ফ্লাডলাইট

ক্রিকেট নিয়ে এত আবেগ আসে কোথা থেকে?!?

ক্রিকেট আবেগ নিয়ন আলোয় neon aloy

আমি বার বার বলি, লিখি। জানিনা অন্যরা বিরক্ত হন কিনা। কিন্তু সত্যটা হচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের এই যে এগিয়ে যাওয়া, বলে কয়ে একে তাকে হারানো, ভারত, নিউজিল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা, পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নাস্তানাবুদ করা, ২০ ওভারে ২১৪ তাড়া করে ঘরে ফেরা, ৪ বলে ১২ রান দরকার হলে সেটি নিয়ে ঘরে ফেরা এগুলো দেখে আমি খুব উচ্ছাসিত হবার সাথে সাথে একটা সুতীব্র আনন্দময় কান্না আমার ভেতরে বইতে থাকে। শুধু আমার না আমার ধারনা আমার মত অনেকের এই একই অনুভূতি হয়।

কেন বলছি এই কথা?

আমরা যারা একেবারে স্পষ্ট করে কিছু স্মৃতি মনে করতে পারি, এই কথাগুলো তাঁরা বুঝবেন। আমি নিশ্চিত নই আজকের জাতীয় দলে একেবারেই বয়সে কম সোহান, অপু, মুস্তাফিজরাও এইসব আবেগ ধরতে পারেন কিনা।

“এখনকার তরুন-কিশোর দর্শকরা যেমন অন্য দেশের দর্শকদের সাথে তেড়েফুঁড়ে ঝগড়া করে, একদিন আমরা তা পারতাম না। আমরা মাথা নীচু করে ঘরে ফিরতাম। আমরা কান্না বাম হাতে মুছে বাসায় রাগ করে খেতাম না।”

কুয়ালালামপুরের কিলাত ক্লাব মাঠের গল্পে পরে আসি, আগে আসি তারও আগের ঘটনায়।

৯০ এর শুরুর দিকে সিধু, আজহার উদ্দিন, মার্ক টেইলর, স্টিভ ওয়াহ, মার্ক ওয়াহ, হ্যান্সি ক্রনিয়ে, ফ্লেমিং, ওয়াসিম আকরাম এদের খেলা আমরা গরীব প্রজার মত দেখতাম। রঙ্গিন কিংবা সাদা পোষাকে এরা খেলতো সারা বিশ্ব দাপিয়ে আর আমরা অলীক কল্পনাতেও কোনদিন ভাবতে পারতাম না এদের সাথে একই মাঠে খেলা যায়।

সুনীলের একটা বিখ্যাত কবিতা আছে না? কেউ কথা রাখেনি। সে কবিতার কয়েকটা লাইন ছিলো এমন-

“লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্কর বাড়ির ছেলেরা
ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি ভেতরে রাস উৎসব
অবিরল রঙ্গের ধারার মধ্যে সুবর্ণ কঙ্কণ পড়া ফর্সা রমণীরা কতরকম আমোদে হেসেছে
আমার দিকে তারা ফিরেও চায়নি !
বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন আমরাও…”

এশিয়া কাপের সুবাদে ফি বছর (তাও অনেক পরে) ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকার মত দলের সাথে খেলার যে সুযোগ হতো, সেটির জন্য আমরা বর্তে যেতাম। মনে আছে কোন এক এশিয়া কাপে আতাহার আলী খান ৮২ রান করেছিলো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। আহা…তাতেই কি গর্ব। এইসব দলের সাথে ১২০, ১৫০, ১৮০ এমন রান করতে পারাটাই আমাদের কাছে ছিলো ভাগ্যের ব্যাপার।

৪ বছর পর পর বিশ্বকাপ এলে স্বপ্ন দেখতেও ভয় হতো যে এই মহা আয়োজনে বাংলাদেশ থাকতে পারে। ওরা মহা শক্তিধররা খেলতো একজন আরেকজনের সাথে। আমরা এর তার বাসায় গিয়ে সেসব খেলা দেখতাম। সেই সময় সবার বাসায় ডিশও তো ছিলোনা। আর আমরা সে সময় খেলতাম পাপুয়া নিউগিনি, আর্জেন্টিনা, কেনিয়া, আরব আমিরাত এদের সাথে। পন্টিংদের যুদ্ধ হতো শ্রীনাথদের সাথে, আর আমাদের যুদ্ধ হতো স্টিভ টিকোলো, মরিস ওদুম্বেদের সাথে।

“এক এশিয়া কাপে পাকিস্তান আমাদেরকে এমন অপমান করেছিলো যে তারা ওয়াজেতুল্লাহ ওয়াস্তি, ইজাজ আহমেদ কিংবা বল পারেনা এমন ব্যাটসম্যানদের দিয়ে আমাদের বল করিয়েছিলো।”

