নাগরিক কথা

মশা মারতে বিমান নামানো

মশা মারতে বিমান নামানো

কিউলেক্স মশার কামড়ে ফাইলেরিয়া বা গোদ রোগ হয়, তবে আমাদের দেশের কিউলেক্স মশা এ রোগের জীবাণু বহন করে না। কিন্তু মশার কামড় আর কানের কাছে শো শো শব্দ খুবই বিরক্তিকর।

রাজধানীর মশা মারতে দুই সিটি করপোরেশনের চলতি অর্থবছরের বাজেট প্রায় ৫০ কোটি টাকা। এত বড় মাপের বাজেট নিয়ে সিটি করপোরেশন কি করছে, চলুন তার খানিকটা জেনে নেয়া যাক।

উত্তর সিটি করপোরেশনে মশা নিধনে কর্মীর সংখ্যা ৩০০। সিটি করপোরেশনের ৩৬ টি ওয়ার্ডের জন্য এই কর্মী যেমন অপ্রতুল তেমনি মশা নিধনে যন্ত্রপাতির অবস্থাও বেশ করুণ। উত্তর সিটি করপোরেশনে হস্তচালিত মেশিন আছে ৫৬৭ টি এর মধ্যে অকেজো ২৫০। ফগার মেশিন ৩১৫ টি এর মধ্যে ৬০ টি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। হুইল ব্যারো মেশিন আছে ২২ টি এর মধ্যে কাজ করে না ১২ টি।

একইভাবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৫৭ টি ওয়ার্ডের মশা নিধনে কর্মী আছে ৩১৯ জন। হস্তচালিত মেশিনের ৫৬২ টির মধ্যে ২১২ টি নষ্ট। ফগার মেশিনের সংখ্যা ৪৫২ টি, যার মধ্যে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে ২১২ টি মেশিন। ৫১ টি হুইল ব্যারোর মধ্যে বিকল ৩০ টি।

এই অবস্থায় রাজধানীর মশা তাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না সিটি করপোরেশনের পক্ষে। যেটুকু ওষুধ ছিটানো হচ্ছে তাতেও রয়েছে বড় রকমের ফাঁকি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মশার প্রজনন স্থানেই ছিটানো হচ্ছে না ওষুধ। এসব জায়গায় লার্ভিসাইডের কোন উদ্যোগ নেই। বদ্ধ জলাশয়, ডোবা, খাল, নালা এবং ড্রেন গুলোতে নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হয় না বলে জানা যায় এলাকাবাসীর কাছ থেকে।

এদিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঘটে গেছে এক বিব্রতকর ঘটনা। ২২ ফেব্রুয়ারি মশার কারণে আটকে যায় মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট। সেদিন, বিমানে যাত্রীরা ওঠার পর বিমান যখন রানওয়েতে চলতে শুরু করে, সেসময় যাত্রীরা মশার কামড়ে টিকতে না পেরে বার বার অভিযোগ করতে থাকে। বাধ্য হয়ে পাইলট, রানওয়ে থেকে ফিরিয়ে আনে বিমান। এরপর মশা তাড়াতে যজ্ঞ চলে দুই ঘন্টা। নির্দিষ্ট সময়ের দুই ঘন্টা পর, বিমান ডানা মেলে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে।

বিমান তো ছেড়ে গেলো, কিন্তু ক্ষুদ্র মশার কারণে বৃহৎ বিমান আটকে যাওয়ার ঘটনা ততক্ষণে সংবাদের শিরোনাম। এমন সংবাদে কেউ হয়তো হেসেছেন, কেউ কেশেছেন তবে দেশের সম্মানের যে বারোটা বেজেছে তা কি খেয়াল করেছেন? এমন ঘটনা তো আর একদিনের হেয়ালিপনার কারণে ঘটেনি। একদিনেই বিমানবন্দরে এত মশা ভিড় করেনি। শাহজালাল বিমানবন্দরের মশার উপদ্রব নিত্য ঘটনা, এটা নতুন কিছু নয়। তাহলে কেন কর্তৃপক্ষ মশা তাড়াতে পারছে না?

