ইতিহাস

ইতিহাসের ভয়াবহতম বিমান দুর্ঘটনা

২০১৭ সাল ছিল বিমান পরিবহনের ইতিহাসের সবচেয়ে নিরাপদ বছর। বিমান সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা ছিল শূন্য। এই সাফল্য কতটা ক্ষণস্থায়ী তার প্রমাণ দিয়েই গতকাল বিধ্বস্ত হয় ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স এর ফ্লাইট-২১১। এই বছরের প্রথম বাণিজ্যিক বিমান দুর্ঘটনা আবারও আকাশপথে যাতায়াতের নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে গোল টেবিলে নিয়ে এসেছে। গেল বছর কোন বাণিজ্যিক বিমান দুর্ঘটনা না হলেও সামরিক ও বেসরকারি বিমান বিধ্বস্ত  হয়েছে ৫১ টি আর এতে প্রাণ হারান ২৮২ জন।

নিরাপত্তার দিক থেকে শীর্ষে থাকলেও বিগত ১০ বছরে (২০০৭-১৬) সমগ্র বিশ্বে বিমান দুর্ঘটনায় ২৯৩৬ জন মৃত্যুবরণ করেন। শুধু ১৯৭৬ সালেই এর থেকে বেশি মানুষ নিহত হয় বিমান দুর্ঘটনায়। যান্ত্রিক গোলযোগ থেকে শুরু করে পাইলটের অপারগতা এবং আরও শতাধিক ত্রুটির কারণে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা ঘটে। তবে বিশ্বের সবচেয়ে মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনা ৫৩% ঘটে পাইলটের ভুলের কারণে। ট্রান্স-আটলান্টিক যাতায়াতের যুগে এয়ারলাইন্সের নিরাপত্তা এখন আর কোন হালকা বিষয় নয়। প্রত্যেক দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় কার্যত আমাদের নেই। এমন কিছু মর্মান্তিক দুর্ঘটনাই আজ তুলে ধরা হবে। বিমান দুর্ঘটনা গুলো মৃতের সংখ্যার উর্ধমুখী ক্রমানুসারে সাজানো হয়েছে এবং জঙ্গী বা সন্ত্রাস প্রণোদিত দুর্ঘটনা গুলো উল্ল্যেখ করা হয় নি।

৫) সৌদি এয়ারলাইন্স-১৬৩: আগস্ট ১৯, ১৯৮০। রিয়াদ এয়ারপোর্ট থেকে জেদ্দার উদ্দেশ্য রওনা হয় ফ্লাইট-১৬৩। বিমানবন্দর ছাড়ার ৭ মিনিট পর বিমানের কার্গো কম্পার্টমেন্টে আগুন সম্পর্কে অবহিত হন বিমানের কর্মকর্তাগণ। আগুনের পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও ৫ মিনিট সময় অতিবাহিত হয়, যার পর পাইলট রিয়াদ বিমানবন্দরে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। রানওয়েতে প্রবেশের কিছু সময় আগে ইঞ্জিনের নিয়ন্ত্রণ হারান পাইলট এবং অবতরণের জন্য জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেন। তবে অবতরণের পর ইমার্জেন্সি সার্ভিসের কর্মকর্তাদের বিমানের কাছে পৌছাতে ২৩ মিনিট সময় লেগে যায়। প্লেন বাইরে থেকে অক্ষত থাকলেও পেছনের দিকের জানলা দিয়ে আগুনের শিখা দেখতে পান উদ্ধারকর্মীগণ।

ইতিহাসের ভয়াবহতম বিমান দুর্ঘটনা neonaloy

ইঞ্জিন নিয়ন্ত্রণ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে উদ্ধারকর্মীরা টুইন জেট ইঞ্জিন বন্ধ না করতে পেরে উদ্ধার কর্মসূচী শুরু করেন দেরীতে। বিমানের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায় মর্মান্তিক দৃশ্য। বিমানে যাত্রী ও কর্মকর্তা প্রত্যেকে ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যবরণ করে। আশ্চর্যজনক হলেও আগুনে দগ্ধ হয়ে কেউ মৃত্যুবরণ করেন নি। উদ্ধার কাজ চলাকালীন  বিমানটিতে আগুন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ে। মাটির উপর দাঁড়িয়ে থেকে শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যান ৩০১জন।

