ইতিহাস

আমাদের সভ্যতা কি ধ্বংসের ঠিক মুখোমুখি চলে এসেছে?

সভ্যতা নিয়ন আলোয় neon aloy

প্রত্যেক জিনিসেরই একটা শুরু আছে এবং তার শেষও আছে; সেটা প্রাণী হোক কিংবা বস্তু। একসময় নিজের কেনা শখের খেলনাটা যত্নে রাখা থাকলেও এক সময় না এক সময় ঠিকই নষ্ট হয়ে যায়। ঠিক তেমনই সব সভ্যতারও একটা শেষ আছে। আমরা ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পারব যে যুগে যুগে অনেক সভ্যতা, অনেক জাতি এসেছে কিন্তু প্রত্যেকেই একটা নির্দিষ্ট সময় শেষে হয় বিলুপ্ত হয়ে গেছে, নতুবা অতীত ঐতিহ্য হারিয়ে ধুঁকে ধুঁকে টিকে আছে। কিন্তু কারণ কি এর?

পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকে অনেক জাতি, অনেক সভ্যতাই এসেছে; আবার হারিয়ে গেছে। তাহলে আমাদের বর্তমান যে সভ্যতা, সেটাও কি একদিন এরকম শেষ হয়ে যাবে? আমরাও কি একদিন নাই হয়ে যাবো? অদূর ভবিষ্যতেই কি পাঠ্যবইয়ের বিলুপ্ত সভ্যতার তালিকায় আমাদের গণতান্ত্রিক-পুঁজিবাদী সভ্যতার নাম চলে আসবে? এত প্রাচুর্য, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত সভ্যতা কি একেবারে নিঃশেষ হয়ে যাবে? ইতিহাস কিন্তু সেরকমই ইঙ্গিত দেয়! ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে যুগে যুগে অনেক জাতি, অনেক সভ্যতাই অনেক উন্নতি করেছে। কিন্তু কেউ কি নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পেরেছে? ইতিহাসবিদরা অনেক বছর ধরেই এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছেন এবং অবশেষে তার উত্তরও পেয়েছে। হ্যাঁ, প্রত্যেক জাতি কিংবা সভ্যতারই শেষ আছে, সে সভ্যতা যত উন্নতি হোক না কেন।

এখন আপনি দাবী করতে পারেন যে পূর্বের সভ্যতাগুলো ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ পায়নি, যেই সুযোগ আমাদের আছে। আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারি, যে সুযোগটা হয়তো মুঘল কিংবা অ্যাজটেকদের ছিল না। এই দাবীর সাথে অবশ্য দ্বিমত পোষণ করেছেন প্রখ্যাত জার্মান দার্শনিক হেগেল (১৭৭১০-১৮৩১)। হেগেলের ভাষ্যমতে,

“ইতিহাস এবং অভিজ্ঞতা আমাদের এটাই শিখায় যে সাধারণ মানুষ কিংবা রাষ্ট্রনায়করা কখনোই অতীত থেকে শিক্ষা নেন না, অথবা ইতিহাসের ভুলগুলো বিবেচনা করে কাজ করেন না।”

এ ব্যাপারে আরো সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইতিহাসবিদ স্যার জন ব্যাগট গ্লাব, যিনি “গ্লাব পাশা” নামেও পরিচিত। তিনি তার The Fate of Empires and the Search for Survival বইতে সভ্যতাগুলোর উন্মেষ ও পতন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তার মতে যেকোন জাতি কিংবা সভ্যতা ৭টি পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে যায়। এখন মনে হতে পারে যে এটা গাঁজাখুরি। এরকম কি কখনো সম্ভব নাকি যে সব সভ্যতাই শেষ হয়ে যাবে কিংবা প্রত্যেকটা সভ্যতাই ওই ৭টি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে গেছে? না, গাঁজাখুরি নয়। সত্যিকার অর্থেই এরকম হয়েছে। গ্লাব পাশা তার বইয়ে যে ৭টি পর্যায়ের কথা বলেছেন, সেগুলো সংক্ষেপে নিচে তুলে ধরা হলো।