কারণগুলো একটু বিশ্লেষণ করা যাক। ইন্টারন্যাশনাল হেলথ রেগুলেশনের নিয়ম অনুযায়ী বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে তার আশপাশের এলাকার ৪০০ গজের ভেতর কোন মশা থাকা যাবে না। এ বিষয়টা দেখভালের দায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। নিয়মনুযায়ী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ বছরে তিন থেকে চারবার বিমানবন্দরে সার্ভে পরিচালনা করে থাকে। ২২ ফেব্রুয়ারি এই বিব্রতকর ঘটনা ঘটার দুমাস আগেই বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে মশার উপদ্রব বাড়া নিয়ে সতর্ক করে চিঠি দিয়েছিলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ। ৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ তে পাঠানো সেই চিঠিতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য বলা হয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। চিঠির সাথে সংযুক্ত করে দেয়া হয় অক্টোবরের শেষ থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চালানো সার্ভে প্রতিবেদন।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, বিমানবন্দরে প্রতিঘন্টায় একজন মানুষ ২০৩ বার মশার কামড় খাচ্ছে। এছাড়া বিমানবন্দরের ভেতর, বাহিরে কোন কোন স্থানে মশার উপদ্রব বেশি তাও চিহ্নিত করে দেয়া হয় প্রতিবেদনে। এছাড়া, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ মশা তাড়াতে প্রতিদিন যে ওষুধ ছিটাচ্ছে তাও মানসম্মত নয় বলে বলা হয় ঐ প্রতিবেদনে। রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ সেই ওষুধ ১০৫ টি মশার উপরে স্প্রে করে ২৪ ঘন্টা পর দেখতে পায় সেখানে ৮৬টি মশাই জীবিত থাকছে। কিন্তু এই আগাম সতর্কবার্তা কোন কাজেই আসলো না।

বিমানবন্দরে, ঢাকা বিভাগ থেকে নিয়োগ হওয়া একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তাসহ একটি স্বাস্থ্য বিভাগ রয়েছে। এই বিভাগের অধীনে বিমানবন্দরে প্রতিদিন মশা নিধনের জন্য আছে মশক নিধন কর্মীর নয়টি পদ, যার মধ্যে ৭টি পদই শূন্য অবস্থায় আছে গত প্রায় ১৮ বছর ধরে।

এমন সব ঘটনার মধ্যে যোগ হয়েছে একটি ‘ট্রল’। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়রের করা একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। সেখানে দেখা যায়, মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে বিমানবন্দরের বাইরের অংশের রাস্তা ও ফুল বাগানে এবং সেটি লাইভ করছেন উত্তরের প্যানেল মেয়র। বিষয়টা এমন হয়েছে যে, যে কাজ প্রতিদিন করার কথা, সে কাজ একদিন করতে গিয়েও প্রচারনাটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। তবে, এই ওষুধ ছিটানোতে আদৌ কি কমবে সেখানকার মশা? যেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন বলা আছে, বিমান বন্দরের বেশিরভাগ মশাই বিমানবন্দরের এলাকার ভেতরে।
মশা নিধনে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও। তবে সেই প্রোগ্রামেও মশার প্রজনন স্থানগুলোতে নেই কোন কর্মতৎপরতা।

সব কিছু মিলিয়ে যখন আমাদের সিটি কর্পোরেশনের মশা নিধনের এমন করুণ অবস্থা, তখন মশা তো শক্তিশালী হবেই। বিমান থামিয়ে দিয়ে মশা তার নিজের শক্তি একবার প্রদর্শন করেছে।
এখন বাকী রইলো আরেকটি বড় আশঙ্কার। তা হলো, সামনেই আসছে এডিস মশার মৌসুম। এভাবে চলতে থাকলে ডেংগু কিংবা চিকুনগুনিয়া রোগের প্রকোপ এবছর বাড়বে, এই আশঙ্কাই এখন জনমনে প্রবল।

Most Popular

To Top