বিশেষ

ডানপিটে মিনার

কয়েকদিন আগেই বেশ ঘটা করে পালন করা হল ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’। মেলবোর্নে ডেসটিনি সেন্টারে এ দিন এক বাংলাদেশী গায়ককে কনসার্টে আমন্ত্রণ জানানো হয়। গায়ক মঞ্চে উঠলেন গিটার হাতে, বাজালেন সেই চিরচেনা সুর। তারপর গেয়ে উঠলেন ‘সাদা রঙের স্বপ্নগুলো দিলো নাকো ছুটি, তাইতো আমি বসে একা…’ এরপরের পুরোটা সময় শ্রোতারাই গাইলেন, গায়ককে আর গাইতে হল না।

হ্যাঁ, বলছিলাম আধুনিক যুগের জনপ্রিয় শিল্পীদের একজন, মিনার রহমানের কথা, যিনি মিনার নামেই অধিক পরিচিত। খুব বেশিদিন হয়নি সঙ্গীত জগতে পদচারণা তাঁর, এরই মাঝে সঙ্গীত বোদ্ধাদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন নিজস্ব ধারার জন্য। একই সাথে সঙ্গীতশিল্পী, গীতিকার, সুরকার এবং কার্টুনিস্ট হলেও নিজেকে মূলত শিল্পী হিসেবে পরিচয় দিতেই বেশি পছন্দ করেন।

ডানপিটে মিনার neonaloy

মিনার রহমান

পৈতৃক নিবাস চট্রগ্রাম হলেও জন্ম ঢাকার বাসাবোতে। পিতা মোহাম্মাদ আজহারুল ইসলাম এবং মাতা নিলুফা ইয়াসমিনের ছয় সন্তানের সবচেয়ে ছোট মিনার। একমাত্র ভাই বলে বোনদের আদরও পেয়েছেন ছোটবেলা থেকেই।

বাসার সবাই বলতে গেলে ছবি আঁকত। মিনারও ছোটবেলায় ছবি আঁকতে অনেক পছন্দ করতেন। গানের প্রতি ভালোবাসা তখনও বেশি না। আর্কিটেক্ট হওয়ার স্বপ্নও দেখতেন। ক্লাস টু থেকেই কার্টুন আঁকতেন।

তাঁর ভাষায়, “ছোট থেকেই প্রচুর কমিক বই পড়তাম আমি। কমিকের সেই গাট্টি এখনও আছে। আমার কাজে টিনটিন বিশাল অনুপ্রেরণা। এ ছাড়া নন্টে-ফন্টে, ব্যাটম্যান, ফ্যান্টম, হি-ম্যান কমিকস এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলতাম। এ ভাবেই কখন যেন কার্টুনের দিকে ঝুঁকে যাই”।

২০০৭ সালে কার্টুনিস্ট হিসেবে মিনার কাজ করেছেন ‘উন্মাদম্যাগাজিনে। দৈনিক প্রথম আলোর ক্রোড়পত্র ‘রস-আলো’তেও কাজ করেছেন। খালেদ হাসানের সহায়তায় ২০১৩ সালের অমর একুশে বইমেলায় মিনারের একটি কমিকস বই বের হয়। নাম ‘গাবলু’। ভবিষ্যতে ‘গাবলু’ নিয়ে আরও কাজ করার কথা জানিয়েছেন মিনার।

ডানপিটে মিনার neonaloy

 

গল্পের বইও ভালোবাসেন মিনার। ছোটবেলা থেকেই দারুন আগ্রহ। ক্লাস থ্রিতে থাকতে প্রথম গল্পের বই উপহার পান। সেটা ছিল সত্যজিৎ রায়ের শুঙ্কু সমগ্র। দেড় সপ্তাহে শেষ করেছিলেন পুরো বইটা। এরপর থেকে গল্পের বইও পড়া শুরু করেন সমান তালে। বইয়ের প্রতি আগ্রহের জন্যই প্রচুর বই উপহারও পেয়েছেন। মিনারের মতে, ‘এই বইগুলোই আমাকে সমৃদ্ধ করেছে, এই জ্ঞান গুলোই পরবর্তীতে গানের কাজে ব্যবহার করেছি আমি’।

