ইতিহাস

পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্ববাসীকে নাকি সভ্যতার আলো দেখিয়েছে ইংরেজরা। তারাই নাকি ভারতবাসীকে সভ্য করেছে! আসলেই কি তাই? মজার ব্যাপার হচ্ছে, ৫ম শতাব্দীতে ভারত উপমহাদেশে যখন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে, সেসময় তথাকথিত ইংরেজ জাতি বানর সম্প্রদায়ের থেকে খানিকটা সভ্য ছিল, বিশ্ববিদ্যালয় কি সেই হিসাব তাঁদের কাছে থাকা তো অনেক দূরের ব্যাপার ছিল।

কেমন ছিল সেই ৫ম শতাব্দীর বিশ্ববিদ্যালয়টি? বিশ্ববিদ্যালয় বলতে যা বুঝায় তাই নাকি নামেই?

নালন্দার অবস্থান বিহারের অন্তর্গত পাটনা শহর থেকে ৫৫ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে। ধারণা করা হয়, গুপ্ত বংশের রাজাদের শাসনামলই নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা সময় ছিল। জনশ্রুতি আছে, রাজা কুমার গুপ্ত ৪৫০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভিত্তি স্থাপন করেন। মূলত, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের বিদ্যাক্ষেত্র হিসেবে এটি চালু করা হয়। রাজা বলাদিত্যের সময় একটি উপাসনালয় তৈরি করা হয় যা ছিল ৩০০ ফুট লম্বা। রাজা ভিজরা এবং পরবর্তী রাজা শিলাদিত্যের সময় ভবন সংখ্যা বাড়িয়ে ছয়ে আনা হয় এবং পুরো বিশ্ববিদ্যালয় উঁচু প্রাচীরের ভিতরে নিয়ে আসা হয়। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় মোট ৩০ একর জায়গার উপর ছিল। বিশ্বখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং ৭ম শতাব্দী এ বিদ্যাপাঠ ভ্রমনে আসেন। তাঁর লেখনী থেকেই মূলত বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁর মতে, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বৌদ্ধ, হিন্দু এবং জৈনধর্ম শিক্ষার মিলনস্থল।

 

পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় Neonaloy

 

‘নালন্দা’ শব্দের আবির্ভাব কিভাবে হয়েছে এ নিয়ে মতভেদ আছে। হিউয়েন সাং তাঁর লেখনীতে নালন্দা নামটি কিভাবে আসতে পারে তাঁর কয়েকটি ব্যাখা দিয়েছেন।

নালন্দা একটি সংস্কৃত শব্দ। ‘নালাম’ শব্দের অর্থ ‘পদ্ম’(জ্ঞানের প্রতীক) এবং ‘দাঁ’ শব্দের অর্থ ‘প্রদান করা’। সে হিসেবে, ‘নালন্দা’ শব্দের অর্থ হয় ‘জ্ঞান প্রদানকারী’। আবার ধারণা করা হয়, ‘নাগা’(ঐশ্বরিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত সর্প) থেকেও নালন্দা শব্দের আবির্ভাব হতে পারে।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ও। সকল শিক্ষার্থীর থাকার জন্য ৩তলা বিল্ডিংয়ের সুব্যবস্থা ছিল। নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা থাকতো প্রথম তলায়, সিনিয়র ছাত্র এবং ভবন ক্যাপ্টেনরা থাকতো দ্বিতীয় তলায় এবং গবেষণা কাজে ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা থাকতো তৃতীয় তলায়। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পড়াশোনার স্থান ছিল না, এর ভিতরে আরও ছিল ১০টি মন্দির, ৮টি আঙ্গিনা, খেলার মাঠ, ফুলের বাগান, পার্ক, গোসলের চৌবাচ্চা, লাইব্রেরী, নৌকা চালানোর ব্যবস্থা, ব্যায়ামের জায়গা, ধ্যানের স্থান প্রভৃতি।

পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় Neonaloy

 

