ফ্লাডলাইট

ভিভ রিচার্ডসঃ ক্রিকেটের সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাটসম্যান!

ভিভ রিচার্ডস... neonaloy

ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে আইকোনিক দৃশ্যগুলোর একটি স্যার ভিভ রিচার্ডসের উইকেটে আগমন। গর্ডন গ্রিনিজ বা ডেসমন্ড হেইন্স আউট হবার পর রুদ্ধশ্বাসে দর্শক তাকিয়ে আছে ক্যারিবিয়ান ড্রেসিং রুমের দিকে। আউট হয়ে যাওয়া ব্যাটসম্যান বাউন্ডারি লাইন পার হয়ে যাবার পর ধীরে সুস্থে মাঠে প্রবেশ করবেন ভিভ। ভিভ অপেক্ষা করাবে, দর্শক, প্রতিপক্ষ, আম্পায়ার সবাইকে। চুইংগাম চিবাতে চিবাতে শান্ত চোখে উইকেটে আসবেন ভিভ, মাথা উঁচু করে মেরুন ক্যাপ পরে। কখনোই হেলমেটে পরে নয়, ক্যারিয়ারে একবারের জন্যেও না! উইকেটে এসে গার্ড নিবেন, ৪-৫ স্টেপ এগিয়ে বোলারের দিকে তাকিয়ে হয়তো কঠিন দৃষ্টি দিবেন নয়তো মুচকি হাসি! ভয়ের শীতল স্রোত নেমে যাবে বোলারের মেরুদন্ড বেয়ে। বোলার তখনই হেরে গিয়েছে ভিভের ব্যক্তিত্বের কাছে! বলা হয় ড্রেসিং রুম থেকে উইকেট, এই ৩-৪ মিনিটই স্যার ভিভ রিচার্ডসের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। ড্রামা, সাসপেন্স, থ্রিলার যা ইচ্ছা বলতে পারেন ভিভের উইকেটে আগমনকে!

ব্যক্তিত্ব আগে, ব্যক্তি পরে। এটাই ছিলো তার দর্শন। আর এই দর্শনই বিশ্বজুড়ে বোলারের রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছিলো প্রায় দুই দশক!

বোলার বল করলেন অফ স্ট্যাম্পের বাইরে। বলের সুইং বা সিমের তোয়াক্কা না করেই বাঁ পা উঁচিয়ে মিরাকলের মতো ফ্লিক করে বল পাঠিয়ে দিলেন কাউ কর্নার দিয়ে বাউন্ডারি লাইনে। এমন একটা সময় যখন hitting across the line বিবেচনা করা হতো লজ্জাজনক, চিটিং, এককথায় মহাপাপ! কিন্তু সেটাই ছিলো ভিভ, প্রথাগত নিয়মকে বুড়ো আঙ্গুল প্রদর্শন করে ব্যাকরণের ধার না ধেরেই খেলে গিয়েছেন। নিজের আত্মজীবনীর নাম সেকারনেই রেখেছেন Hitting Across the Line!

স্যার ভিভ এমন একসময় ক্রিকেট খেলেছেন যখন বিশ্ব দাপিয়ে বেড়াত ভয়ংকর সব ফাস্ট বোলাররা। কিন্তু ডেনিস লিলি বলেন আর জিওফ থমসন, ইমরান খান বলেন আর কপিল দেব। ভিভ কখনোই হেলমেটে পরে মাঠে নামেন নাই। এমনকি নেটে বা ঘরোয়া ক্রিকেটে তারই সতীর্থ ম্যালকম মার্শাল, মাইকেল হোল্ডিং, জোয়েল গার্নার বা এন্ডি রবার্টস, কারো বিপক্ষেই না। হেলমেট পরা ভিভের কাছে ছিলো লজ্জার, নিজের আক্রমনাত্বক মানসিকতার পরাজয় আর বোলারকে মানসিক জয় দিয়ে দেওয়া! প্রখর আত্মবিশ্বাস ছিলো নিজের দুটি চোখের উপর, মাথা বাঁচাতে চোখের উপরেই ভরসা করেছেন সবসময়। আর চোঁখ দুটি কখনোই ধোঁকা দেয়নি তাকে।