৪) টার্কিশ এয়ারলাইন্স-৯৮১: ইস্তানবুল থেকে লন্ডনের নিয়মিত ফ্লাইট ছিল ফ্লাইট-৯৮১। প্যারিসে একটি যাত্রা বিরতি সহ বিমানটি ১ ঘন্টায় এই দূরত্ব অতিক্রম করে। মার্চ ৩, ১৯৭৬ সালে এই যাত্রাপথে রওনা হয় বিমানটি। প্যারিস পর্যন্ত ফ্লাইট একদম স্বাভাবিক ভাবেই চলতে থাকে। প্যারিসের অর্লী বিমানবন্দর থেকে পুনরায় উড্ডয়নের ১০ মিনিট পর ডিসি-১০ বিমানটির কার্গো কম্পার্টমেন্টের দরজা ভেঙ্গে আলাদা হয়ে বিস্ফোরণের সূত্রপাত। আরোহীদের বসার স্থানের একটি অংশ বিস্ফোরণের ফলে বিমান থেকে খুলে পড়ে। কিছু সংখ্যক আরোহী উড়ন্ত প্লেন থেকে ছিটকে বেরিয়ে যান। একরকম লাশ বর্ষণ করতে করতে ফ্লাইট-৯৮১ সকল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে ভূমির দিকে আগ্রসর হতে থাকে।

ইতিহাসের ভয়াবহতম বিমান দুর্ঘটনা neonaloy

 

প্রায় ৫০০কি.মি. প্রতি ঘন্টা বেগে বিমানটি আরমেননভিল বনাঞ্চলে পতিত হয়। বিমানে থাকা ৩৪৬ জনই মৃত্যু বরণ করেন। ডিসি-১০ বিমানের কার্গো কম্পার্টমেন্টের দরজার নীলনকশা পর্যবেক্ষণ করে জানা যায় যে, দরজা সঠিকভাবে ছাঁচে না বসলেও শক্তি প্রয়োগ করে তা বন্ধ করে ফেলা যেত। যার ফলে ১৮০০০ ফুট উচ্চতায় বিমানটির কার্গোর দরজা বায়ুচাপে ভেঙ্গে যায় এবং সেখানে এক্সপ্লোসিভ ডিকম্প্রেশনের ফলে বিমানের সকল যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে পড়ে।

এই দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কার্গো দরজার নতুন ডিজাইন তৈরি করা হয় সকল ডিসি-১০ বিমানের জন্য। নতুন নকশায় দুর্ঘটনাএড়নো গেলেও ফ্রান্সের মাটিতে সংঘটিত সবচেয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ছাড়া হয়তো এই বিকাশ সম্ভব হত না।

৩) চারকি-দাদ্রীঃ পৃথিবীর সবচেয়ে বিধ্বংসী বিমান সংঘর্ষটি ঘটে ভারতের উত্তরাঞ্চলের চারকি-দাদ্রী শহরে। সৌদী এয়ারলাইন্স-৭৬৩ এবং কাজাকিস্থান ফ্লাইট-১৯০৭ এর মধ্যে সংঘর্ষে। চারকি দাদ্রীর আকাশে উড্ডয়নরত বিমান দুটির সংঘর্ষে উভয় বিমানের ৩৫০ জন আরোহী মৃত্যু বরণ করেন।

ফ্লাইট-৭৬৩ দিল্লী থেকে দাহরানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে অন্যদিকে ফ্লাইট-১৯০৭ শীমকেন্ট থেকে দিল্লী বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন ফ্লাইট-১৯০৭ বিমান যাতায়াত নিয়ন্ত্রকের নির্দেশ মতে ১৫০০০ ফুট নির্ধারিত উচ্চতার থেকে ১০০০ ফুট নিচ দিয়ে যাত্রা করে। বিপরিত দিক থেকে একই সময়ে ফ্লাইট-৭৬৩ উচ্চতা বৃদ্ধি করতে থাকে। নিয়ন্ত্রক তাদের গতিপথে সংঘর্ষের সতর্কতা জারি করার মধ্যেই দেরী হয়ে যায়।

ফ্লাইট-১৯০৭ এর লেজের পাখা ফ্লাইট-৭৬৩ এর মূল ডানা দ্বিখন্ডিত করে। ফ্লাইট-৭৬৩ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বৃত্তাকার অক্ষে খাড়া ভাবে ভূপতিত। ফ্লাইট-১৯০৭ সোজা থাকা অবস্থায় অতিরিক্ত গতিতে নিচে নামতে থাকে। দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে পাইলটের নির্দেশ অমাণ্য করাকেই উল্ল্যেখ করা হয়।

