বিশেষ

পিক্সারঃ চলচ্চিত্র জগতে এনিমেশনের পথিকৃৎ

পিক্সারঃ চলচ্চিত্র জগতে এনিমেশনের পথিকৃৎ- নিয়ন আলোয়

অভিনেতা-অভিনেত্রী ছাড়া যে একটা আস্ত সিনেমা বানিয়ে ফেলা সম্ভব আর সেই সিনেমা যে এত লোকে আগ্রহ নিয়ে দেখবে সেটা কে জানত? ১৯৯৫ সালের আগে আসলেই কেউ ভাবতে পারেনি এটাও সম্ভব। সে বছর পিক্সার (PIXAR) অ্যানিমেশন স্টুডিও ‘টয় স্টোরি’র মাধ্যমে, আমদের দেখিয়ে দিল যে শুধুমাত্র কম্পিউটার অ্যানিমেশনের মাধ্যমেই এমন সব গল্প বলা সম্ভব যেটা বাস্তবে ধারন করা প্রায় অসম্ভব। আর এখন তো সবাই সারা বছর অপেক্ষায় থাকে পিক্সার কি চমক নিয়ে আসে সেটা দেখার জন্য।

ডিজনির সাথে মিলে পিক্সারের তৈরি প্রথম অ্যানিমেটেড পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচিত্র

আজকের দুনিয়ার বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলার প্রায় সবগুলোর শুরুর দিকের গল্পগুলো প্রায় একই। অ্যাপল কিংবা ফেসবুকের মত, পিক্সারও খুব ছোট থেকে উঠে এসেছে, করতে হয়েছে উঠে আসার লড়াই। ৩২ বছর আগে পিক্সার শুরু করেছিল সফটওয়্যার কোম্পানি হিসেবে, কাজ করত কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি আর বিজ্ঞাপনের। কিন্তু ছোট্ট এই প্রতিষ্ঠানের মাঝেই সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস। তাই লুকাস ফিল্মের অধীনে থাকা কম্পিউটার গ্রাফিক্স ডিভিশন কিনে নিয়ে ১৯৮৬ সালে স্বাধীনভাবে যাত্রা করে পিক্সারের। মাত্র এই কয়েক বছরে পিক্সারের সিনেমা আর পুরস্কারের বিশাল লিস্ট যে কেউ গুগল করলেই পেয়ে যাবে।

তবে, বাস্তব অভিনেতা অভিনেত্রী না থাকলেও যে পরিমান লটবহর আর লোকবল নিয়ে এক একটা সিনেমা পিক্সার তৈরি করে সেটা এক আশ্চর্যের বিষয়। প্রায় বারশো মানুষ আর সর্বোচ্চ প্রযুক্তি নিয়েও এক এক সিনেমা তৈরি করতে প্রায় চার পাঁচ বছর লেগে যায়। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, কি পরিমান কর্মযজ্ঞ চলে ২২ একরের পিক্সার স্টুডিও বা পিক্সার ক্যাম্পাসের মাঝে।

পিক্সারের ক্যাম্পাস

আসলে গুগল বা ফেসবুকের ক্যাম্পাস নিয়ে বেশ আলোচনা হলেও পিক্সারের ক্যাম্পাস খুব একটা আলোচনায় আসেনি কখনোই। কিন্তু যাদের আছে ভেতরে শিল্পসত্ত্বা আর আছে কোডিং এর নেশা তাদের কাছে পিক্সার এক স্বর্গের মত। আসলে গল্পের আইডিয়া থেকে শুরু করে, শেষ রেন্ডার পর্যন্ত পুরো সিনেমা বানানোর প্রক্রিয়া এতই দীর্ঘ আর জটিল যে কোন একক ব্যক্তি বা ছোট গ্রুপ সেটা একা শেষ করতে পারার কথা না। তবে পুরো প্রক্রিয়াকে ‘আর্ট’ আর ‘টেকনিক্যাল’ এ দুই ভাগে ভাগ করা যায় খুব সহজেই।