১৯৭৪ সালে ভারতের চেন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে টেস্ট অভিষেকের পর আর কখনোই ফিরে তাকাতে হয়নি ভিভকে। ৮৫৪০ রান করেছেন ৫০.২৩ গড়ে। স্ট্রাইক রেট ৮৬.০৭। ওয়ানডে অভিষেক হয়েছিলো ১৯৭৫ সালে, ৪৭ গড়ে ৬৭২১ রান করেছেন ৯০.২ স্ট্রাইক রেটে।

ভিভের খেলার সময় সত্তর, আশির দশকের সাথে স্ট্রাইক রেট দুটি মিলিয়ে নিন। মাথায় রাখুন সেসময় ক্রিকেটে কোন পাওয়ার প্লে ছিলোনা, ছিলোনা “চিকি শট” বা আজকের মতো ছোট বাউন্ডারি। ক্রিকেট তখন আক্ষরিক অর্থেই রাজকীয় খেলা আর ভিভ ছিলেন শিকারের খোঁজে উন্মাদ এক রাজা, বোলাররা যেন নির্যাতিত শিকাররূপ প্রজা।

ক্রিকেটে এসেই এতো দ্রুত ত্রাসের রাজত্ব আর কয়জন করতে পেরেছিলো? নিজস্ব স্টাইল, আক্রমন, পার্সোনালিটি দিয়ে ভিভ পেরেছিলেন। অবশ্য পরিসংখ্যান দিয়ে কখনোই ভিভকে মাপা যাবেনা, ভিভের শ্রেষ্ঠত্ব তার ডোমিনেটিং ক্রিকেটের ভেতর লুকানো। ভিভের বিশেষত্ব তিনি কিভাবে অন্য দলগুলোর বোলিং আক্রমন ধ্বংস করে দিতেন নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে।

স্যার ভিভের ক্যারিয়ারের বেশ কিছু ইনিংস আছে তার ভেতর সবচেয়ে আলোচিত ১৯৮৫ সালে ওল্ড ট্রাফোর্ডে তার মহাকাব্যিক ইনিংস। ইংল্যান্ডের সুইং বোলিং এর সামনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১৬৬/৯, এক পাশে দাড়ানো ভিভ অন্যপাশে শুধু যাওয়া আসার মিছিল দেখছিলেন। এক সময় ভাবলেন যথেষ্ঠ হয়েছে! শুরু করলেন পাল্টা আক্রমন। একা হাতে ইংলিশ বোলিং ছত্রভঙ্গ করে ১৭০ বলে ১৮৯* করেন। শেষ উইকেটে ১০৬ রানের জুটিতে ভিভের একারই অবদান ৯৩ রান! কতটা ডোমিনেটিং ক্রিকেট আপনার কল্পনায় আসতে পারে? সেটা কি এর চেয়েও বেশি! ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইনিংস শেষ করে ২৭২/৯ রানে। ইংল্যান্ড ম্যাচ হেরেছিলো ১০৪ রানে।

২১ চার আর ৫ ছক্কায় সাজানো ভিভের এই ইনিংস ওয়ানডের সর্বকালের সেরা ইনিংস বিবেচনা করা হয়।

আরেকটা ইনিংস উল্লেখযোগ্য এখানে, সেসময় ওয়ানডে ২৫০ মানে জেতার মত স্কোর। ৩০০ মানে প্রায় অবিশ্বাস্য ঘটনা আর ৩৫০ সে তো কাল্পনিক বস্তু! ১৯৮৭ সালে ভিভের ১২৫ বলে ১৮১ রানের ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ করেছিলো ৩৬০/৪ রান! তৎকালীন সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড। ভিভের শেষ ৮১ রান এসেছিলো মাত্র ২৭ বলে!

অভিষেকের মাত্র এক বছরের মাথায় অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়েছিলেন ক্যারিবিয়ান দলের সদস্য হয়ে, ১৯৭৫ সালে। ইয়ান চ্যাপেলের অস্ট্রেলিয়ার ছিলো লিলি আর থমসনের মতো “খুনী মেজাজের” বোলার। ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুততম বোলার লিলিকে মাঠের চারপাশে শট খেলে হতবাক করে দিয়েছিলেন ভিভ। বাউন্সার গুলাকে পুল, হুক আর অফ স্ট্যাম্পের বাইরের বল কে টেনে ফ্লিক করে সীমানা ছাড়া করেছিলেন। ফ্লিক তার আইকোনিক শট হলেও গর্জিয়াস সব কাভার ড্রাইভ খেলেছিলেন লিলিকে। লিলি বনাম ভিভ রিচার্ডস এখনো ক্রিকেটের অন্যতম রোমাঞ্চকর এক লড়াই হয়ে আছে।