ঢাকার মাঠে সার্ক ক্রিকেটে ভারতের এ দল পাঠানো হোতো। আমরা তাতেই বর্তে যেতাম। মনে আছে সার্ক ক্রিকেটে, খুব সম্ভবত ৯৫ সালে ভারতের এ দলকে ১ রানে আমরা হারিয়েছিলাম। সে সময় বাঁ হাতি আনিসুর ছিলো আমাদের তারকা। আরেকজন পেসার ছিলেন সজল চৌধুরী নামে। সেদিন স্টেডিয়াম ভেঙ্গে দর্শক মাঠে ঢুকে যায়। আর তার পরেই ঢাকা স্টেডিয়ামে দেয়া হয় উঁচু ফেন্স।

আইসিসি ক্রিকেটে যেদিন বাংলাদেশ স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপে যাবার যোগ্যতা অর্জন করেছিলো। আহা, সেই দিন। মনে আছে খুব সম্ভবত স্কটল্যান্ডের সাথে খেলার দিন। মালয়েশিয়াতে মাঠ ভেজা ছিলো, কিন্তু আমাদেরকে সে ম্যাচ খেলতেই হবে। না খেললে বা জিতলে আর ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে যাওয়া হবে না। সেদিন আকরাম খান, গোল্লা, নান্নুরা, বুলবুলরা, এনামুল হক মনি, সাইফুল ইসলাম, হাসিবুল হাসান শান্ত’রা রুম হোটেল থেকে টাওয়াল এনে নিজেরাই মাঠ শুকোবার জন্য লেগে গিয়েছিলো।

একটা লাল ব্যান্ডের শস্তার রেডিও ছিলো আমার। লম্বা এন্টেনা উঁচিয়ে বাড়ির এই ঘরে ও ঘরে গিয়ে সিগনাল ধরতাম। সূদূর মালয়েশিয়া থেকে চৌধুরী জাফর উল্লাহ শরাফত-এর কন্ঠকে মনে হতো দেবদূতের কন্ঠ। আহা, কি আবেগ তার। খেলোয়াড়দের প্রতি মুভমেন্ট একটা একটা করে বলতেন তিনি।

“সজোরে কাভার ড্রাইভ করেই আকরাম খান দৌড় দিলেন…এক রান…”

৯৭ সালে যেদিন কেনিয়াকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হোলো বাংলাদেশ পুরো রাস্তায়, পুরো দেশে রঙের ছড়াছড়ি। বাবা রঙ দিয়েছে ছেলেকে, ছেলে রঙ দিয়েছে বাবাকে। পুরো দেশ ছেয়ে গেছে রঙ্গে। যে তরুন এলাকার তরুনীর প্রেমে পড়ে সে কথা বলতে পারেন নি, সে তরুন ক্রিকেটের সুবাদে রঙ লাগিয়েছেন তরুনীকে। তরুনীও প্রেমের রঙ্গে হেসে উঠেছে উচ্ছাসিত শব্দে…

বাংলাদেশ ক্রিকেট সেলিব্রেশন নিয়ন আলোয় neon aloy

বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ

[বাংলাদেশ ক্রিকেটের এরকম আরো এক ডজন উদযাপন দেখুন এই লিঙ্কে- বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেরা এক ডজন সেলিব্রেশন]

দেশে ফেরার পর ক্রিকেটারদের মানিক মিয়া এভিনিউতে সংবর্ধনা দেয়া হোলো। মনে আছে সেই সবুজ আর সাদা স্ট্রাইপের টাই ছিলো তাঁদের গলায়।

আমরা ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম দামাল সামার ক্রিকেট টুর্নামেন্ট কিংবা ক্লাব লীগ ছাপিয়ে আমাদের ছেলেরা বড় হচ্ছে।

আমরাও যে খুব বড় বুড়ো ছিলাম সে সময় তা নয়। আমরা তখন আমাদের সবুজ তারুন্য পার করছি, পার করছি দূরন্ত কৈশোর। কিন্তু সকল স্মৃতি ঝক ঝকে পরিষ্কার।

“আমরা ক্রিকেটে সবচাইতে বেশী ট্রল কিংবা অপমানের শিকার হয়েছি ভারত আর পাকিস্তানী ক্রিকেটার সমর্থকদের কাছ থেকে।”

৯৯ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারালাম, স্কটল্যান্ডকে হারালাম। মনে আছে পাকিস্তানের শেষ উইকেটের পতনের পর আর কিছু হাতের কাছে না পেয়ে আমার বড় বোনের গান শেখার তবলাটা নিয়ে বের হয়ে এসেছিলাম সে রাতে। এক দৌড়ে শ্যামলী থেকে কলেজ গেটের সামনে। মিছিলটা ধরেছিলাম শ্যামলী থেকে। আমার সাথে ছিলেন আমার ফুফাত ভাই সুমন। আহা, সেই রাত…সে স্মৃতি।

তারপর বহু পরাজয় গেছে, বহু অপমান গেছে। ইনফ্যাক্ট অপমান তো সব সময় হতে হয়েছে সব বড় দলের কাছ থেকে। আমাদের জয়কে বলা হত ফ্লুক। আমাদের ডাকা হোতো মিনৌস নামে। এই পাকিস্তানের সাথে জয় নিয়েও কত আলোচনা। অনেকে বলেছিলো পাকিস্তান ইচ্ছে করে হেরে গিয়েছিলো। মানে দাঁড়ালো, আমাদের কোনো অর্জনকেই কেউ মানতে চাইতো না।

