ইতিহাস

‘টাইটানিক’ এর নায়ক যখন ‘ডানকার্ক’ এর উদ্ধারকর্মী

‘টাইটানিক’ এর নায়ক যখন ‘ডানকার্ক’ এর উদ্ধারকর্মী neonaloy

এক এবং অদ্বিতীয় নৌযান টাইটানিকের দুর্ঘটনা পৃথিবীর যে কোন দুর্ভাগ্যকে হার মানায়। যে জাহাজ স্বয়ং বিধাতাও গড়তে অক্ষম বলে ঘোষণা দিয়েছিল নির্মাতারা, সাউথ হ্যাম্পটন থেকে নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে প্রথম যাত্রা শেষ করার আগেই এক আইসবার্গের ধাক্কায় দুখণ্ড হয়ে বিলীন হয়ে যায় মধ্য আটলান্টিক মহাসাগরে। অপর্যাপ্ত লাইফবোট এবং অদক্ষ নাবিকদের কারণে সেদিন প্রাণহানি হয় প্রায় ১৫০০ যাত্রীর, যা ছিল মোট যাত্রীর তিন ভাগের এক ভাগ। সেদিন সর্বোচ্চ পদধারী যে নৌ অফিসার বেঁচেছিলেন, নাম তাঁর সেকেন্ড অফিসার চার্লস লাইটোলের। টাইটানিকই যার জীবনের একমাত্র অ্যাডভেঞ্চার ছিল না, বরং বলা যায় টাইটানিক ছিল তাঁর বৈচিত্র্যময় জীবনের একটি মাত্র মোড়।

টাইটানিক neonaloy

চার্লস লাইটোলের

লাইটোরের জন্ম ল্যাঙ্কসায়ারের ছোট্ট শহর চোর্লেতে ১৮৭৪ সালের ৩০ মার্চ। ১৮৮৮’র ফেব্রুয়ারিতে মাত্র ১৩ বছর বয়সেই নৌযানে কাজ শুরু করার মধ্য দিয়ে সমুদ্রে আনাগোনা শুরু হয়। নৌযান ‘হল্ট হিল’এ থাকাকালীন জীবনের প্রথম অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ পান। ১৮৮৯ সালে সেন্ট পাউল দ্বীপের নিকটে হল্ট হিল জলদস্যুদের আক্রমণের শিকার হয়। ফার্স্ট অফিসারকে খুন করা হয় এবং উদ্ধারের আগে সকল জিম্মি আট দিন বন্দী ছিলেন দস্যুদের হাঁতে। ১৯০৭ সালে অফিসার হিসেবে পদোন্নতি ঘটে লাইটোলেরের, এবং ‘আরএমএস ওশেনিক’ ও ‘এসএস ম্যাজিস্টিক এর ফার্স্ট অফিসার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১২ সালের শুরুতে লাইটোলের তাঁর পরবর্তী এ্যাসাইনমেন্ট পান- ‘আরএমএস টাইটানিক’।

যাত্রা শুরুর দুই সপ্তাহ আগে লাইটোলের টাইটানিকে হাজিরা দেন এবং ফার্স্ট অফিসার হিসাবে কার্যক্রম চালাতে থাকেন। কিন্তু যাত্রার দিন ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড স্মিথ হেনরি ওয়াইল্ডকে তাঁর ফার্স্ট অফিসার বানান এবং চার্লস লাইটোলের সেকেন্ড অফিসার হিসেবেই টাইটানিকের প্রথম যাত্রায় কর্তব্যরত থাকেন।

টাইটানিক neonaloy

টাইটানিকের সকল নৌ অফিসার, দাঁড়ানো বাম থেকে দ্বিতীয়জন চার্লস লাইটোলের

১৪ এপ্রিল, রাত ১১.৪০এ লাইটোলের ঘুমের মধ্যেই কম্পন টের পেলেন। পায়জামা পরিহিত অবস্থায় বের হয়ে শুনলেন টাইটানিক আইসবার্গে আটকা পড়েছে। দ্রুত ইউনিফর্ম পড়ে যাত্রী উদ্ধারের কাজে লেগে গেলেন। ‘শিশু এবং নারীরা সবার আগে’ এই নীতিতেই বিশ্বাসী ছিলেন লাইটোলের। একমাত্র পুরুষ যাকে লাইটোলের স্বেচ্ছায় বোটে উঠতে দিয়েছিলেন তাঁর নাম মেজর আর্থার, যিনি যাত্রীদের উদ্ধারের কাজে সহায়তা করছিলেন। তৃতীয় বোটটি পানিতে নামাতে যখন লাইটোল ছুরি দিয়ে দড়ি কাটছিলেন তখন জাহাজের এক অংশ এটিকে সাথে নিয়েই ডুবে যেতে শুরু করে। লাইটোলের দড়িতে পেঁচিয়ে জাহাজ এবং লাইফবোটের মাঝে পড়ে যান। আরএমএস কার্পাথিয়া উদ্ধারে আসা পর্যন্ত এ বোটের ৩জন যাত্রী মৃত্যুবরণ করেন।

