বাউন্ডুলে

আরামে বিছানাকান্দি-রাতারগুল ভ্রমণ, সাথে ভারতীয় বাজার!

আরামে বিছানাকান্দি-রাতারগুল ভ্রমণ, সাথে ভারতীয় বাজার! neonaloy

রাত সাড়ে দশটার ট্রেনে চেপে পরেছিলাম আমরা। গন্তব্য সিলেট, উদ্দেশ্য একদিনে বিছানাকান্দি-রাতারগুল ঘুরে আসা। টিপটপ প্রথম শ্রেণীর সিঙ্গেল কামরা। সারা দিনের পরিশ্রমের পর একটু আয়েশী মুডে ঘুমিয়ে নেয়ার লোভ এবং পরদিন প্রাণবন্ত থাকার আশায় একটু বাড়তি খরচে প্রথম শ্রেণীর বিলাসিতা ছিলো সেদিন। ঢাকা থেকে সিলেট আন্তঃনগর ট্রেনে প্রথম শ্রেণীতে এসি স্লিপারে ভাড়া জনপ্রতি প্রায় ১২’শ টাকা। তবে আপনি চাইলে সাধারণ চেয়ার কোচে তিন থেকে চার’শ টাকায়ও ভ্রমণ করতে পারেন। তবে যা-ই বলুন না কেনো, টিপটপ গোছানো প্রথম শ্রেণীর কামরায় চলন্ত গাড়ির দুলুনিতে ঘুমটা কিন্তু মন্দ হলো না।

সকাল পাঁচটায় ট্রেন পৌঁছে দিলো সিলেটে। সেখানে আগে থেকেই কথা বলে রাখা সিএনজি অটো রিক্সার ড্রাইভার সেলিম ভাই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাকে সারা দিনের জন্য ঠিক করে রাখা হয়েছে। দিন শেষে সেলিম ভাইকে দিতে হবে ১৫০০ টাকা। সকালের নাস্তাটা সেরে নিতে আমরা চলে গেলাম সিলেটের ইস্কনের রেষ্টুরেন্টে, মূলত সকালে গরম ভাত খাওয়ার একটা ইচ্ছা থেকে। টিলার উপর ইস্কনের মন্দিরের পাশে রেষ্টুরেন্টে কি আছে জানতে চাইলে ম্যানেজার সনাতন ধর্মালম্বী একজন বললেন, আছে- অন্ন, ডাল আর সবজি। অনেক দিন পর বইয়ের ভাষার অন্ন শব্দটার স্বাভাবিক প্রচলন শুনে কানে যেনো একটু বারি খেয়ে গেলো।

অন্ন, ডাল আর সবজি দিয়ে সকালের উদরপূর্তি করে আমরা ছুটলাম সিএনজিতে করে বিছানাকান্দির দিকে। যাওয়ার পথের রাস্তাটি বেশ ভাঙ্গাচোরা। মেরামতের কাজ চলছে প্রায় সব জায়গাতেই। কেউ চাইলে সিএনজিতে না গিয়ে হিউম্যান হলার বা টেম্পুতে করেও যেতে পারেন। তাতে জনপ্রতি খরচ পরবে ১০০ টাকা করে। তবে যেতে হবে ভেঙ্গে ভেঙ্গে।

ঘন্টা দুয়েকে আমরা পৌঁছে গেলাম ট্রলারঘাটে। সিএনজি চালক সেলিম ভাই আমাদের ট্রলার ঘাট দেখিয়ে নিয়ে গেলেন। সেখানে সারি সারি ট্রলার দাঁড়িয়ে আছে। একটার পর একটা সিরিয়ালি চলে। বলে রাখা ভালো, এ রুটে কোনও নিয়মিত প্যাসেঞ্জার ট্রলার নেই। আপনাকে হয় একটি ট্রলার নিজের পুরোটাই ভাড়া করতে হবে। নতুবা অন্য কোনও টিমের সাথে ভাগাভাগি করতে হবে। যদিও এতে সময় অপচয় এবং অন্য টিম না মেলার ঝক্কিটা থেকেই যায়। তাই বিছানাকান্দি যেতে চাইলে টিম ধরে যাওয়াই ভালো। কথাবার্তা বলে আমরা ঠিক করে ফেললাম ট্রলার চালক আমিন ভাইকে। তার সাথে চুক্তি ঘাট থেকে আমাদের নিয়ে যাবেন বিছানাকান্দি। সেখানে আমরা ঘন্টা খানেক কাটাবো। তারপর আবার পৌঁছে দিবেন এখানকার ঘাটে। চুক্তি সব মিলিয়ে ১৫০০ টাকা।

