নাগরিক কথা

উন্নয়নশীল দেশের জাতে উঠলাম, চালাবে কারা?

উন্নয়নশীল দেশের জাতে উঠলাম, চালাবে কারা? neonaloy

উন্নয়নশীল দেশের জিগির অনেক পুরানা বিষয়।
আমরা ছোটবেলা থেকেই ‘বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল’ দেশ; সেটাই শুনে আর লিখে আসছি।
কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি যেহেতু ছিল না তাই স্বল্পোন্নত হয়েই ছিলাম। এবারে এসে রাধা নাচলো, জাতিসংঘও ঘোষণা দিল- ‘ঝাও টুমড়া ঊণ্ণোয়ুনশীল ডেষ একন থিকা’!

আমরাও তিন মন ঘিয়ের কোটায় উঠে, খুশীতে গদগদ হইলাম! এটা হওয়ারই কথা, কেননা স্ট্যাটাস চেইঞ্জ আসলেই একটি অর্জন।

তবে, চৌকিদার প্রমোশন পেয়ে দফাদার হইলে; হুট করে একটু পয়সা বাড়লে; তার বিয়াইন সাব যেমন মোটা চালের ভাত খেয়ে খোঁটা দেয়। এই ঝুঁকিটা নিতে হয় স্ট্যাটাস চেইঞ্জ- এর পরবর্তী আউটকাম হিসেবে।

বাংলাদেশকেও তেমনি এই স্ট্যাটাস চেইঞ্জের ফলে; ৩টা সুবিধার বাইরে গিয়ে রফতানী মার্কেটে খেলতে হবে এখন।
আগের মতো স্বল্পোন্নত দেশের কোটায় আর আমরা স্পেশাল সুবিধা পাবো না।

এখন মার্কেট হবে কম্পিটিশনের, নিজেদের প্রোডাক্টের যোগ্যতা দিয়েই টিকতে হবে।
বর্তমানে গরিব বিক্রেতা হিসেবে বাংলাদেশ ৪০ দেশে অগ্রাধিকারমূলক বাজার প্রবেশাধিকার পাচ্ছে।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর অনেক দেশে এ সুবিধা হারাবে।

৮০ শতাংশ রফতানির টাকা আসে, ইউরোপ থেকে। সেখানে আমাদের আছে জিএসপি কোটা।
গরীব থেকে উন্নয়নশীল দেশ হলে; বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম বাজার ইইউতে রফতানি কমবে।
কেননা জি এস পি কোটার বেনিফিট আর থাকছে না।
এমনকি কানাডা, ভারত ও চীনের বাজারে এখন এলডিসি হিসেবে যে সুবিধা রয়েছে, তা থাকবে না।

এলডিসি দেশ হিসেবে ডব্লিউটিওর কৃষি ও শিল্পে ভর্তুকী ও শুল্ক বিষয়ক সুবিধাও থাকবে না।
মানে আমরা যে ঋণ নিয়ে বিশাল একটা অংশ সদকা হিসেবে মাফ পেয়ে যাই, সেটাও থাকবে না।
আবার ওষুধ রফতানিতে যে ছাড় আছে তাও থাকবে না।
অথচ এই সুযোগ ব্যবহার করেই আমরা এই খাতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম! ফলে রফতানি আয় কমার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে হ্যাঁ, উন্নয়নশীল দেশ হলাম। সম্মান নিয়ে তো মুভ করতে পারবো। এই সম্মানটা দরকারও ছিল।
এখন কি চাই? সত্য হচ্ছে- প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পারলে খুব একটা সমস্যা হবে না।
কিন্তু দুঃখের কথা এই যে, আমরা সেই সক্ষমতা অর্জন করতে পারি নাই।

এবার আসি, নিজেদের পায়ের নিচে মাটিটা কেমন?
একটা দেশ দাঁড়িয়ে আছে- নলেজ ইকনোমির উপরে না। একদম সস্তা ঘামে ভেজা শ্রমের পাটাতনের উপর।
গার্মেন্টসকর্মী হতভাগা মানুষ, মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য বিড়ম্বিত কঠোর শ্রমের মানুষ আর তৃণমূলের ঘাম ফেলা কৃষকেরা মিলেই এই দেশটাকে ‘উন্নয়নশীলের’ সম্মান এনে দিল।
গত ২০ বছরের ম্যাক্রো ইকোনমির মোদ্দা একটা এনালাইসিস করলে এইটাই দাঁড়ায়!
কিন্তু তারা আর আপনাকে টানবে না স্যার!
এই যে কঠিন মার্কেটে ঢুকে গেলেন। এর বাইরে টেনে নেয়ার ইচ্ছা থাকলেও এরা আর পারছে না। এই রকম ১ কোটি মানুষ আপনার সম্পদ থেকে বোঝা হয়ে যাবে, আগামী ২০ বছরে।

কারণ এই দেশের ইকোনমির চালিকাশক্তি এই তিনটা গোষ্ঠীই আগামী ২০ বছরে পঙ্গু হতে শুরু করবে । যারা আজকে আপনার সম্পদ তারাই একদিন ঘরে ফিরবে খালি হাতে। হতাশাবাদী হলেও এই পরম সত্য আমাদের মোকাবিলা করতে হবে!

