃ দ্বিস্তর বিশিষ্ট একটা কাঠামো দাঁড় করানোই যায়। বিপিএলের পরে একটা ২য় স্তরের ঘরোয়া টুর্নামেন্ট যেটাতে কোন বিদেশীকে আনা হবেনা। হোম অ্যান্ড এওয়ে ভিত্তিতে আমরাই খেলব। টি২০ এর মনস্তত্ত্ব গঠন তো হবেই,সাথে এত যে হার্ড হিটার ব্যাটসম্যান বা পেস বোলিং অলরাউন্ডারের জন্য হাহুতাশ করি, সেটাও থাকবেনা। আর বিপিএলে বিদেশী কোটা অবিলম্বে ২জন, সর্ব্বোচ্চ ৩জন করা উচিত এবং হোম অ্যান্ড এওয়ের ব্যাপারটা সেখানেও আনা উচিত। এতে সব মাঠে পিচের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, বড় টার্গেট চেজ করা বা ছোট টার্গেট ডিফেন্ড করা সবই আয়ত্তে এসে যাবে। কিন্তু যতদিন এসব না হচ্ছে, ততদিন আশার বেলুনটাকে চুপসিয়ে হাতের মুঠোতেই রাখুন, বেশি ফোলাতে যাবেন না।

শেষ কথা,আমরা চেষ্টা করেছি। কিন্তু টি২০ শেষমেষ ব্যাটসম্যানদের খেলা। এভারেজে ১৮০-১৯০ করার প্র্যাকটিস না থাকলে দলে ম্যাকগ্রা, ওয়ালশ, ওয়াসিম আকরাম, জহির খান, মুরালি, ভাস এনেও লাভ নেই। একজন ব্যাটসম্যান ঠিকই সেট হবে। আরেকজন এসে শেষ ওভারে তুমুল মার দেবেই। বোলার যতই ভালো হোক একটা বাজে ওভার করবেই। এসব মেনে নিয়েই যত ভালো করা সম্ভব সেটা ব্যাট হাতেই করতে হবে। শুনতে খারাপ লাগলেও সত্যি ২০ ওভারের খেলায় বোলিংটা একটু ড্যামেজ কন্ট্রোল ছাড়া কিছুই না। এই ম্যাচ জিততে হয় ব্যাট হাতে।

ফাইনালটা জিততে পারতেছিনা। দরকার নেই। ব্যক্তিগতভাবে আমার এই নিদাহাস ট্রফি থেকে কিছু পাওয়ার ছিল না। সবগুলা ম্যাচ হেরে আগেই বিদায় নেয়ার বাইরে কিছু হলে সেটাই আমার জন্য অনেক বেশি হত। সেই হিসাবে যা পেয়েছি সেটাই অনেক।

শেষে এসে একটা উপদেশ দেই। ক্রিকেটের অবস্থা খুব একটা ভালো না। উপরে টি২০ স্ট্রাকচার নিয়ে একটা স্বপ্নের কথা লিখেছি। কিন্তু এটা এতদিনে বাস্তব হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। বড় দুঃখের কথা, ক্রিকেট খেলি প্রায় ৩০ বছর ধরে,কিন্তু কোন ক্রিকেট স্ট্রাকচার নেই। ক্রিকেট সংস্কৃতি নেই।পরিপক্ক সমর্থক, সে আশায় গুড়ে বালি। এর মধ্যে “জিতবই,জিততেই হবে” এমন বলে সোশ্যাল মিডিয়া কাঁপিয়ে লাভ নেই। যা পাচ্ছেন তাতেই খুশি থাকুন। যেটা আসছে অন্য দলগুলো এই অবস্থা থেকে ওটাও আনতে পারত না কিনা সন্দেহ। আমরা পারছি। এসব চিন্তা করলেই দেখবেন,মন খারাপ লাগছেনা, বরং শান্তির একটা ঘুম আসছে। না হলে ইন্ডিয়ান আর শ্রীলঙ্কান পেজে ওদের দেশের নামকে বিকৃত করে  গালি দিতে দিতে এরকম পরিস্থিতিতে ম্যাচ হেরে লজ্জা পেতে হবে। ক্রিকেটাররা যেহেতু আপনাকে এসে অনুরোধ করে যাননি যে আপনি তাদের ‘সমর্থন’ করে এভাবে উদ্ধত আচরণ করুন, সুতরাং আপনার লজ্জা পাওয়ার দায়টাও তারা কোনভাবেই নেবেন না। ঐ লজ্জাটা আপনার। শুধুই আপনার।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top