‘টয় স্টোরি’র স্টোরি বোর্ড, যেখান থেকে সিনেমার শুরু

পুরো সিনেমা বানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয় আর্ট এর অংশ থেকে, ছোট্ট কোন আইডিয়ার মাধ্যমে। আসলে যে কোন অ্যানিমেশনের জন্যই আইডিয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন।আইডিয়া থেকেই আসে গল্প, আসে চরিত্র। ‘যখন রুমে কেউ থাকে না, তখন খেলনাগুলো জীবন্ত হয়ে যায়’- এই ছোট্ট আইডিয়ার উপর ভিত্তি করে পুরো টয় স্টোরি সিনেমাটা বানানো। আবার ‘ওয়াল-ই’ এর আইডিয়া এসেছে ‘ধ্বংসপ্রায় পৃথিবীতে দুই রোবটের প্রেমের কাহিনী’র উপর ভিত্তি করে। তবে আইডিয়া যেটাই হোক, পিক্সারের সব গল্পই এক সময় হয়ে ওঠে মানবিক, অনুভূতিশীল।

‘ওয়াল-ই’ সিনেমার ওয়াল-ই এর ক্যারেকটার ডিজাইন, একেক এক্সপ্রেশনে একেক রকম ওয়াল-ই

গল্প ঠিক করার পর এই গল্পকেই আর্টিস্টরা ঘষেমেজে একটা ভিজ্যুয়ালে রূপ দেয়, অনেকটা কমিক বুকের মত। আলাদা আলাদা ফ্রেম হাতে একে একে পুরো গল্পটা কার্টুনের মত আঁকা হয় যাতে পরবর্তিতে পুরো গল্পকে সাজানো যায়। গল্পের দাড়া করানোর পর সিনেমাকে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব পরে প্রোডাকশন ডিজাইনের ঘাড়ে। এখানেই ঠিক করে হয়, ওয়ালিতে বিধ্বস্ত পৃথিবী দেখতে আসলে কেমন হবে অথবা ইন্সাইড আউটের ‘স্যাডনেস’ বা ‘জয়’ দেখতে কেমন হবে। মানে সিনেমার সেট ডিজাইন, ক্যারেক্টার ডিজাইন সব চলে এই পর্যায়ে।

‘ফাইন্ডিং নিমো’র এই সব ছবি ফ্রেমের পর ফ্রেম জোড়া দিয়ে তৈরি হয়েছে প্রথম পর্যায়ের সিনেমা

পিক্সারের ভাস্কর যখন ক্যারেকটারের চেহারা ঘষামাজা করছে, ঠিক সেই পর্যায়ে এডিটর পুরো গল্পের কমিক স্ট্রিপকে একের পর এক সাজিয়ে একরকম সিনেমার রূপ দেয়, অনেকটা কার্টুনের মত। সাথে যোগ হয় সংলাপ আর সাউন্ড। এই পর্যায়ে সিনেমা মোটামুটি একটা পর্যায়ে দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু দেখতে অতটা ভাল হয় না কম্পিউটার গ্রাফিক্স না থাকায়।

(উপরে বামে) ‘কারস’ সিনেমায় চকচকে গাড়ি, (উপরে ডানে) ‘ ফাইন্ডিং নিমো’ তে পানির রিফ্লেকশন, (নিচে বামে) ‘ব্রেভ’ সিনেমায় বাউন্ডুলে চুল, (নিচে ডানে) ‘মনস্টার ইনকরপোরেশন’ সিনেমায় পশমের গ্রাফিক্স

কম্পিউটার গ্রাফিক্স শুরু হওয়ার সাথে সাথে আর্ট এর পার্ট থেকে বের হয়ে সিনেমা চলে যায় সিনেমার টেকনিক্যাল সাইডে। আসলে আমরা যে সিনেমা দেখি তা মূলত শুরু হয় এ পর্যায়ে। এতক্ষন আর্ট ডিপার্টমেন্ট যা ডিজাইন করে দেয়, এখন সেগুলোকে বাস্তব রূপ দেবার পালা। এক্ষেত্রে পিক্সার আমাদের প্রতিটা সিনেমাতেই নতুন নতুন প্রযুক্তির চমক দিয়ে এসেছে। টয় স্টোরিতে পুরো অ্যানিমেশনের পুরো প্রক্রিয়া তৈরি করতে হইলেও এর পর তারা যে বসে থাকে নি, সেটা তাদের সিনেমার উন্নতি দেখলেই চোখে পড়ে। অ্যানিমেশনের নতুন নতুন প্রযুক্তি দিয়ে এক সিনেমা ছাড়িয়ে গেছে অন্যটা থেকে। ‘মনস্টার ইনকর্পোরেটেড’ এ পশম, ‘কারস’ এ তলের চকচকে ভাব কিংবা ‘ফাইন্ডিং নিমো’ তে কিভাবে বাস্তবের মত পানি তৈরি করতে হয় সেটা তো আছেই। ‘ব্রেভ’ সিনেমা করতে গিয়ে কিভাবে মেরিডার চুল নিয়ে ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল সেটা অনেকেই জানেন। আসলে দেখতে সহজ মনে হলেও পিক্সারের জন্য ব্যাপারটা বেশ কঠিন এই জন্য যে, পিক্সার শুধু সিনেমা বানায়ই না, বরং অ্যানিমেশনের নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে এই টেকনোলজিকে আরো উন্নত করছে।