প্রথমে আসি, রেমিটেন্স যোদ্ধা। সেই সব মধ্যপ্রাচ্যের মানুষদের কথায়।
বিদ্যাশে থাকলে সবাই দেশ চালায় না।
ইউরোপ আমেরিকার নিরাপদ দেশে থিতু হওয়া শিক্ষিত শ্রেণি এখানে সেই অর্থে আপনার যক্ষের ধন না।
এই দেশ চলে মাথার ঘাম পা ফেলা মধ্যপ্রাচ্য শ্রমিকের রেমিটেন্সে।

অথচ, ১৫-২০ বছরের মধ্যে রোবটিক ইন্ড্রাস্ট্রিয়ালাইজেশন চলে আসবে মধ্যপ্রাচ্যের দোরগোড়ায়। এটা শুরু হলে সারা মধ্যপ্রাচ্যেই আর নারী গৃহকর্মী ছাড়া কোন পুরুষ শ্রমিক লাগবে না। তেলের ব্যবহারও কমবে নেক্সট ১০ বছরে, নিজেরাই কষ্টে চলবে মিডল-ইস্টার্নরা।
ধরেন, ৪০-৫০ লক্ষ মানুষ বাড়ি ফিরবে এর মধ্যে। এর চাইতে দ্বিগুণ আশংকা করছে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো।
আমি ধরলাম সবচে’ কম ক্ষতির হিসাব!

তো এই ধকল সামলানো যেত।
এক কামাইওয়ালা সন্তান বেকার হলেও, গার্মেন্টসের মেয়েরা তো ছিল!
কিন্তু আম্রিকা ইউরোপে, চায়নায়- থ্রিডি প্রিন্টিং আর অটোমেশন টেক্সটাইল চলে আসবে এই ১০-১৫ বছরেই।

মানে সস্তা শ্রমের গার্মেন্টসও উপযোগীতা হারাবে। ইউরোপ আমেরিকা ইতোমধ্যে নিজেদের দেশে রোবট ব্যবহার করে গার্মেন্টস চালাতে শুরু করেছে।
গরিব দর্জি-দেশে আর তাদের যাওয়া লাগবে না!

৪ মিলিয়ন মানুষের অর্ধেক হিসাব করলেও ২০ লক্ষ গার্মেন্টস কর্মীর চাকুরি নাই হয়ে যাবে।
(ইয়ুভাল হারিরি উনার ‘হোমো ডিউস’ বিষয়ক রিসার্চে বাংলাদেশকেই কেইস স্টাডি ধরেছেন, অটোমেশনের জবলেস প্রসপেক্টের উদাহরণ হিসেবে)
মানে কর্মহীন হয়ে যাবে আরও কমপক্ষে ২০ লক্ষ লো স্কিল্ড মানুষ।
বিদেশ থেকে বেকার হয়ে আসা ৪০-৪৫ লক্ষের সাথে এরাও যুক্ত হবে। এই আগামী ১৫-২০ বছরেই।
এই গেল ৬৫-৭৫ লক্ষ!

আর এরা এই লাল সবুজ খাওয়ায়-পরায় এমন সন্তান। যাদের ঘামে দেশ চলে মূলতঃ। এবার আসি আরেক অন্নদাতা কৃষকদের কথায়!
সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বেড়ে ক্লাইমেট রিফিউজি হবে দক্ষিণাঞ্চল আর ভাটি অঞ্চলের হাওড়ের ১৫ লক্ষ কৃষক। নেক্সট ১৫-২০ বছরেই।
এদেরকেও যোগ করেন।

মানে ভূমিকম্প কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পলিটিক্যাল ঝামেলা! এমন অন্য কোন বিপর্যয় গুণায় না ধরলেও, এই তিনটা ফ্যাক্টেরের একটাতেও আমাদের হাতে নাই!
সব স্রষ্টা আর প্রকৃতির হাতে। 🙂
কিন্তু এই যে সর্বনিম্ন ৮৫ লাখের হিসাব দিলাম। আর সর্বোচ্চ ধরলে ১ কোটির বেশি।
আগামী ১০-১৫ বছরেই এরা রিসোর্স পিপোল থেকে জবলেস বোঝা হয়ে যাবে।

উন্নয়নশীল দেশ চালাবে কারা শুনি? এই ভাবনাটা এদের ভাবার কথা ছিল না! যারা নীতি নির্ধারক; যারা আমলা, রাজনীতিক আর এলিট। তারাই এটা ভাবতো।
তারা কিছু ভাবছে?
নীতি নির্ধারকরা কিছু ভাবে বলে মানেন?
তারা ব্যাংকের স্প্রেডশিট মিলাতে পারছেন না! সব কয়টা রাজনীতিকের সেকেন্ড হোম আছে, কানাডায়, মালয়েশিয়া। কিংবা ইন্ডিয়ায়!
আর আমলারা-সচিবেরা?
গরিব দেশের উপর দ্বিগুণ বেতনের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে আমলা সেজে আছেন তারা!
রাজনীতিবিদদের জন্য ভি আই পি লেন।
আমলাদের জন্য ৫০ হাজার টাকা বুয়া-আর ড্রাইভার এলাউয়েন্স যোগ হবে।

আর্মি আসলেই সব পলিটিক্যাল সমস্যার সমাধান?
তাইলে জানবেন, আরও ক্যান্টনমেন্ট হচ্ছে দুইটা।
সারা দেশে বাস আর সিএনজি ব্যবসার পাশাপাশি আরও ৬টা প্রাইভেট ভার্সিটি চালাতে যাচ্ছে সেনাবাহিনী।
অথচ, নিজেদের নিয়োগ পত্রে স্পষ্ট লিখে দিচ্ছে- পাবলিক ভার্সিটির ছাত্র ছাড়া আবেদন করার প্রয়োজন নাই। তাহলে নিজেরা এত প্রাইভেট ভার্সিটি খুলবে কেন?

সবাই সাধু! সবাই উন্নয়নশীল, নিজেদের মতো করে।।
আসুন, উন্নয়নশীল হয়ে যাই।
শুভেচ্ছা।

লেখকঃ হাসনাত কালাম সুহান

 

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top