বৌদ্ধ ধর্মের প্রশিক্ষণ স্থান হিসাবে চালু হলেও নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু ধর্মশিক্ষার স্থান ভাবলে ভুল হবে। ধর্মীয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ উভয় শিক্ষাই দেয়া হতো বিশ্ববিদ্যালয়ে। ধর্মের পাশাপাশি চিকিৎসা, অর্থশাস্ত্র, রাজ্যশাস্ত্র, বিজ্ঞান, গণিত ইত্যাদি বিষয়েও ছাত্রদের শিক্ষা দেয়া হতো। চারুকলা এবং কারিগরি শিক্ষালাভেরও ব্যবস্থা ছিল। হিউয়েং সাংয়ের দেয়া তথ্য মতে, ছাত্রদের প্রতিদিন ১০০টি লেকচার দেয়া হতো বিভিন্ন বিষয়ের উপর। উপস্থিত বক্তৃতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা ইত্যাদিও ছিল পাঠ্যসূচীর অন্তর্গত। বিশ্ববিদ্যালয় সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য দুটি পরিষদ ছিল। এক পরিষদের কাজ ছিল শিক্ষার দেখভাল করা, আর আরেক পরিষদের কাজ ছিল অন্যান্য যাবতীয় বিষয়ের তদারকি করা। হিউয়েন সাংয়ের সময়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১০,০০০র মতো, এবং শিক্ষকের সংখ্যা ছিল ১৫১০ জন। অর্থাৎ ছাত্র এবং শিক্ষকের অনুপাত ছিল ৭:১ মানে প্রতি ৭ জন শিক্ষার্থীর দেখভাল করার জন্য একজন শিক্ষক ছিলেন। এ থেকে বোঝা যায় যে, সুব্যবস্থা এবং পড়ার পরিবেশ হিসেবে বর্তমানের যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়কে হার মানায় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়।

পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় Neonaloy

 

শিক্ষালাভের উপযুক্ত স্থান হিসেবে সর্বত্র নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ছড়িয়ে পড়ে। জাপান, চীন, পার্সিয়া, তিব্বত, কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং তুর্কি রাজ্য থেকেও পণ্ডিত এবং বিদ্বান ব্যক্তিরা আসতেন শিক্ষালাভের জন্য। নাগার্জুন, দ্বিতীয় শতাব্দীর বিখ্যাত মহায়ানা দার্শনিক এ বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষালাভ করেন এবং পরবর্তীতে এখানেই শিক্ষাদানের দায়িত্ব পান। জৈন ধর্মের প্রচারক মাহাভিরা ১৪ বছর জৈনধর্ম সম্পর্কে শিক্ষাদান করেন। তাঁদের শিষ্য আরাদেভা এবং গৌতম বুদ্ধও এইখানে শিক্ষালাভ করেন এবং ধর্ম প্রচার করেন। গৌতম বুদ্ধের শিষ্য, সারিপুত্রাও এখানে বিদ্যালাভ করেন। পরবর্তীতে নির্বাণ লাভ করে এখানেই ধর্মশিক্ষা দেন। উল্লেখ্য, সম্রাট অশোক তাঁর শাসনামলে বুদ্ধের প্রিয় শিষ্য সারিপুত্রার স্মরণে একটি মন্দির নির্মাণ করেন।

পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় Neonaloy

 

যদিও বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতো, কিন্তু সবাইকেই মৌখিক ভর্তি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আসতে হতো। মৌখিক পরীক্ষা নেয়ার দায়িত্বে থাকতেন একজন শিক্ষক, তাঁর পদবী ছিল ‘দ্বার পণ্ডিত’। মাত্র ২০-৩০% ছাত্রকে ভর্তি হওয়ার অনুমতি দেয়া হতো। কিন্তু এ বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীদের ভরণপোষণের দায়িত্ব ছিল সম্পূর্ণ রাজকোষের। ছাত্ররা বিনা বেতনে অধ্যায়ন করতো। সম্পূর্ণ খরচ চালানো হতো রাজকোষাগার থেকে দেয়া অর্থ এবং গ্রামবাসীর দেয়া চাঁদা দিয়ে। ধারণা করা হয়, ১২০০ সনের পূর্বেই নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ভগ্নদশায় পরিণত হয়। সঠিক কোন কারণ না জানা গেলেও উপমহাদেশে মুসলমান শাসকের আক্রমণ, বৌদ্ধ ধর্মের বিলুপ্তি, ছোঁয়াচে রোগের প্রাদুর্ভাব ইত্যাদি কারণে  নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ১২৩৫ সালে যখন তিব্বতিয়ান অনুবাদক চ্যাং লোটসাওা ভ্রমণে আসেন তখনও বিশ্ববিদ্যালয় কতিপয় বৌদ্ধ ভিক্ষু দ্বারা চালু ছিল, যদিও বেশির ভাগই ছিল পরিত্যাক্ত এবং লুট হয়ে যাওয়া। ২০০৬ সালে ভারতের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এপিজে আব্দুল কালাম নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় নতুন ভাবে চালু করার প্রস্তাব দেন। ২০১০ সালের ২১ আগস্ট ভারতের রাজ্য সভায় এবং ২৬ আগস্ট লোক সভায় ‘নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বিল’ পাস হয়। ২০১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর ১৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে আবার নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা হয়। ২০২০ সালের ভেতর একটি সম্পূর্ণ নতুন ক্যাম্পাস তৈরি করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় Neonaloy

 

নতুন বিশ্ববিদ্যালয় কি পারবে পুরানো দিনের সেই সুনাম ফিরিয়ে আনতে? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার অপেক্ষায় আমরা।

Most Popular

To Top