টুকিটাকি

সাইকেলে চার জেলা ভ্রমণ!

সাইকেলে চার জেলা ভ্রমণ!- নিয়ন আলোয়

রাত প্রায় ১১ টা বেজে গেলো চিটাগাং রোড থেকে রওয়ানা হতে। আল্লাহর নামে আমিসহ আরো দুজন, শুরু করলাম যাত্রা নতুন দিগন্তের খোঁজে। এবারের সফরসঙ্গী আরো দুজন যাবার কথা থাকলেও কোন একটা সমস্যায় পরে যেতে পারেনি।

শুরু থেকেই এতো ভালো প্যাডেলিং হলো যে মাত্র ১ ঘন্টা ৪০ মিনিটে গৌরীপুর চলে গেলাম। এভারেজ স্পীড তখন ২৪+। মাঝখানে ৭কিমি ড্রাফটিংও ছিলো। গৌরীপুর যেয়ে নাস্তা খেলাম এবং প্রায় ১ ঘন্টা রেস্ট নিলাম। আমাদের টার্গেট সারারাত সাইকেলিং করে সকালে চাঁদপুর যাওয়া। কিন্তু স্পীডট টা এতো বেশি ছিলো যে আমার মনে হলো ৪ টার মধ্যেই চলে যাবো। আমরা নাস্তা সেরে গৌরীপুর-চাঁদপুর হাইওয়ে তে রওয়ানা দিলাম চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে। রাস্তা ছিলো নিরব নির্জন। সবার মনে একটা ভয়ও কাজ করছিলো। কিছুদুর প্যাডেলিং করার পর মনটা সবার বদলে গেলো। কিসের নিরব, নির্জন আর ভয়? এতো সুন্দর রাস্তা দুই পাশে খালি জমিন কখনো বাড়ি-ঘর, কখনো পুকুর, খুবই মসৃণ রাস্তা আর সবচেয়ে মজার আর রোমাঞ্চকর ছিলো চাঁদের আলো।

পুরাটা রাস্তা আলোকিত হয়ে গেলো সে রাতে চাঁদের আলোতে। কতদুর আমরা লাইট ছাড়া চালিয়েছি নিজেরাই জানিনা, তবে অনেক দূর পথ লাইট ছাড়া শুধু চাঁদের আলোতে চালিয়েছি সাইকেল। কোন শব্দ নাই চারিদিকে, শুধু জ্যোৎস্না মাখা চাঁদের আলোর সাথে চাকা রোলিং এর আওয়াজ। কি যে এক ভালো লাগা শিহরণ আমি পারবোনা তা লিখে বুঝাতে। সবাই খুব মজা পেলাম। অনেকক্ষণ পর একটা বাজারের সামনে থামলাম রেস্ট নেবার জন্য, কিন্তু একটা দোকানও খোলা পেলাম না। দোকানের বেঞ্চে শুয়ে রেস্ট নিলাম প্রায় ১৫ মিনিট। উঠে বসতেই দেখি কয়েকটা কুকুর আমাদের ঘিরে ফেললো। এখন যদি সাইকেলটা টান মারি তাহলে নির্ঘাত ওরা আমাদের পিছু তাড়া করবে। তাই ব্যাগ থেকে বিস্কুটের প্যাকেট বের করে দিলাম একজন সফরসঙ্গীকে, যেন এটা খুলে ছিটিয়ে দিয়ে তারপর সাইকেল টান দেয়। ও বিস্কুট দেওয়ার সাথে সাথে তিনজনে টান দিলাম সেইরকম। এর মাঝে পানির বোতল যে ফেলে রেখে এসেছি কুকুরের ভয়ে তা মনে পরলো প্রায় ৭ কিমি আসার পর। মন চাইলো না আর ফিরে যেতে।