১। অগ্রপথিকদের যুগ

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকটা পর্যায়ে যেকোন জাতির পরিবর্তন আসে। পরিবর্তন আসে তাদের জীবনযাত্রায়, আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায়, ব্যবসা বাণিজ্য ও তাদের সামরিক ব্যবস্থায়। যেকোন সভ্যতা কিংবা জাতির শুরু হয় জয় দিয়ে। এমনি এমনি তো কেউ কিছু দিয়ে দেয় না, রাজা-মহারাজার কিংবা যোদ্ধারা যুদ্ধের মাধ্যমে তাদের রাজ্যের সূচনা করেন।

২।বিজয়ের যুগ

বিজয়ের পর্যায়ে যোদ্ধারা যুদ্ধ করে নতুন নতুন রাজ্য বিস্তার করে। এর ফলে যেমন অনেক নতুন দেশ বা জাতি তৈরি হয় আবার তাদের শক্তিও বেড়ে যায়। বিজয়ের বছর কিংবা দ্বিতীয় পর্যায়ে ওই জাতির কিংবা সভ্যতার সীমানা বানানো হয়। যুদ্ধ, জয়লাভ, নতুন রাজ্য, নতুন সীমানা এ সবই প্রথম দুই পর্যায়ের করা হয়।

৩।বাণিজ্য যুগ

নতুন সভ্যতা তৈরি হল, নতুন জাতি হল এখন নজর দেওয়া হয় তার পরের পর্যায়ে। নতুন জাতি কিংবা সভ্যতা তৈরী হওয়ার পর রাজারা তাদের উন্নয়নে ও প্রজাদের উন্নয়নের দিকে নজর দেয়। ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। এসময় আর যুদ্ধ কিংবা রাজ্য বিস্তার নয় বরং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া হয়।

৪।সমৃদ্ধির যুগ

এই যুগে ফল পাওয়া যায় বাণিজ্য যুগের প্রচেষ্টাগুলোর। যুগে যুগে অজস্র জাতি কিংবা জাতিরাষ্ট্র জন্ম নিয়েছে। এদের সবগুলো কিন্তু প্রভাবশালী “সভ্যতা” হয়ে উঠতে পারেনি। বরঞ্চ যারা নিজেদের সীমানা পেরিয়েও দেশে-বিদেশে সামরিক প্রভাবের পাশাপাশি বাণিজ্যিক প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে, তারাই দেখা গেছে সে সময়কার ক্ষমতাশালী ছিল।

৫।বুদ্ধিবৃত্তিক সমৃদ্ধির যুগ

একটা সময় এসে সভ্যতাগুলো অনুভব করে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা না করলে তাদের এতদিনের কষ্টসাধ্য অর্জনের পুরোটাই পানিতে যাবে, সমৃদ্ধির গতিটাও থেমে যাবে। সভ্যতার এ পর্যায়ে সামরিক-বাণিজ্যিকভাবে স্থিতিশীল সভ্যতাগুলো জোর দেয় বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের দিকে। জাতির উন্নতির জন্য স্কুল কলেজ বানানো হয়। শিক্ষার উন্নতি সাধন ও প্রজাদের সুখ স্বাচ্ছন্দের দিকে লক্ষ্য রাখা হয়।

