নাগরিক কথা

আমাদের বাতিঘরঃ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আমাদের বাতিঘরঃ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল- Neon Aloy

তাঁর দোষ- তিনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখেন, ইতিহাস বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে লিখেন।
তাঁর দোষ- তিনি একটি প্রজন্ম তৈরী করেছেন যারা দেশের কথা ভাবে, মুক্তিযুদ্ধের কথা ভাবে।

তাঁর ভাই হুমায়ূন আহমেদ অনেক বছর আগে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় টেলিভিশানে প্রথমবারের মত জাতিকে শুনিয়েছিলেন, “তুই রাজাকার” (একটি তোতাপাখির কন্ঠে)।

আর তিনি তাঁর নিজের কন্ঠে ২০১৩ সালে শাহবাগে স্লোগান ধরেছিলেনঃ

‘ক’ তে কাদেরমোল্লা – তুই রাজাকার, তুই রাজাকার।
‘ন’ তে নিজামি – তুই রাজাকার, তুই রাজাকার।
‘গ’ তে গোলাম আযম – তুই রাজাকার, তুই রাজাকার।
‘স’ তে সাকা – তুই রাজাকার, তুই রাজাকার।

তাঁর একটি বড় দোষ- তিনি শিশু কিশোরদের জন্য লিখেন, স্বপ্ন দেখান। তাদেরকে বিজ্ঞানের কথা বলেন, সত্যের কথা বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বলেন। বাংলাদেশে এতগুলো বছর পরে তাঁর মত করে কেউ শিশু কিশোরদের এত কাছে যেতে পারেনি।

তিনি খুব মমতার সাথে আরেকটি কাজ করেন। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শিশু কিশোরদের শোনান, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের কথা শোনান। তিনিই, একমাত্র তিনিই বলতে পারেনঃ

তোমরা বড় হয়ে কেউ ডাক্তার হবে, কেউ ইঞ্জিনিয়ার হবে, কেউ পাইলট হবে, কেউ রাজনীতিবীদ হবে, কেউ মন্ত্রী হবে, কেউবা প্রেডিডেন্টও হয়ে যেতে পারো। কিন্তু ইচ্ছে করলেও তোমারা কেউ মুক্তিযোদ্ধা হতে পারবে না। সুতারাং যে মুক্তিযোদ্ধারা দেশের প্রয়োজনে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছিলেন, তাঁদের যথাযথ সম্মান দেখাবে। সম্মান দিয়ে কথা বলবে। আর মহান মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক ও দেশপ্রেমের চেতনা নিজেতে ধারণ করবে।

তাঁর দোষ তিনি মনে করেন এই দেশ চালানোর দায়িত্ব থাকবে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মানুষদের হাতে, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দুইদল বা বহুদলের হাতে। এদের একদল থাকবে ক্ষমতায়, অন্যদল থাকবে বিরোধী দলে। দুই দলেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের উপস্থিতি থাকবে না। সুতারাং জাফর ইকবালেরতো দোষের মাত্রা অসীম হওয়ারই কথা। কারণ দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের একটি হলো বিএনপি; জামাতের সাথে তাদের রাজনৈতিক সন্ধি বহুদিনের। তারা এক সাথে দেশ শাসনও করেছে কিছুদিন। রাজনৈতিক দলের আরেকটি হলো আওয়ামীলীগ। এই দল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল। বঙ্গবন্ধু এই দলের প্রধান ছিলেন। এই দলের সব জায়গায় এখন রাজাকারদের বিচরণ। ছেলেমেয়েদের বৈবাহিক সূত্রে কিছু রাজাকার এখন আওয়ামীলীগের হর্তাকর্তাদের আত্মীয়ও। জাতীয় পতাকাও এদের গাড়িতে শোভা পেতে দেখা যায়।