বাবার গলায় গান শুনে প্রথম গানের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। বাবা গাইতেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান। বাবার গান শুনে মুগ্ধ হওয়ার পরই মূলত সঙ্গীতের দিকে আগ্রহ জাগে। নিজের আঁকা ছবির বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে গানের লিরিক লিখে ফেলেন সেই ক্লাস ফোরেই। এরপর চলতে থাকে টুকটাক গান লেখার কাজ। সেই সাথে কিবোর্ড, গিটারসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র রপ্ত করার অনুশীলনও চলতে থাকলো। ক্লাস টেনে এসে প্রথম সুর দিলেন গানে। গানের প্রতি ছেলের এমন উৎসাহ দেখে মা জন্মদিনে একটা কিবোর্ড উপহার দিলেন। কিবোর্ড উপহার পেয়ে উৎসাহ আরও বেড়ে গেল। আশেপাশের বিষয়বস্তু নিয়েই গান লিখতে থাকেন, সেই সাথে চলতে থাকে সুর দেয়াও। প্রভাব ছিল ‘কোল্ডপ্লে’, ‘পিঙ্ক ফ্লয়েড’ ‘অর্ণবে’রও। এমনি করেই প্রায় বিশটি গান তৈরি হয়ে হয়ে গেল। এর মধ্য থেকে বাছাই করে তেরোটি গান নিয়ে যোগাযোগ করলেন রেকর্ড লেবেল প্রতিষ্ঠান জি-সিরিজের সাথে। সেখানেই পরিচয় হলো এ প্রজন্মের আরেক জনপ্রিয় গায়ক তাহসানের সাথে। তাহসান রেকর্ড করা গান শুনে মুগ্ধ হলেন। মিনারের ভিতর অপার সম্ভাবনা দেখতে পেলেন। তাঁরই সঙ্গীতায়োজনে অগ্নিবীণার ব্যানারে ২০০৮ সালের অগাস্টে মিনারের প্রথম একক অ্যালবাম ‘ডানপিটে’ প্রকাশিত হয়। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

ডানপিটে মিনার neonaloy

এ সময়ের দুই জনপ্রিয় শিল্পী তাহসান ও মিনার

‘ডানপিটে’ বের হয়েছিলো মিনারের এসএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার দুই মাসের মধ্যেই। এ্যালবাম বের হওয়ার কয়েকদিন পরেই কনসার্টের জন্য ডাক পড়ে চট্রগ্রামে। সে কনসার্টে উপস্থিত হলেও পরিবারের সদস্যরা দ্বিধার ভিতরে ছিল, ছেলেকে গানের এই অনিশ্চিত জগতে ছেড়ে দিবে কিনা। এ কনসার্টের পর পরই বসুন্ধরা কনভেনশন হলে গ্রামীণফোন জিপি নাইট অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার জন্য ডাক পড়ে মিনারের। সেদিন মিনারের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে গান গেয়েছিল ৫ হাজার শ্রোতা। এ রাতের পর আর কখনও মিনারকে পারিবারিক বাঁধার সম্মুখীন হতে হয় নি। মিনারের ভাষায়, ‘জিপি অনুষ্ঠানের রাতেই আমি এ বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছি যে, আমার গান সর্বত্র গৃহীত হয়েছে’।

২০০৯ সালে জি-সিরিজের ব্যানারে মিশ্র এ্যালবাম ‘দ্যা হিট এ্যালবাম ২’ এ মিনারের একটি গান প্রকাশিত হয়। ২০১১ সালের ২৬ এপ্রিল তাহসানের সঙ্গীতানুষ্ঠানে মিনারের দ্বিতীয় এ্যালবাম প্রকাশিত হয়। এ এ্যালবামের একটি গানে তাহসান মিনারের সাথে কণ্ঠ দেন। প্রায় তিন বছর পর, ২০১৫ সালের ৬ জুন, মিনারের তৃতীয় একক এ্যালবাম ‘আহারে’ প্রকাশিত হয়। একক এ্যালবাম ছাড়াও মিনার বেশ কয়েকটি নাটক এবং টেলিফিল্মের জন্যও গান গেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, রিদওয়ানা রনি পরিচালিত ‘আইসক্রিম’, ‘এফএনএফ’; শিহাব শাহিনের টেলিফিল্ম ‘নীল পরী নীলাঞ্জনা’, তানিম রহমান অংশু পরিচালিত ‘ইম্পসিবল ৫’, ‘ফিওনা এন্ড লাইফ’ ইত্যাদি।

উল্লেখ্য, এআইইউবি(আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ) থেকে গণমাধ্যমে স্নাতক করেছেন মিনার।

আরো পড়ুনঃ বায়ান্ন তাসের বাপ্পা 

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top