সিলেটের সীমান্ত ঘেঁষা গ্রাম, নদী পেরিয়ে সামনে হাতছানি দিতে থাকে বিছাকান্দির পাহাড়। মাথা উঁচু করে দেখতে হয় সামনে সারিসারি পাহাড় আর পাহাড়। দুই পাহাড়ের ফাঁক গলে বেরিয়ে এসেছে একটি নদী। ট্রলার আমাদের নামিয়ে দিলো বালু চরে। শ দুয়েক গজ হেঁটে এগিয়েই বোঝা গেলো পাহাড় ছিঁড়ে আসা নদীর স্রোতের গর্জন। পানির ধারার পাশেই সামিয়ানা টাঙ্গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা ছোট ছোট ভাসমান খাবারের হোটেল করেছেন। সেখানে খাবারের রয়েছে নানান রকম আয়োজন। ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে থাকে নানা পদের আয়োজন দিয়ে খাবারের প্যাকেজ। দুপুরের খাবারের ঝুঁকি না নিয়ে প্রথমেই খাবারের ঝামেলাটা চুকিয়ে নিলাম। এরপর ঝটপট তৈরি হয়ে ছুটে চলা পানিতে।

শত শত পর্যটক পাহাড়ি নদীর শীতল পানিতে নেমে পরেছেন। কেউ নিজেকে ভিজিয়ে নিচ্ছেন ঘন্টার পর ঘন্টা। কেউ দল বেঁধে হুলুস্থুল করছেন। এদিক সেদিক অসংখ্য যুগল পানির টানে থাকা ছোট ছোট পাথরে বসে গল্প জুড়ে দিয়েছেন। এরমধ্যে, আর এক পাগলাটে বিলাসিতা পেয়ে বসলো আমাদের। এই নদী স্রোতে গা ভেজাতে ভেজাতে এক কাপ চা খেলে কেমন হয়? যেমন ভাবনা তেমন কাজ। ট্রলার চালক আমিন ভাইকে বলতেই, বালু চরের সামিয়ানা টাঙ্গানো দোকান থেকে দু’কাপ চা এনে দিয়ে গেলেন। হাঁটু বরাবর শীতল পাহাড়ি নদী ভিজিয়ে যাচ্ছে আর হাতে এক কাপ চায়ে চুমুক! লক্ষ টাকা দামী সুখ যেনো ছুয়ে দিয়ে গেলো। স্থানীয় যুবকরা ক্যামেরা নিয়ে ঘুরঘুর করছিলো অনেকক্ষণ। একজনকে ডেকে পাহাড়, পানি আর নদী ঘিরে মোটামুটি একটা ফটোসেশনও হয়ে গেলো। প্রতি পিস ছবি তার ডিএসএলআর থেকে কপি নিতে গুনতে হবে বিশ টাকা করে। তারপরও নদী ভেজা শরীরে নিজেদের ছবি তোলা সম্ভব নয় বলে স্থানিয় যুবকদেরই সহযোগিতা নিতে হলো।

বিছানাকান্দি

পাহাড় থেকে নেমে আসা পাথুরে নদী

 

বিছানাকান্দির সৌন্দর্য লিখে প্রকাশ করার জন্য কোন মানের লেখক হতে হবে তা জানা নেই। তবে সোজা বাংলায় বলা যায়, সামনে পাহাড়, পাহাড়ি ছোট গ্রাম, পাহাড়ি রাস্তার ছবি আর সেসব থেকে নেমে আসা বালুচরে নদীর ধারা যে কারো কয়েকঘন্টা সময় নয়, দিন পার করে দিবে। তবে বুক জুড়ে এক কষ্ট থেকেই যাবে-সামনে যেসব পাহাড় , গ্রাম দেখতে পাবেন তা কোনটাই আপনার দেশের নয়। সবই পড়েছে ওপারে ভারতে। আফসোস নিয়েই ফিরতে হলো সেদিন। বারবার মন চাইলো একবার ওই পাহাড়টায় ঘুরে আসলে কেমন হয়?

ফেরার সময়ে আরেক কান্ড। আমিন ভাই বললেন, ইন্ডিয়ার বাজারে যাবেন কিনা? এখানে প্রতি চারদিন পরপর হাট বসে। চাইলেই বাঙ্গালীরাও যেতে পারে। আজ হাট বসবে। এ সুযোগ আর ছাড়ে কে! হাতে সময় কম। হন্যে হয়ে ছুটে যাওয়া ভারতের বাজারের দিকে। পথে আটকালো বিজিবি। ওপারে নারীদের যাওয়া মানা। নিরাপত্তার অভাব আছে। বিশেষ করে খাসিয়া ছেলেরা বাঙ্গালি নারীদের উত্তক্ত করে। বেশ বুঝিয়ে শুনিয়ে বিজিবিকে ম্যানেজ করতে হলো।