তাঁর আরও একটি দোষ আছে। তাঁকে কে বলেছে এত ভালো অধ্যাপক হতে? এত ভালো গবেষক হতে? তাঁকে কে বলেছিলো দেশে প্রথম মুঠোফোনের মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষা চালু করতে? কে বলেছিলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রথম ফাইবার অফটিক নেটওয়ার্ক, প্রথম বাংলা সার্চ ইঞ্জিন বা ড্রোন তৈরী করতে? কে বলেছিলো এক ঝাঁক মেধাবী তরুণ সৃষ্টি করতে যারা মাইক্রোসফট, গুগল, আমাজন, নাসায় কাজ করবে? দেশের হয়ে পৃথিবী বিখ্যাত সব আইটি কম্পিটিশানে চ্যাম্পিয়ন, রানার আপ হবে? সর্বোপরী তাঁকে কে বলেছিলো শাবিপ্রবি’র ব্যান্ডনেম হতে? শাবিপ্রবি মানেই জাফর ইকবাল- এটি কেন হবে? কেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্রছাত্রী তাঁকে এত শ্রদ্ধা করে?

তাঁর দোষ তিনি বর্তমান সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর ব্যার্থতা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেন। প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া নিয়ে তিনি কয়েকবছর আগে থেকে চিৎকার চেঁচামেচি করে আসছেন। এমন কী তিনি এর প্রতিবাদে শহীদ মিনারেও বসেছেন।

তাঁর দোষ তিনি বেশি বেশি বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু করেন। এত বেশি করেন যে তিনি একটি প্রজন্মের মস্তিষ্কের খুব গভীরে এই মহানায়কের জীবন ও কর্ম সম্বন্ধে একটি স্পষ্ট ধারণা ঢুকিয়ে দিয়েছেন। একটি প্রজন্ম তৈরী করে ফেলেছেন যারা জাতির এই মহা নায়ককে নতুন করে জানতে চেষ্টা করছে। যারা এখন মনে প্রাণে বিশ্বাস করে বঙ্গবন্ধু না এলে বাংলাদেশ নামক মহাকাব্য কখনও লেখা হত না। আর এতেই অনেকেই তাঁকে আওয়ামীলীগের লোক মনে করে। ঠিক আছে, বঙ্গবন্ধুকে পছন্দ করেন ভালো কথা, তাই বলে ৭ ই মার্চের ভাষণ যখন ইউনেস্কোর সেরা ভাষণের স্বীকৃতি পেলো তখন কী দরকার ছিলো- ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলার? নিশ্চয়ই আওয়ামীলীগের দালালী করেন না হলে এটি কেন করতে হবে? জামাত বিএনপির সময় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে তো স্বাধীনতার ঘোষক বলে কোন স্লোগান বা লেখা লিখেননি। বরং এই কয়দিন আগেও কর্ণেল অলি আহমেদ জিয়াউর রহমানকে যখন স্বাধীনতার ঘোষক বলে সেই পুরানো কেচ্ছা কোন এক টিভি চ্যানেলে বলছিলেন তখন দর্শকদের মধ্য থেকে এই প্রজন্মের একটি মেয়ে এর প্রতিবাদ করে উঠলো। জাফর স্যারের কী দরকার ছিলো এই মেয়েটির সাথে অলি আহমেদের এই ঘটনাটি নিজের বহুল পঠিত লেখায় টেনে এনে জিয়াউর রহমানকে প্রকারান্তরে স্বাধীনতার ঘোষক না বলে দেওয়া।