টাইটানিকের যাত্রার পর লাইটোলের নৌ অফিসার হিসেবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ১৯১৬ সালে তিনি তাঁর টর্পেডো বোট ‘এইচএমটিবি ১১৭’ নিয়ে একটি জার্মান জেপেলিন আক্রমণ করেন। এ বীরত্বের জন্য তিনি লেফটেন্যান্ট কমান্ডারে পদোন্নতি পান। যুদ্ধজাহাজ ‘এইচএমএস গ্যারি’র দায়িত্বে থাকাকালীন  তিনি জার্মান সাবমেরিন ‘ইউবি-১১০’ ডুবিয়ে দেন ১৯১৮ সালে। এধরনের দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডের লাইটোলেরের পদোন্নতি হতে থাকে এবং পরিপূর্ণ কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ শেষ করেন।

এখানেই শেষ হয়নি লাইটোলেরের জীবনের অ্যাডভেঞ্চার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৬ মিটার লম্বা মোটরচালিত ইয়র্ট ‘সানডাউনার’ কিনে নেন এবং মাছ ধরে জীবন নির্বাহ শুরু করেন। কখনও কি ভেবেছিলেন তখন, ৬০র অধিক বয়সে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধে স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ উদ্ধারের কাজে শরিক হতে হবে?

টাইটানিক neonaloy

ডানকার্কের অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী যে সানডাউনার

হ্যাঁ, ৬৬ বছর বয়সে লাইটোলের তাঁর ইয়র্ট ‘সানডাউনার’ নিয়ে ‘অপারেশন ডায়নামো’ তে যোগ দেন, যে মিশনের লক্ষ্য ছিল ডানকার্ক সমুদ্রতীরের অদূরে আটকা পড়া ব্রিটিশ সৈন্যদের উদ্ধার করা। সেদিন তীরে আটকে ছিল ৪০০,০০০ ব্রিটিশ সৈন্য এবং জার্মান ট্যাঙ্ক ছিল মাত্র ১০ মাইল দূরে।

১৯৪০ সালের ৩০ মে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টোন চার্চিলের পরামর্শে অ্যাডমিরাল রামসি মাঝারি এবং বড় নৌকার নাবিকদের আহবান করেন ডানকার্কে আটকা পড়া সৈন্যদের উদ্ধারে সাহায্য করতে। সে আহবানে সাড়া দিতে সেদিন ডানকার্কের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে প্রায় ৮০০ ব্রিটিশ মোটরবাহী নৌকা। আকারে ছোট হওয়াতে ‘সানডাউনার’কে নিষেধ করা হলেও লাইটোলের গোপনেই উদ্ধারকাজে যোগ দেয়ার জন্য রওনা দেন তাঁর বড় পুত্র রজার এবং ১৮ বছর বয়সী স্কাউটবয় জেরাল্ড অ্যাশক্রোফ্টকে সাথে নিয়ে।

ডানকার্ক যাওয়ার পথেই লাইটোলের উদ্ধার করে সমুদ্রে পতিত হওয়া ‘ওয়েস্টারলি’ নামক যুদ্ধবিমানের ক্রুকে। যদিও সানডাউনারের ধারণক্ষমতা ছিল ২০ জন, সেদিন ১৩০ জনকে নিয়ে ফিরতি পথে রওনা দেন লাইটোলের। উল্লেখ্য, সৈন্যরা যখন জানতে পারে যে লাইটোলের টাইটানিকের একজন অফিসার ছিলেন, এক সৈন্য পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করে। তখন তাঁকে বুঝানো হয়, লাইটোলের যদি টাইটানিকের সময় বেঁচে আসতে পারে তাহলে যেকোনো পরিস্থিতিতেই বেঁচে থাকতে পারবে। যাত্রাপথে জার্মান যুদ্ধবিমানের আক্রমণেরও শিকার হয় সানডাউন, কিন্তু লাইটোলেরের দক্ষতার কারণে সে যাত্রায় বেঁচে যায়। সেবার ৩৩৮,০০০ সৈন্যকে নিরাপদে সরিয়ে আনা সম্ভব হয়, যাদের মধ্যে ছিল লাইটোলেরের দ্বিতীয় পুত্র ট্রেভরও। এই উদ্ধারকাজকে বলা হয় এ শতাব্দীর সেরা অলৌকিক ঘটনা।

কদিন আগেই বিশ্বখ্যাত পরিচালক ক্রিশ্চিয়ান নোলানের পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘ডানকার্ক’ নামক মুভিটি। মুভিতে সে উদ্ধারকাজে চার্লস লাইটোলেরের অবদান সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। চার্লস লাইটোলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিখ্যাত ব্রিটিশ অভিনেতা মার্ক রায়ল্যান্স।

চার্লস লাইটোলের চরিত্রে ‘ডানকার্ক’ মুভিতে অভিনয় করা মার্ক রায়ল্যান্স

বহু ইতিহাসের সাক্ষী এই চার্লস লাইটোলের ১৯৫২ সালে ৭৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

আরো পড়ুনঃ টাইটানিকের অজানা রহস্য। 

Most Popular

To Top