টুকিটাকি

কি কি কারণে বিমান ক্র্যাশ করে?

কি কি কারণে বিমান ক্র্যাশ করে?- নিয়ন আলোয়

পুরো দুনিয়ার মানুষকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে সবচেয়ে সহজে ও স্বল্প সময়ে বেশি দুরত্ত্ব অতিক্রম করা যাবে এমন যান কোনটি? বেশির ভাগ মানুষই বলবে উড়োজাহাজ। আজকের দিনে উড়োজাহাজ সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা। যে পরিমাণ বিমান প্রতিদিন বিভিন্ন এয়ারপোর্ট থেকে উড়ে তার সংখ্যা কেউ প্রথম চেষ্টায় আন্দাজ করতেই পারবে না। Air Transport Action Group (ATAG) ২০১৪ সালে এভিয়েশান ইন্ডাস্ট্রির উপর একটি রিপোর্ট পাবলিশ করে যার ফলাফল অনুসারে ২০১৪ পুরো পৃথিবী জুড়ে ৩৭.৪মিলিয়ন বিমান আকাশে উড়েছিল। তার মানে প্রতিদিন গড়ে ১,০২,৪৬৫টি বিমান আকাশে উড়ে। এত এত হিসাব দেখে আমরা অবশ্যই বলতে পারি বিমানকে অনেক মানুষই অত্যন্ত নিরাপদ বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে। কালেভাদ্রে বিমান দূর্ঘটনা ঘটলেও কিন্তু বিমানের যাত্রীর সংখ্যা কমছে না। কারণ পরিসংখ্যান অনুসারে বিমান দূর্ঘটনার সংখ্যা অত্যন্ত নগন্য।

বিমান দূর্ঘটনা বাংলাদেশের জন্য আজকে অনেক গুরুত্ত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। বাংলাদেশ থেকে নেপালগামী ইউ-এস বাংলা এয়ারলাইন্স এর একটি বিমান নেপাল ত্রিভুবন এয়ারপোর্টের পাশে বিদ্ধস্ত হয়েছে গতকাল। এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ জনের বেশী নিহতের খবরও আমরা পেয়ে গেছি। ঘটনা যা ঘটার ঘটে গেছে। কিন্তু ঘটনা পরবর্তী ঘটনা এখন শুরু হবে। কেন দূর্ঘটনাটা ঘটল? কারণ কী? কে দোষী? শাস্তি কার হবে? তদন্ত কমিটি হবে। এই তদন্ত কমিটি জবাব দেওয়ার আগেই মিডিয়া জনগন মিলে পাইলট এবং এয়ারলাইন্স কোম্পানীকে একচোট দেখে নিবে। এদিক সেদিক শুধু কাদা ছুড়াছুড়ি। আমি বলব একদলা কাদা ছুড়ার আগে আপনিও একবার চিন্তা করে দেখুন না কেন হয় বিমান দূর্ঘটনাগুলো। এক্ষেত্রে আমিও আপনাকে সাহায্য করতে পারি কিছু পরিসংখ্যান, কিছু গবেষনার ফলাফল আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। এরপর আপনারাই সিদ্ধান্ত নিন কেন হয় বিমান দূর্ঘটনা।

এযাবৎ কালে যতগুলো বিমান দূর্ঘটনা হয়েছে তার একটিও শুধু একটা মাত্র সমস্যার কারণে হয়নি। কয়েকটি ইস্যু একত্রিত হয়েই বিমানকে দূর্ঘটনার দিকে ঠেলে দেয়। একটা উদাহরণ দেই। ধরুন একটি বিমানে হালকা যান্ত্রিক গলযোগ দেখা দিয়েছে। পাইলট যদি সঠিক ব্যবস্থা করতে না পারে বিমানটি ক্র্যাস করবে অবশ্যই। পরিসংখ্যান মতে বেশিরভাগ সময় বিমান দূর্ঘটনার পিছনে ৫টা প্রধান কারণ বিরাজ করে। এগুলো হলঃ