টেস্টে তার বিখ্যাত ইনিংসের ভেতর রয়েছে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্টে দিল্লীতে ১৯২ রানের ইনিংস। ১৯৭৬ সালে ১১ টেস্টে ৭ সেঞ্চুরীতে ১৭১০ রান করেন ৯০ গড়ে। যার ভেতর ওভালে ক্যারিয়ার সেরা ২৯১ রান রয়েছে।

ভয়ংকর ব্যাটিং আর ডোমিনেটিং চরিত্রের কারণে সাধারনত শ্লেজিং করতো না কেউ ভিভকে। যারা করেছে তাদের উপযুক্ত জবাব ব্যাট হাতেই দিয়েছেন। সমারসেটের হয়ে ব্যাট করছিলেন ভিভ, গ্লমারগনের বোলার গ্রেগ থমাসের পরপর তিনটা সিমিং ডেলিভারি মিস করার পর থমসন বলেছিলেন “ভিভ! এটাকে বলে ক্রিকেট বল, এটা গোল আর লাল, ওজন পাঁচ আউন্স আর তোমার এটাকে পেটানোর কথা, আমি অবাক হচ্ছি তুমি কি করছো!”। স্যার ভিভ মুখে কিছুই বললেন না, পরের বলটা ডাউন দ্যা উইকেটে যেয়ে বিরাট ছক্কায় মাঠের পাশের নদীর দিকে মারলেন, আর থমাসকে বললেন, “হেই থমাস, এটা ক্রিকেট বল, লাল আর গোল, ওজন পাঁচ আউন্স, তুমি তো খুব ভালো চিনো, এখন যাও খুঁজে আনো”।

আপনি প্রতি বলেই চার ছয় মারবেন এটা এগ্রেসিভ ক্রিকেট না, আপনি চার মারেন আর সিঙ্গেল নেন, বোলার যখন প্রতি বলেই ছয় খাওয়ার আতংকে থাকে সেটাই এগ্রেসিভ ক্রিকেট- এটাই ছিলো ভিভের নিজের ব্যাটিং দর্শন।

ভিভকে বলা হতো ক্যারিবিয়ান দলের “এক্স ফ্যাক্টর”। ‘৭৫ বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্যাট হাতে দ্রুত আউট হওয়া ভিভ এল্যান টার্নার, ইয়ান চ্যাপেল আর গ্রেগ চ্যাপেলকে রান আউট করে বিশ্বকাপ জয়ে বড় ভূমিকা রাখেন।

অধিনায়ক ভিভের রয়েছে অনবদ্য এক রেকর্ড। ১৯৮৪-১৯৯১ পর্যন্ত ৫০ টেস্টে অধিনায়কত্ব করেন ভিভ। ভিভ রিচার্ডস একমাত্র ক্যারিবিয়ান অধিনায়ক যার অধীনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোন সিরিজ হারেনি। একজন জন্মগত নেতা যার অভিধানে পরাজয় শব্দটা ছিল না।

এখন ক্রিকেটে কে দ্রুততম সময়ে ৫০০০ রান করেছে সেটা নিয়ে তর্ক জমে, ফ্যানরা গর্ব করে। কিন্তু ভিভ রিচার্ডস তার সময়ে দ্রুততম ৫০০০ হাজার রান করেন। সেই যুগে যখন অধিনায়কেরা ভিভ নামলে সব ফিল্ডার বাউন্ডারি লাইনে পাঠিয়ে দিতেন। কোন ফিল্ডিং রেস্ট্রিকশনের বালাই ছিল না।

ভিভ রিচার্ডস ডোমিনেটিং ছিলেন, এগ্রেসিভ ছিলেন কিন্তু শ্লগার ছিলেন না! তিনি ছিলেন ক্রিকেটের প্রথম পোস্টারবয়, ক্রিকেটের সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাটসম্যান, তিনি আক্রমন এবং ধ্বংস করেছেন সমস্ত বোলিং আক্রমন এবং অসংখ্য বোলারের ইগো!