৬।অবনতির সূচনা

এখন পর্যন্ত সব ঠিক আছে। রাজ্য দখল হল, সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হল, উন্নতিও করা হল; কিন্তু তাই বলে সবসময় কি এরকমই থাকবে? কখনোই না, কারণ এর পরেই একটা পর্যায়ে শুরু হবে সভ্যতার অবনতি বা পতনের শুরু। যখন থেকে সম্পদ ও সমৃদ্ধির শুরু হবে তখন থেকেই পতন শুরু হবে। সম্পদশালী মানুষজন নিজেদেরকে বড় মনে করবে, তারপর থেকেই সম্পদশালী ও সাধারণ মানুষদের মাঝে ভেদাভেদ তৈরি হবে। মানুষে-মানুষে পার্থক্য দেখা দিবে। এছাড়াও নীতিবোধ কিংবা সাধারণ ধারণাও পাল্টে যেতে থাকবে। কিছু মানুষের হাতে তখন অনেক বেশি ক্ষমতা চলে আসবে। কিছু মুষ্টিগত মানুষের কাছে পুরো জাতি আটকা পড়ে যাবে আর সেখান থেকেই অবনতির শুরু।

৭।পতন

যেই একতা কিংবা শক্তি নিয়ে একটি জাতি তৈরি হয়েছিল আর নিজেদের উন্নয়ন সাধন করছিল, সেই জাতি কিংবা সভ্যতারই যখন কিছু মুষ্টিমেয় মানুষের কাছে সকল ক্ষমতা চলে যাবে এবং সম্পদের বন্টন সমান হবে না তখনই মানুষে মানুষে পার্থক্য হবে, ঝগড়া বিবাদ লাগবে। মানুষের নীতিবোধ কমে যাবে, নিজেদের মাঝে ঝামেলা দেখা দিবে। নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করবে আর তারপরেই একটি জাতি কিংবা সভ্যতা শেষ হয়ে যাবে। আর এই ধ্বংসপ্রাপ্ত সভ্যতার শূন্যস্থান পূরণ করতেই হয়তো যাত্রা শুরু করবে নতুন সভ্যতা।

পূর্বের অনেক জাতি কিংবা সভ্যতা এই অবস্থার মধ্যে দিয়েই গেছে কিন্তু কেউ টিকে থাকতে পারেনি। পারসিয়ান, ব্রিটেন, স্পেন, রোম কিংবা মিশর কোন সভ্যতাই পূর্বের জৌলুসে নেই। আর মায়ান, অ্যাজটেক, মুঘল, গ্রীক সভ্যতা তো ধ্বংসই হয়ে গিয়েছে। ইতিহাসে যেখানে লেখাই আছে যে কোন জাতি কিংবা সভ্যতা টিকে থাকতে পারেনি আমরা কি ইতিহাসের বাইরে? কখনোই না। বরং আমরাও এক সময় ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবো।

এ তো গেল পুরনো সভ্যতার কথা এখন আমাদের বর্তমানের দিকে দেখি। আমরা বর্তমানে আমাদের সভ্যতার ঠিক কোন পর্যায়ে রয়েছি? কিংবা তারচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঠিক কত ধাপ আগে রয়েছি আমরা? ইতিহাসলব্ধ প্যাটার্ন অনুসরণ করলে বলা যায় আমরা পঞ্চম পর্যায়ের শেষধাপে কিংবা ষষ্ঠ ধাপের সূচনালগ্নে রয়েছি। অর্থনৈতিক সূচক বিবেচনা করলে বলা যায় পঞ্চম পর্যায় আমরা হয়তো কয়েক দশক আগেই পার করে ষষ্ঠ পর্যায়ে আছি অনেক বছর ধরেই। কেননা মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে ক্ষমতা এবং সম্পদ চলে যাওয়া, ধনী-গরীবের বৈষম্য বৃদ্ধি, জ্ঞানার্জনের চাইতে সস্তা খ্যাতির পিছনে দৌঁড়ানো- “অবনতির সূচনা” পর্যায়ের প্রায় সবগুলো বৈশিষ্ট্যই আমাদের সময়ে যথেষ্ট পর্যায়ে বিদ্যমান।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবো, নাকি ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসত্ত্বাগুলোর মত বিলাসবসনে ব্যস্ত থেকে ধীরপায়ে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবো!

Most Popular

To Top