১. চালকের গাফিলতি (৫৫%)
বিমান একটি জটিল যন্ত্র। এক একজন চালকের বছরের পর বছরের অধ্যাবসায়ের ফলাফল পাইলট হওয়া। পাইলটের জন্য বিমান চালানোর যে ট্রেনিং আবার কো-পাইলটের বিমান চালানোর ট্রেনিং পুরোই ভিন্ন। পুরো বিমান চালানোর জন্য এত এত জটিল প্রক্রিয়া মনে রাখতে হয় যা সত্যিই অনেক কঠিন। এত এত জটিল যন্ত্র নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ছোটখাট ভুল করার অনেক কিছুই থাকে পাইলটের। এত বড় যন্ত্রের পুরো দায়িত্ত্ব যখন একজন পাইলটের উপরেই তখন কাজটা নিখুঁত ভাবে যদি করা না হয় তাহলে কত শত প্রাণ যে অনিশ্চিত হয়ে যাবে তার হিসাবটা কষা অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। বিমানের যেকোন দূর্ঘটনার শেষ রক্ষা করতে পারে একমাত্র পাইলটই। সঠিক সময়ে যদি একজন দক্ষ পাইলটের হাতে বিমান পড়ে তাহলে হয়তো বিমানকে ঝুঁকির মুখ থেকে বের করে আনতে পারবে। যদিও প্রতিটা বিমানে অটো-পাইলট মুড থাকে। এই ব্যবস্তায় কোন দূর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব না। তখন পাইলটেরই হাল ধরা লাগে।

২. যান্ত্রিক গলযোগ (১৭%)
উন্নত যান্ত্রিক ব্যবস্থার পরেও বিমানে মাঝে মাঝে দেখায় যায় যান্ত্রিক গলযোগ। সম্প্রতি ৪৫৯জন যাত্রি নিয়ে Qantas A380 বিমানটি পড়েছিল যান্ত্রিক গলযোগের মুখে। বিমানটি তখন ছিল ইন্দোনেশিয়ার বাটাম দ্বীপের উপর। একটু এদিক অদিক হলেই এত এত যাত্রী নিয়ে বিমানটি ক্র‍্যাস করত। কিন্তু দক্ষ চালকের হাত থাকায় বেঁচে ফিরেছে এতগুলো মানুষ। মাঝে মাঝে নতুন নতুন প্রযুক্তি নতুন রকমের গলযোগের সৃষ্টি করে। ৫০এর দশকে তখন আস্তে আস্তে বিমান আরো উচুতে চলা শুরু করে। এত উচুতে প্রেসারাইজড জেটগুলোতে নতুন রকমের সমস্যা দেখা দেওয়া শুরু করে। বিমানের যন্ত্রগুলো অতিরিক্ত প্রেসারের দরুন নির্জীব হওয়া শুরু করে। পরবর্তীতে হালের প্রেসার তত্ত্বানুসারে এই সমস্যার সমাধান করা হয়।

৩. বিরূপ আবহাওয়া (১৩%)
বর্তমান উন্নত প্রযুক্তির যুগে গ্যোসস্কোপিক কম্পাসস, উপগ্রহ নেভিগেশন এবং আবহাওয়ার তথ্য আপলিংসের মত ইলেকট্রনিক সাহায্যের পরও বিমানগুলোর হত্র হয় তুষার, কুয়াশা, ঝড় ইত্যাদির মধ্যে। ২০০৫সালের ডিসেম্বরে সাউথ-ওয়েস্ট এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১২৪৮ ওয়াশিংটন থেকে শিকাগো যাত্রার শেষে ল্যান্ডিং এর সময় তুষারঝড়ের মুখে পড়ে শিকাগো এয়ারপোর্টের রানওয়েতে এসে আছড়ে পড়ে। ১৯৫৮সালের ফেব্রুয়ারীতে এইরকম আরো একটি ঘটনা ঘটে। ব্রিটিশ এয়ারলাইন্সের একটা বিমান মিউনিখ থেকে যাত্রা শুরু করার সময় রানওয়েতেই ক্র্যাস করে।

৪. অর্ন্তঘাত (৮%)
ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত বিমান সূর্ঘটনা ৯/১১ এর ওয়াশিংটন ডিসির টুইন টাউয়ার ধ্বংস। অন্তর্গাতের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। এইদিনে হাইজ্যাকারা বিমান দখল করে সোজা আক্রমণ করে বসে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে।

৫. এটিসি, রানওয়ে, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ইত্যাদি (৭%)
এছাড়াও মাঝে মাঝে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এটিসি এর সাথে যদি একবার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় তাহলে বিমানকে কনট্রোল করা সম্ভব হয় না। আবার রানওয়ের সমস্যা তো আছেই।

এগুলোই হল প্রধান কারণ যার ফলে একটি বিমান ধ্বংস হয়। এখন আপনারাই বিবেচনা করে চিন্তা করে বুঝার চেষ্টা করুন আসলে দোষী কে।

Most Popular

To Top