ভিভ রিচার্ডসের ক্যারিয়ারে কোন দূর্বলতা ছিল না বলা যায়। ফুটওয়ার্ক নয়, তিনি ছিলেন হ্যান্ড-আই কো-অর্ডিনেশন প্লেয়ার। বলের উপর চোখ রেখে দুরন্ত সব শটস খেলতেন। আর তাই স্বাভাবিকভাবেই চোখের পাওয়ার কমে আসতে থাকলে ১৯৯১ সালে অবসর নেন ক্রিকেট থেকে। কে বলেছে ফুটওয়ার্ক না থাকলে ক্রিকেট খেলা যায় না!

ভিভের কিছু ইউনিক রেকর্ডসঃ

– ১৫০+ স্ট্রাইক রেটে টেস্ট সেঞ্চুরী করা প্রথম ব্যাটসম্যান ভিভ

-১৯৮৬ সালে মাত্র ৫৬ বলে টেস্ট সেঞ্চুরী করেন তিনি। ২০১৪ সাল পর্যন্ত যেটি দ্রুততম টেস্ট সেঞ্চুরী ছিলো। ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ৫৪ বলে সেঞ্চুরী করে রেকর্ডটি নিজের করে নেন পরবর্তীতে।

-ওয়ানডেতে দ্রুততম সময়ে ১০০০ রানের রেকর্ড এখনো ভিভের (২১ ইনিংস)

-৪ নাম্বারে সর্বোচ্চ ওয়ানডে ইনিংস (১৮৯*)

-অন্তত ২০ ওয়ানডে ম্যান অব দ্যা ম্যাচ হওয়া প্রথম ক্রিকেটার

-ওয়ানডে একই ম্যাচে সেঞ্চুরী এবং ৫ উইকেট নেয়া প্রথম অলরাউন্ডার। এই রেকর্ড ২০০৫ পর্যন্ত অক্ষত ছিলো।

-ওয়ানডেতে ১০০০ রান এবং ৫০ উইকেটের “ডাবল” অর্জন করা প্রথম ক্রিকেটার।

ব্যাটসম্যান ভিভের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যায় অল রাউন্ডার ভিভ! মিডিয়াম ফাস্ট বোলিং অলরাউন্ডার ভিভ টেস্টে ৩২, ওয়ানডেতে ১১৮ আর প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে ২২৩ উইকেট নিয়েছেন। সেরা ওয়ানডে বোলিং ৪১/৬।

গত শতাব্দীর সেরা ৫ ক্রিকেটারের একজন ভিভ রিচার্ডস (অন্যরা স্যার ব্র্যাডম্যান, স্যার গ্যারি সোবার্স, স্যার জ্যাক হবস এবং শেন ওয়ার্ন)

Wisden এর মতে সর্বকালের সেরা ওয়ানডে ক্রিকেটার, আর টেস্টে স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান আর শচীন টেন্ডুলকারের পরেই ভিভের অবস্থান।

১৯৯৯ সালে তার দেশ এন্টিগার সরকার তাকে “নাইট” উপাধী প্রদান করে ফলে তাকে স্যার ভিভ রিচার্ডস বলা হয়।

১৯৯৪ সালে ব্রিটিশ OBE অর্থাৎ Officer of the Order of the British Empire উপাধী পান ক্রিকেটে ভূমিকার জন্য।

২০০৭ বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে এন্টিগায় তৈরী হয় “স্যার ভিভ রিচার্ডস স্টেডিয়াম”।

Wisden Cricketers’ Alamnack স্যার ভিভ রিচার্ডসকে Wisden Cricketrs of the Century ঘোষনা করার সময় তাকে বর্নণা করেছে এভাবেঃ

“He was attacking, aggressive but not a slogger. His trademark shot was a hitting across the line but his cover drives were gorgeous. He was a poet capable of violent poetry. A subtle artist who had the gift of ferocious performance. A man who made chewing gum a style statement. A man who defined swagger.

Sir Vivian Richards was Cricket’s first ever poster boy. A playboy. A one man evolution. A Knighted king. And Crickets most feared batsman ever.”

১৯৫২ সালের ৭ মার্চ পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের দেশ এন্টিগায় জন্মগ্রহণ করেন স্যার আইস্যাক ভিভিয়ান আলেকজ্যান্ডার রিচার্ডস।

Most Popular

To Top