টুকিটাকি

আমার তো সব গল্প শেষ!

আমার তো সব গল্প শেষ! neonaloy

ঘরের ভেতর গুমোট পরিবেশ, ভারী হয়ে আছে বাতাস। সোফায় বসে কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত ঝর্ণা। পাশের বাসার প্রতিবেশী ভাবী এসেছেন, কাছে গিয়ে ঝর্ণাকে জড়িয়ে ধরতেই একটা আর্তচিৎকার দিলো ঝর্ণা। হাউ মাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলছে সে, ‘ভাবী, আমি তো আর আপনাদের সাথে গল্প করতে পারবো না, বলতে পারবো না। রিমু, আমার জন্য কি কি গিফট আনছে, আর বলতে পারবো না। কেন ঝগড়া হইছে, তাও আর বলতে পারবো, আমার তো সব গল্প শেষ।

ঝর্ণা, এস এম মাহমুদুর রহমানের স্ত্রী। নেপালের কাঠমান্ডুতে ঘটে যাওয়া বিমান দুর্ঘটনাতে নিহত হয়েছেন মাহমুদ। রানার অটোমোবাইলস লিমিটেডের কাস্টমার কেয়ারের সিনিয়র ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কোম্পানীর একটি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে নেপাল যান তিনি। কথা ছিলো ১৮ তারিখ ফিরে আসবেন। কিন্তু আর ফেরা হলো না তার।

স্ত্রী ঝর্ণা এই প্রতিবেদন লিখা পর্যন্ত এখনো জানেন না যে তার স্বামী আর বেঁচে নেই। স্বজনরা তাকে জানিয়েছে, মাহমুদ আশংকাজনক অবস্থায় হাসপাতাল ভর্তি আছেন। বিমান দুর্ঘটনার সংবাদ প্রচার দেখে ঝর্ণাকে সামলানো যাবে না বলে বাসার ডিশ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। ফরিদপুরের নগরকান্দার বাসিন্দা মাহমুদের ঢাকায় বাসা নিকুঞ্জ-২ এর আবাসিক এলাকায়। গ্রামে থাকা তার মা বাবাকেও জানানো হয়নি মৃত্যুর খবর।

কথা ছিলো আগামী মাসে স্ত্রীকে নিয়ে ভারতের শিমলা ও মানালি বেড়াতে যাবেন। সেভাবে প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন মাহমুদ। কোম্পানীর বাঁধা ধরা ছুটির নিয়মের কারণে এ মাসে( মার্চে) কোন ছুটি না নিয়ে আগামী মাসে স্ত্রীকে নিয়ে বেড়াতে যেতে ছুটির দিনগুলো জমাতে চেয়েছিলেন মাহমুদ। যাওয়ার দিন পাসপোর্টও ভুল করে রেখে গিয়েছিলেন বাসায়। স্ত্রীকে তাই পাসপোর্ট নিয়ে যেতে বলেছিলেন বিমানবন্দরে। এই তাদের শেষ দেখা। এর মাঝে চলে দুজনের মান- অভিমান। নেপাল যাবার আগের দিনই অফিসের কাজে চট্টগ্রাম থেকে ফিরেছিলেন মাহমুদ। রাতে এসেই পরদিন দুপুরে আবার নেপাল যাওয়া নিয়ে অভিমান করেছিলো ঝর্না। মান ভাঙ্গাতে মাহমুদ বলেছিলেন, বেশি পরিশ্রম না করলে ক্যারিয়ার দাঁড়াবে না, সব কিছু তো তোমার জন্যই করছি, প্লিজ রাগ করো না। কাঁদতে কাঁদতে এসব বর্ণনা দিচ্ছিলেন ঝর্ণা। আর সবাইকে বলছিলেন, তার স্বামীর জন্য দোয়া করতে যেনো অন্তত বেঁচে ফিরে আসে।

এসব দেখতে দেখতে দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলাম কেননা আমরা জানি এস এম মাহমুদ আর বেঁচে নেই। আর কখনো ফিরবে না ঝর্ণার মান ভাঙ্গাতে। মাহমুদ আর ঝর্ণার সাত বছরের দাম্পত্যে আর কোন নতুন গল্প লেখা হবে না কোনদিন। ভাবতে ভাবতেই চোখ পড়লো ওয়ারড্রবের উপর রাখা মাহমুদ আর ঝর্ণার বিয়ের ছবির দিকে। কি সুন্দর দুজনের লাজুক মিষ্টি হাসির চাহনি, চোখে মুখে নতুন জীবনের স্বপ্ন।

শুধু মাহমুদ নয়, মোট যে কয়জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন নেপালে ঘটে যাওয়া ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান দুর্ঘটনায়, এদের প্রত্যেকের জীবনে আলাদা আলাদা গল্প আছে। কেউ গিয়েছেন স্বপরিবারে ঘুরতে, কেউ হানিমুনে, কেউবা বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করতে, নতুন জীবন শুরু করা কারো হাতের মেহেদির রঙ তখনো গাঢ়ো ।

ল্যান্ডিং এর আগ মুহূর্তেও প্রত্যেকে হয়তোবা ভ্রমণ পরিকল্পনা নিয়ে আলাপ করেছে। এমনি কত গল্প, কত কথা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে দুর্ঘটনার আগুনে।

১২ মার্চ দুপুর সাড়ে ১২ টায় ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বিএস-২১১ ফ্লাইটটি ছাড়ে ২০ মিনিট দেরিতে। নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় বিধ্বস্ত হয় বিমানটি। ৬৭ জন যাত্রী ও চারজন ক্রুয়ের মধ্যে ৫০ জন নিহত হন। পাইলট আবিদ সুলতান গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ মার্চ মঙ্গলবার মারা যান।

১২ মার্চেই ত্রিভুবন বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও বিএস- ২১১ ফ্লাইটের পাইলটের মধ্যে অবতরণ সময়ের কথোপকথন প্রকাশিত হয়ে যায় বিভিন্ন মাধ্যমে। এতে দেখা যায়, নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে একবার একেকরকম নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো পাইলটকে। এই ঘটনাকে বিমানটির দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করছে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স। আবার বিএস-২১১ বিমানটি ছিলো বম্বারডিয়ার ড্যাশ 8 Q400 মডেলের। ১৯৮৪ সালে প্রথম আকাশে ওড়ার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে অনেক দেশেই দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে এই মডেলের বিমান। বেশিরভাগ দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বিমানটির ল্যান্ডিং গিয়ারের ত্রুটিকে দায়ী করা হয়। এসব দুর্ঘটনার বেশির ভাগই ঘটেছিলো অবতরণের সময়। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা এজন্য বম্বারডিয়ার ড্যাশ 8 Q400 মডেলের বিমান নিয়ে নানা সময়ে প্রশ্ন তুলেছে।

Most Popular

To Top