তাঁর আরেকটি বড় সমস্যা ছিলো তিনি প্রকাশ্যে নামাজ রোজা করেন না। তিনি জামাতি বামাতি আওয়ামীলীগ বা বিএনপির নেতাদের মত প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়েন না। এতদিনে অগোচরে থাকা এই বিরাট সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসলেন তারই বিভাগের কয়েকজন অধ্যাপক। এই সব অধ্যাপকগণ নবী করীম (সা:) এর জীবনাদর্শে চলেন। এই অধ্যাপকদের মধ্যে থেকে জাফর ইকবাল স্যারের প্রক্তন ছাত্র বর্তমানে সিএসই’র হেড এবং আইআইসিটির পরিচালক অধ্যাপক ডঃ মুহাম্মদ শহিদুর রহমান প্রকাশ্যে প্রতিবাদ সভায় বলেন, “আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখুন। আমরা তাঁর কলিগরাই অনেকে মৌলানা, স্যার যদি ইসলাম বিদ্বেষী হতেন, আমাদের তো এখানে চাকরিই হতোনা। স্যার কখনো আমাদের ধর্ম পালনে কোন বাধা দেননি”। তিনি আমাদের আরও একটি অজানা কথা বলেন। তিনি বলেন, জাফর স্যারের মায়ের মৃত্যুর আগে যে কয়দিন হাসপাতালে ছিলেন। তাতে তাঁর কয়েক ওয়াক্ত নামাজ মিস হয়েছে। মায়ের মৃত্যুর পরে জাফর স্যার নিজে এসে তাঁকে (অধ্যাপক ডঃ মুহাম্মদ শহিদুর রহমানকে) জিজ্ঞেস করেছেন এই মিস হওয়া নামাজের কাফফারা কিভাবে দিতে হবে? তিনি তখন মুফতির কাছ থেকে মাসালা এনে স্যার কে জানিয়েছিলেন। স্যার তখন টাকা দিয়ে ঐ কাফফারা আদায় করেছিলেন। এই বলে তিনি উপস্থিত সবাইকে প্রশ্ন করেন, “আপনারাই বলুন, একজন ধর্ম বিদ্বেষী মানুষ কি এগুলা কেয়ার করবে?”

অধ্যাপক ডঃ মুহাম্মদ শহিদুর রহমান সেই সভায় আরও একটি অজানা ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একবার জাফর স্যার ভুল করে একই সময়ে দুইটা অনুষ্ঠানে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পস্তাচ্ছিলেন। আর বলছিলেন, “আমি খোদার কাছে দোয়া করছি আমাকে এই পরিস্থিতি থেকে যেন বাঁচান”। পরে ঘটনাক্রমে ঐদিন হরতাল হয়েছিল, স্যারকে কোথাও যেতে হয়নি। তো আপনারাই বলেন একজন নাস্তিক মানুষ কি আল্লাহর কাছে দোয়া করবে?

পাদটীকাঃ
১.
উপরের তথ্যগুলো থেকে এটিই প্রমাণিত হয় যে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলা, শিশু কিশোরদের জন্য লেখালেখি করা আর এদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলা এবং সর্বোপরী প্রকাশ্যে নামাজ না পড়াটাই জাফর ইকবাল স্যারের মূল সমস্যা। এই সমস্যাটি এত বড় সমস্যা যে তাঁকে হত্যা করার মত কাজ করতেও ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের বা ধর্মব্যাবসায়ীদের চেষ্টার কমতি নেই।

২.
অনেকেই যেভাবে জাফর স্যারের নামাজ পড়াকে সামনে এনে ধর্মান্ধ বা ধর্মব্যাবসায়ীদের তাকে আঘাত না করার একটা যুক্তি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চালাচ্ছেন (উপরের বর্ণনায় যেভাবে অধ্যাপক শহীদুর রহমান করেছেন), তাতে মনে হচ্ছে আপনি মনের অজান্তেই যারা প্রকাশ্যে নামাজ পড়বে না তাদেরকে এইভাবে কুপিয়ে হত্যা করাকে অপরাধ না ভেবে বরং জায়েজ করার একটি যুক্তি দাঁড় করিয়ে দিলেন। আর তাই আমি আজকের লেখার শেষের অংশটি কখনও লিখতে চাইনি। কিন্তু শুধু ব্যক্তি জাফর ইকবাল স্যারকে সঠিক ভাবে বুঝানোর জন্য এই অংশটি এখানে লিখলাম।

ছবি কৃতজ্ঞতা : এ আর টি তমাল

লিখেছেনঃ ড. মুহম্মদ জে এ সিদ্দিকী, গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটি, ব্রিসবেন।

Most Popular

To Top