আমরা ক্রিকেটে সবচাইতে বেশী ট্রল কিংবা অপমানের শিকার হয়েছি ভারত আর পাকিস্তানী ক্রিকেটার সমর্থকদের কাছ থেকে। তিন নাম্বারে আছে শ্রীলংকা। এই উপমহাদেশের এই পরাশক্তিরা আমাদের ভালোবাসতো না। ওদের সাথে আমাদের প্রেম ছিলোনা। আমাদের তারা অপছন্দ করতো।

“আমি দেখে ফেলেছি একটি দেশের ক্রিকেটারদের সংগ্রাম, তাঁদের বেড়ে ওঠা, তাঁদের সামনে যাওয়া।”

আমাদের পাইলট, নান্নু, আকরাম খান, এনামুল হক মনি, সুজন, হাবিবুল বাশার, সাইফুল ইসলাম, মোহাম্মদ রফিক, আনিসুর রহমান, হাসিবুল হাসান শান্ত, আমিনুল ইসলাম বুলবুলরা আমাদের এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন।

তাঁরা সয়েছেন শত শত গঞ্জনা, অপমান। করেছেন দীর্ঘ সংগ্রাম। মনে আছে নেদারল্যান্ডসের সাথে ২০ রানেই পড়ে গেলো ৪ উইকেট। দিনটা ছিলো শুক্রবার। জুম্মা পড়তে গিয়ে সাথে করে নিয়ে গেলাম সেই লাল ব্যান্ডের রেডিও। আহারে সে কি কান্না। নিশ্চিত ছিলাম আর বিশ্বকাপে যাওয়া হচ্ছেনা। কিন্তু দাঁড়িয়ে গেলেন আকরাম খান আর সাইফুল ইসলাম। আকরাম করলেন ৬৭ আর সাইফুল খুব সম্ভবত ২২। এরপর মোহাম্মদ রফিক এসে উড়া ধুরা পেটালেন। জিতে গেলাম।

আমরা এমন এক সময়ের ক্রিকেট দর্শক যখন বাংলাদেশের সংগ্রাম নিজের চোখে বয়ে বেড়িয়েছি। বাংলা সিনেমায় যেমন জসিম ঠেলা গাড়িয়ে চালিয়ে ধনী হয়, ঠিক তেমন। আমরা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে সেই ঠেলাগাড়ি চালাতে দেখেছি।

তাই দর্শক হিসেবে আমি কিংবা আমাদের মত বয়সের মানুষেরা হয়ত আমার বক্তব্যের সাথে রিলেট করতে পারেন। আমি ৪০ এর খুব কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছি। ছুঁয়ে ফেলব খুব দ্রুত কিন্তু আমার এই ছোঁবার আগে আমি দেখে ফেলেছি একটি দেশের ক্রিকেটারদের সংগ্রাম, তাঁদের বেড়ে ওঠা, তাঁদের সামনে যাওয়া।

এখনকার তরুন-কিশোর দর্শকরা যেমন অন্য দেশের দর্শকদের সাথে তেড়েফুঁড়ে ঝগড়া করে, একদিন আমরা তা পারতাম না। আমরা মাথা নীচু করে ঘরে ফিরতাম। আমরা কান্না বাম হাতে মুছে বাসায় রাগ করে খেতাম না।

এক এশিয়া কাপে পাকিস্তান আমাদেরকে এমন অপমান করেছিলো যে তারা ওয়াজেতুল্লাহ ওয়াস্তি, ইজাজ আহমেদ কিংবা বল পারেনা এমন ব্যাটসম্যানদের দিয়ে আমাদের বল করিয়েছিলো। মনে আছে তখন ক্যাপ্টেন ছিলো মঈন খান। ঢাকা স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে গিয়েছিলাম। মাথাটা নীচু করে ঘরে ফিরেছিলাম।

আমাদের বুলবুল, আমাদের পাইলটরা সুবোধ বালকদের মত আম্পায়ারদের কথা মেনে নিত, অন্য দলের মামদোবাজি মেনে নিতো।

কিন্তু দিন পালটে গেছে। আমি এখন আরাম করে পায়ের উপর পা তুলে সাকিবের অথরিটিটিভ আচরণ দেখি। কি দারুন শক্তিতে তিনি মাঠ থেকে সতীর্থদের উঠিয়ে নিয়ে যাবার মত সাহস রাখেন, কি নির্দ্বিধায় তিনি অন্য দলের বাঘা বাঘা বোলারদের পেটান। আমি দর্শক হিসেবে বহু পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছি। আমি এসব দেখি আর চোখ মুছি। আক্ষরিক অর্থেই কাঁদি।

আমার এইসব কান্নার, এইসব আবেগের যুক্তি আছে। আমি আমাদের ক্রিকেটারদের এই শক্তি আজ উপভোগ করি।

আমার এইসব উপভোগের কারন রয়েছে…

Most Popular

To Top