ইতিহাস

মিরাকল অফ জোহানসবার্গ!

মিরাকল অফ জোহানসবার্গ!- নিয়ন আলোয়

আফ্রিকা সফরে আছে অস্ট্রেলিয়া, চলছে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ। তাও আবার প্রথম চার ম্যাচ ২-২ লেভেল! এর মধ্যে পঞ্চম ম্যাচটি ওয়ান্ডারার্স জোহানসবার্গ স্টেডিয়ামে। আফ্রিকায় যে কয়টা স্টেডিয়াম আছে তন্মধ্যে এটি সবচেয়ে বেশি দর্শক ধারন ক্ষমতা রাখে। আর দু’দলের অঘোষিত ফাইনালটা এই স্টেডিয়ামেই।

এপিক বাদ দিয়ে টপিকে আসি। যথারীতি ম্যাচ শুরু হল। প্রথমে ব্যাট করল সফরকারীরা। দুই ওপেনার এডাম গিলক্রিস্ট ও সাইমন ক্যাটিচ শুরু করলেন আফ্রিকান বোলারদের নিয়ে ছেলেখেলা! ১৫ ওভারেই শতকের কাছাকাছি নিয়ে গেলেন দলীয় রান, ষোলতম ওভারে গিলি ফিরে গেলেও রয়ে গেলেন ক্যাটিচ। আর ক্রমশই ভয়ংকর হয়ে ওঠা ক্যাটিচের সাথে যোগ দিলেন অজি কাপ্তান পন্টিং (ম্যাচের দ্বিতীয় নায়ক)।

এই কাপল মাঠে ছিল আরো ১৫ ওভার। ততোক্ষণে ঝড়ের গতি বেড়ে অজিদের রান ২২০’র ঘরে। এবার ফিরলেন ক্যাটিচ, কিন্তু তখনো মাঠে আছেন পন্টিং। আর তার সাথে যোগ দিলেন মাইকেল হাসি!

হাসিও পন্টিংয়ের সাথে ছিলেন ১৫ ওভার! তারপর ফিরে গেলেন প্যাভিলিয়নে। ম্যাচের তখন ৪৭ ওভার চলছে, অজিদের স্কোর ৩৭৪! এখানে ছোট্ট করে বলছি- ফিরে যাওয়া তিনজন ব্যাটসম্যানই কিন্তু পঞ্চাশোর্ধ রান করেছেন। গিলি ৫৫, ক্যাটিচ ৭৯ আর হাসি ৮১। বল শেষ না হলে হয়তো এন্ড্রি সায়মন্ডসও ২৭* ওই ফিগারে পৌঁছে যেতেন।

এতক্ষণ বলছিলাম সাইড নায়কদের কথা, এখন বলব মূল নায়কের কথা। ৪৬.১ ওভারে অজিদের স্কোর ৩৭৪/৩ থেকে ৪৭.৪ ওভারে (৯ বলের ব্যবধানে) স্কোর ৪০৭! কী ঝড়টাই না বয়ে গেল!

৪৭.৪ ওভারে আউট হওয়ার আগে পন্টিং খেলেছেন তার নিজের ক্যারিয়ার সেরা ১৬৪ রানের ইনিংসটি।

৫০ ওভার শেষে অজিদের স্কোর ৪৩৪/৪! তখনকার দিনে একদিনের ক্রিকেটে এটিই দলীয় সর্বোচ্চ রান। আর এই রান তাড়া করে জেতা তো কল্পনাতীত! কিন্তু দলটা যখন স্মিথ-গিবসদের নিয়ে গড়া আফ্রিকা, তখন জলিলের ভাষায় বলতেই হয়- অসম্ভবকে সম্ভব করা গিবসদের কাজ।

৪৩৫ রানের জবাবে ব্যাট করতে নেমে দ্বিতীয় ওভারেই আঘাত খায় প্রোটিয়ারা, তিন রানে ফিরে যান ডিপেনার। কিন্তু অন্য প্রান্তে থাকা গ্রায়েম স্মিথের সাথে ঘর বাঁধেন হার্সেল গিবস! দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে দুইজনে মিলে ২০ ওভারে যোগ করেন ১৮৭ রান। দলীয় রান যখন ১৯০ তখন কার্কের বলে হাসির হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান স্মিথ, তার সংগ্রহ ছিল ৯০(৫৫)। ক্রিজে আসেন তরুণ এবি, কিন্তু আজকের এবির সাথে তুলনা হয় কেবল সেদিনকার গিবসের সাথে। এবির পর ক্যালিস এল, কিন্তু এর মাঝেই ফিরে গেলেন হার্সেল গিবস। কিন্তু কী নিয়ে ফিরেছেন? ও হ্যাঁ, ম্যাচসেরা হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ১১১ বলে ১৭৫ রানের ঝলমলে ইনিংসটি নিয়ে ফিরে গেলেন!

দলের স্কোর তখন ২৯৯/৪। ম্যাচ জয়ের জন্য তখনো দরকার আরো ১৩৫ রান, হাতে আছে ৬ উইকেট, আর আছে ১০৮ টি বল।

প্রোটিয়াদের তখন একজন বীর দরকার যে কিনা এমন ম্যাচে সহজ জয় এনে দেবে। এমন সময় ক্রিজে এলেন প্রোটিয়াদের সর্বকালের সেরা উইকেট কিপার কাম ব্যাটসম্যান মার্ক বাউচার। বাউচার ৫০ করে ছিলেন অপরাজিত, তবে এর মাঝে তার একটি ক্যাচ ফেলে দিয়েছিল বদলি খেলোয়াড় এঞ্চর!

এবার একটু শেষের দিকে যাই- দলের স্কোর যখন ৪২৩/৮ তখন বল বাকি আছে মাত্র ১০ টি। আর শেষ ওভারে দরকার পড়ে ৭ রানের। বল করতে এলেন ব্রেট লি। প্রথম বলেই এন্ড্রু হলের বাউন্ডারি এবং তৃতীয় বলে আউট! বাউচার নন স্ট্রাইকে। ১১ তম ব্যাটসম্যান হিসেবে ক্রিজে এলেন মাখায়া এন’টিনি। শ্বাসরুদ্ধকর মুহুর্ত!

কিসের এত চিন্তা? পঞ্চম বলে লি’কে মেরে দিলেন মিড অফের উপর দিয়ে, বল ওভার বাউন্ডারি! ৪৩৮ রান! হোয়াট আ ম্যাচ! হোয়াট আ উইনিং! তৈরি হয়ে গেল ‘মিরাকল অফ জোহানসবার্গ’।

প্রোটিয়ারা ম্যাচ জিতল এক উইকেট এবং এক বল হাতে রেখে। ক্রিকেটে আজ পর্যন্ত এত রান তাড়া করে জেতার সাহস দেখাতে পারেনি কেউ। আর এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন ম্যাচটি হয়েছিল আজ থেকে ১২ বছর আগে, অর্থাৎ ২০০৬ সালের আজকের দিনে!

লিখেছেনঃ রাজু শাহদাত

Most Popular

To Top