২) জাপান এয়ারলাইন্স-১২৩: এ দুর্ঘটনা ঘটে জাপানে ১৯৮৫ সালে। ৫২০ জন আরোহী সহ ফ্লাইট-১২৩ টাকামাঘারা পাহাড়ে বিধ্বস্ত হয়। তদন্ত রিপোর্ট মতে ৭ বছর আগে বিমানটি বাল্কহেডে একটি সংঘর্ষ হয় যার ফলে কিছু মেরামত প্রয়োজন হয়। বোইং পরবর্তীতে প্রকাশ করে যে উক্ত মেরামত কাজটি মান সম্মত নীতিমালা অগ্রাহ্য করে পরিচালিত হয়।

যাত্রা শুরুর ১২ মিনিট পর বাল্কহেড বিস্ফোরণ হয় যার ফলে, বিমানে পেছনের সকল স্টেবিলাইযার ও যন্ত্রাংশ অকেজ হয়ে পড়ে। ডিপ্রেসারাইজিং এর ৩২ মিনিট পর ৬৪০০ ফুট উচ্চতায় বিমানটির রেডার সিগনাল বন্ধ হয়ে যায়। সম্পূর্ণ দিক নিয়ন্ত্রণহীন একটি বিমান রক্ষার জন্য যা করা সম্ভব কিছুই একে একে চেষ্ট করে বিমানের কর্মকর্তাগণ। তবে শেষমেষ অপারগতা ঘোষনা করেন পাইলট।

ইতিহাসের ভয়াবহতম বিমান দুর্ঘটনা neonaloy

 

বিমানটির একটি ডানা পাহাড়ের গায়ে লেগে ভেঙ্গে পড়ে এবং বিমানটি ধাক্কায় উল্ট হয়ে ভূপতিত হয়। মাত্র ৪ জন আরোহী জীবিত উদ্ধার হন। সকলেই নারী এবং পেছনের সীটের আরোহী ছিলেন। ধারণা করা হয়য় পাহাড়ে উদ্ধার কজ দ্রুত শুরু করা গেলে হয়তো মৃতের সংখ্যা কমিয়ে আনা যেত।

দুর্ঘটনা স্মরণে টাকামাঘারা পাহাড়ে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। বিমান কর্তৃপক্ষ একটি জাদুঘরও নির্মাণ করে যার ভেতর আরোহীদের লেখা শেষ চিঠিপত্র গুলো সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
দুর্ঘটনার ১ মাস পর জাপান এয়ারলাইন্সের মেরামত বিষয়ক একজন কর্মকর্তা আত্মহত্যা করেন। ঘটনাস্থলে একটি সুইসাইড নোট পাওয়া যায় যেখানে লেখা ছিল “আমার জীবন দিয়েই আমার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত”।

১) টেনেরিফ এয়ারপোর্টঃ ১৯৭৭ সালের ২৭ মার্চ। টেনেরিফ এয়ারপোর্টে PAN-AM আর KLM এয়ারলাইন্সের দুটি বোইং-৭৪৭ বিমানের রানওয়েতে সংঘর্ষ হয়। বিমান দুটির একটিরও আসলে সেদিন টেনেরিফে অবতরণের কথা ছিল না। পার্শ্ববর্তি ক্যানেরি দ্বীপপুঞ্জের উদ্দ্যেশে যাত্রা করা বিমান দুটি টেনেরিফে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় কারণ ধারণা করা হয়েছিল লাস পালমাস বিমানবন্দরে জঙ্গি হামলা হবে।

অতিরিক্ত কুয়াশাচ্ছন্ন রানওয়েতে দুটি বিমান বিপরিত দিক থেকে অগ্রসর হতে থাকে। দুর্ঘটনা ঘটে যখন KLM বিমানটি অনুমতি ছাড়াই উড্ডয়নের ট্যাক্সি শুরু করে। বিপরিত দিক থেকে আগত PAN-AM বিমানটি যে পথে রানওয়ে থেকে নেমে যাওয়ার কথা সেটা পেছনে ফেলে কিছু দূর সামনে চলে আসে। কুয়াশার চাদরের আড়াল থেকে যখন KLM এর সামনে PAN-AM বিমানটি দৃষ্টিগোচর হয় তখনই KLM উড্ডয়ন করে সংঘর্ষ এড়ানোর চেষ্টা করে। সে চেষ্টা বৃথা হয় যখন KLM এর নিচের অংশ PAN-AM এর মধ্যেভাগের সাথে ধাক্কা খায়।
KLM বিমানের ২৪৮ জন যাত্রীর কেউই জীবিত বের হতে পারেননি। PAN-AM বিমানের ৩৯৬ জনের মধ্যে ৬১ জন অক্ষত ছিলেন। সর্বসাকূল্যে নিহতের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৫৮৩ জনে।

আরো পড়ুনঃ বিমান কেন সাদা রং হয়। 

Most Popular

To Top