ইনসাইড আউটের সেট ডিজাইন

সাধারণ সিনেমার মত অ্যানিমেশন সিনেমারও এক গুরুত্বপুর্ন অঙ্গ হল সেট। বাস্তবের সেট আর অ্যানিমেশনের সেটের পার্থক্যই হল এখানের সবটাই কম্পিউটারে তৈরি করতে হয়। যেমন ‘কারস’ এ পুরো লন্ডন শহরের থ্রিডি তৈরি করতে হয়েছিল, তেমনি ওয়ালিতে তৈরি করতে হয়েছে বিধ্বস্ত পৃথিবী আর এক্সিওমের পুরোটাকে।

‘কারস’ এ টেক্সচারের আগে ও পরে

এতসব কিছুর পর শুরু হয় অ্যানিমেটরের কাজ। হাত পা নাড়িয়ে চাড়িয়ে বাচনভঙ্গি তৈরি করা থেকে শুরু করে বাতাসে কাপড়ের নড়াচড়া পর্যন্ত সমস্ত ব্যাপারটাই এ পর্যায়ে ঘটে। তবে পুরো ব্যাপারটা কোন একক কোন অ্যানিমেটর করে না। হয়ত কারো দায়িত্ব পড়ল হাত পা নাড়ানো, কারো চুলের নড়াচড়া। তবে যেটাই করা হোক না কেন, করা হয় কম্পিউটার কোডিং করে সিমুলেশন এর মাধ্যমে। অ্যানিমেশনের কাজ শেষে যোগ করা হয় টেক্সচার আর লাইটিং। প্রতিটা ফ্রেমকে বাস্তব আর শৈল্পিক করে তুলতে এই দুটোর জুড়ি মেলা ভার। গাড়ির গায়ের ময়লা থেকে, কার্পেটের সুতা এ সবই এই সময় ঠিক করা হয়। আর লাইটিং পুরো ব্যাপারটাকে বাস্তব করতে বেশ ভাল ভুমিকাই রাখে।

রাতাতুই এর এই ফ্রেমে ২৩০ টা আলাদ আলাদা লাইট আছে

এতকিছু করার পর এবার শেষ সময়ে রেন্ডারের পালা। রেন্ডার আসলে এতক্ষনের সকল কাজকে একত্রিত করে। মানে অ্যানিমেশন, টেক্সচার, লাইট আর অন্যান্য সেট আর ক্যারেকটারকে। আমরা ফাইনাল প্রোডাক্ট হিসেবে এটাকেই দেখি। তবে রেন্ডার হয় ফ্রেম বাই ফ্রেমে, আর পিয়ারের এক সেকেন্ড এ ফ্রেম থাকে ২৪ টা। সেই চব্বিশটা ফ্রেম পর পর যোগ হয়ে এক সেকেন্ডের ভিডিও হয়। তবে সবেচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হল, এই এক একটা ফ্রেম রেন্ডার হতে সময় নেয় প্রায় ২৪ ঘন্টা।

অ্যানিমেশন দুনিয়ায় পিক্সার কি সেটা আর কাউকে বলে দিতে হয় না। অ্যানিমেশনের পথিকৃৎ পিক্সার, আর সেটা বেশ ভাল সাড়া ফেলেই। পিক্সারের সিনেমা তৈরির পর অ্যানিমেশনের প্রতি মানুষের আগ্রহ এতই বাড়ে যে অস্কারেও ২০০০ সাল থেকে যোগ হয় ‘অ্যানিমেটেড ফিচার ফিল্ম’ ক্যাটাগরি। আর সেখানে পিক্সারের জয়জয়কার দেখিয়ে দেয় অ্যানিমেশন সিনেমায় পিক্সারের অবদান। আর পিক্সার সম্পর্কে এতকিছু জানার পর এবছর যাবেন নাকি একটা অ্যানিমেশন বানাতে?

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top