মতলব এর একটু আগেই একটা দোকান পেলাম খোলা। কিন্তু চা পেলাম না, খেলাম গরম দুধ আর পাউরুটি, আর ফ্রী বসে দেখলাম বাংলা ছবি। প্রায় ৪ টা ৩০ এ চাঁদপুর এর একটু আগে একটা মসজিদে এসে সাইকেল গুলা বড় গাছের সাথে তালা মেরে মসজিদে একটু শুয়ে রেস্ট নেবার জন্য গেলাম। শুতে না শুতেই আজান পরে গেলো। লোকজন চলে এলো নামাজের জন্য আর শুরু হলো সেই একই প্রশ্ন গুলা, যেগুলা রেগুলার সাইকেল ট্যুর এ উত্তর দেই। তবে এখানের লোকজন একটু কমই প্রশ্ন করলো আর তারা বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলো আমাদের নিয়ে। বিশেষ করে মসজিদের ইমাম সাহেব আমাদের হেল্প করলেন অনেক। আমরা নামাজ পরে প্রকৃতির ডাক সেরে এবার চলে গেলাম চাঁদপুর শহর।

শহরে খানিকটা ঘুরাঘুরি করে একটা হোটেলে এসে নাস্তা সারলাম। ততক্ষণে রোদ উঠে গেছে অনেক। তখনই বুঝলাম খবর আছে আজ সাইকেল চালাতে। নাস্তা সেরে শুরু করলাম প্যাডেলিং। এখন যাবো লক্ষ্মীপুর জেলা। রাস্তার কি যে বাজে অবস্থা। রাস্তা পিচ ডালাই ঠিকই, এবং নতুনও কিন্তু ডালাই এমন ভাবে দেয়া যে রাস্তায় পাথর গুলো মাথা বের করে দাঁড়িয়ে আছে। এই রাস্তাটা ছিলো প্রায় ২০ কিমি আর এই রাস্তাটাই আমাদের এনার্জি অনেকটা শেষ করে দিলো। তবে মজা পাচ্ছিলাম রাস্তার দুই পাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে, ঘিরে রাখা গাছের ছায়ার মায়ায়।

রায়পুর পার হয়ে ২০ টাকা পিস ডাব খেলাম, খুব মিষ্টি ছিলো ডাবের পানি। অবশেষে বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে লক্ষ্মীপুর এলাম। জেলা পরিষদে ছবি খিচে চলে গেলাম নোয়াখালীর দিকে। রোদে পুরা কাহিল সবার অবস্থা, মাঝে অনেক জায়গায় রেস্ট নিলাম। শেষে ২ টা ১৫ মিনিটের দিকে এলাম নোয়াখালীর চৌমুহনী। দুপুরের খাবার-দাবার খেলাম এখানের একটা হোটেলে। অনেকটা সময় নিয়া খেলাম সাথে রেস্ট ও হয়ে গেলো।

৩ টার পর আবারো রওয়ানা দিলাম এবারের টার্গেট শেষ দিগন্ত ফেনী জেলা। রাস্তা মোটামুটি খুব ভালো ছিলো তাই মোটামুটি অনেক ভালো স্পিড উঠলো। সন্ধ্যা প্রায় ৬ টার মধ্যে চলে এলাম ফেনীর মহিপাল বাসস্ট্যান্ড। আর সম্ভব না আজ সাইকেলিং করা কারো পক্ষেই। তাই সিধান্ত নিলাম বাসে করে ঢাকায় যাবো। কিন্তু আমাদের তখনও ২০০ কিমি হয়নি। মিটার রিডিং ১৯৪+ কিমি। তাই আমি আবার ৬ কিমি মেরে দিলাম এক্সট্রা ২০০ কিমি পুরা করার জন্য। অবশেষে বাসে উঠলাম ৭ টার দিকে, লোকাল বাস ছাড়লো ৮ টা ৩০ এ। রাত প্রায় ১১ টা ৩০ মিনিটে এসে নামলাম চিটাগাংরোড।

এই ট্যুরের মাধ্যমে পেলাম আরো নতুন কিছু অভিজ্ঞতা, কিছু অনুভূতি, নতুন ভাষা, সংস্কৃতি, আচার-আচরন, ভালোবাসা। নতুন অনেক মায়াময় রাস্তা। আমার লিস্টে যোগ হলো নতুন আরো ৪ টা জেলা।

লিখেছেনঃ মোহাম্মদ হাবীবুল্লা হাসান।

Most Popular

To Top