ছোট একটি জমজমাট খাসিয়া বাজার। শত শত বাঙ্গালি এপার থেকে ভিড় করেছে। পাহাড়ি ফল, ভারতীয় কাপড়, খাবার প্রসাধনীর পসরা নিয়ে বসেছেন খাসিয়ারা। সব কিছুই করতে হচ্ছে তাড়াহুড়োতে। বাজারের ছবি তোলা যদিও খুবই কড়াকড়ি নিষিদ্ধ , তারপরও চুরি করে কয়েকটি ছবি তুলে নিলাম আমরা। আমাদের ছবি তুলতে দেখে আমিন ভাই ছুটে এসে বললেন, ছবি তুলতে দেখলে খাসিয়ারা কিন্তু আপনার মোবাইল ফোন কেড়ে নিবে। এ বাজরে টাকা এবং রুপি দুটোই চলে। যাই হোক খাসিয়া বাজার থেকে একটি খাসিয়া পোশাক আর সামান্য ফল নিয়ে আবার ছুটে চলা ফেরার পথে।

একই রুট ধরে সিএনজিতে এসে সেলিম ভাইকে নিয়ে এবারের গন্তব্য রাতারগুল। রাতারগুলের ছবি আর বর্ণণা অনেকবার সামনে এসেছে। সুযোগ হচ্ছিলো না। ঘন্টা দেড়েক সিএনজিতে চড়ে আমরা পৌঁছে গেলাম রাতারগুলের প্রভাবশালী মানুষ আমির আলির বাড়িতে। আমির আলি তার ছেলেকে দিয়ে নৌকায় করে আমাদের পাঠালেন রাতারগুল বন ঘুরে আসতে। এখানে নৌকা ভাড়াটা বেশ চড়া। ঘন্টায় ১২০০ টাকা। কিন্তু এটা নাকি এখানকার রাতাগুল বন পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত। তাই ১২০০ টাকা গুনেই রাতারগুল বনে ঢুকে যাওয়া। প্রকৃতির নৈসর্গিক খেলা আর নিজেকে নিজের সাজিয়ে রাখার এক অনন্য নিদর্শন যেনো রাতারগুল। পুরো বনটিতেই এক একটি গাছের ডাল যেনো নিজেদের পেঁচিয়ে ধরে আছে। তার ফাঁক গলে বৈঠার ঝনাতঝনাত শব্দে এগিয়ে যাচ্ছে নৌকা। আছে আরও বেশ কিছু পর্যটকও। রাতারগুলের মাঝ বরাবর একটি ওয়াচ টাওয়ার করা হয়েছে। সেখান থেকে পুরো বনটি দেখা যায়। এতো উচ্চতা থেকে সবুজের এমন সমাহার বাংলাদেশে খুব কম জায়গাতেই দেখার সুযোগ আছে।

আরামে বিছানাকান্দি-রাতারগুল ভ্রমণ, সাথে ভারতীয় বাজার! neonaloy

ওয়াচ টাওয়ার থেকে দেখা রাতারগুল

 

ততক্ষণে সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। তাই ঝটপট আবার ফিরে আসা আমির আলির বাড়িতে। আমির আলিকে আগেই ফোনে জানিয়ে রাখা হয়েছিলো একেবারে গ্রামীণ কিছু তরিতরকারি রান্না করে রাখার, সাথে দেশি মুরগীর মাংস। নানা পদের ভর্তা-ভাজি আর মুরগির মাংসে আবারও এক প্রস্ত খাবার শেষে এবার দে ছুট সিলেট শহরের দিকে। সিলেটে পৌঁছাতে রাত সারে আটটা বেজেছে কেবল। ট্রেন ১০টায়। পেট পুরোপুরি ভরে থাকলেও আবারও রাতের খাবারের ঝামেলা মিটাতে স্থানীয় হোটেলে সামান্য খাবার সারার পর সেলিম ভাই নামিয়ে দিলেন সিলেট রেল স্টেশনে। তার ১৫০০ টাকা ভাড়া, সাথে সামান্য বকশিশ গুনে দিয়ে ফিরতি ট্রেনে চড়ে আবারও ভোর বেলায় কমলাপুর রেল স্টেশন।

মোটামুটি ছুটির দিনটি ধরে ৩৩ ঘন্টার ঝটিকা সফরে না দেখা বিছানাকান্দি আর রাতারগুলের আমেজ মনে নিয়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিনটি পার করে আবারও অনায়াসে কাজের ব্যস্ততায় ডুব দেয়া যায়। সব মিলিয়ে দুজন মানুষের বিছানাকান্দি আর রাতারগুল এক দিনের ঝটিকা সফরে সর্বোচ্চ ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা খরচ হবে।

Most Popular

To Top