গল্প-সল্প

গল্প না কল্পনা

গল্প না কল্পনা neonaloy

আমাদের সামনের বাড়িতে একটা মেয়ে থাকে।
বিশ-বাইশ বছর বয়স হবে। বেশিও হতে পারে, কমও হতে পারে। আমি চেহারা দেখে মানুষের বয়স আন্দাজ করতে পারি না। মেয়েটা প্রায় প্রতিদিন বিকালে বারান্দায় এসে কিছুক্ষন দাঁড়ায়। আমি জানালা দিয়ে মেয়েটাকে দেখি। সুন্দর মিষ্টি চেহারা। শ্যামলা গায়ের রঙ। লম্বা চুল কোমর বেয়ে নেমে এসেছে। আমার মায়ের মত। আমার দেখতে ভালো লাগে। তবে সাবধানে দেখি। চোখাচোখি যেন না হয়। হলে মেয়েটা কী না কী ভাববে।

মেয়েটাকে হাসতে দেখিনি কখনো। হয়তো হাসে না, রামগরুরের ছানার মতো গম্ভীর থাকে সবসময়। হয়তো হাসে, আমি খেয়াল করিনি। বন্ধুদের সাথে কথা বলার সময় হয়তো খুব হাসে। হাসলে কেমন লাগে মেয়েটাকে? গালে টোল পড়ে? পড়া তো উচিৎ। পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর সব মেয়েটার প্রাপ্য।

মাঝে মাঝে মেয়েটাকে নিয়ে আগডুম বাগডুম ভাবি। আমাদের প্রেম হয়ে গেলে কেমন হয়? ভালো মানাবে? আমরা একসাথে হাত ধরাধরি করে হাঁটবো। রিকশায় চড়ে পুরো শহর ঘুরবো। ঝগড়া করবো। ও মুখ গম্ভীর করে বসে থাকবে। আমি মান ভাঙ্গানোর চেষ্টা করবো। কপট রাগ দেখানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ফিক করে হেসে ফেলবে সে। ওর হাসি কল্পনা করতে বেগ পেতে হয়, হাসতে তো দেখিনি কখনও।

বেশিক্ষণ রঙ্গিন কল্পনা করা যায় না। প্রেম করলে ডেট করতে হবে টিউশনির পয়সা বাঁচিয়ে। সম্ভব না। বাস্তবতার দেয়ালে কল্পনা ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে। যে বেকার ছেলে টিউশনি করে খরচ চালায়, তার জন্য প্রেম কষ্টকল্পনা।

স্বপ্নকন্যা স্বপ্নেই থাকে। তবু ভাবতে ভালো লাগে। ভাবনাগুলো নিষ্পাপ এবং তার চেয়ে বড় কথা ভাবতে পয়সা লাগে না। ভেবে যাও, যা খুশি ভেবে যাও, যত খুশি ভেবে যাও, একটা পয়সা দাবী করবে না কেউ। নিজের ভাবনায় রাজা উজির মারো যত খুশি, বারাক ওবামার সাথে ডাঙ্গুলি খেলো, বিল গেটসের মেয়ের সাথে প্রেম কর, প্যারিসে যাও হানিমুন করতে-
সুতরাং, ভাবনাই ভালো।

আজকে সারাদিন ঘরে বসে আছি। যে বাসায় পড়াতে যাবার কথা ছিল তারা আজকে যেতে মানা করল। এমনই হয়। যেদিন কোন ব্যস্ততা থাকবে না সেদিন ফোন করে বলবে আজ আসার প্রয়োজন নেই। যেদিন ইন্টার্ভিউয়ের জন্য খুব প্রস্তুতি নিচ্ছি সেদিন বলবে আজকে না গেলেই নয়। মেসে কেউ নেই আজ। থাকলে তাস পেটানো যেত। আজকাল অবশ্য দিনে-দুপুরে তাস খেলতে চায় না ওরা। আমার মত অফুরন্ত অবসর নেই কারো। অবসর বিক্রি করার ব্যবস্থা থাকলে বেশ হত।
খবরের কাগজ পড়তে পড়তে প্রায় মুখস্থ হয়ে গেল। নতুন কিছু নেই। একই খবর প্রতিদিন। শুধু চরিত্রগুলো আলাদা। চরিত্রগুলো আরো অনেকদিন সংবাদের যোগান দিয়ে যাবে পত্রিকাগুলোর জন্য। কেউ ছুরি খেয়ে, কেউ ছুরি মেরে। কেউ ঠকে, কেউ ঠকিয়ে।

ফোন বাজছে। মা। আজকাল বাসায় কথা বলতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় সব কেমন আছিস কি করছিসের আড়ালে একটাই প্রশ্ন- চাকরীটার কিছু হল? হয়তো আমার মনের ভুল, তবু মনে হওয়াটাকে এড়িয়ে যেতে পারিনা। ফোন ধরলাম না। কয়েকবার বেজে ফোন চুপ হয়ে গেল। আগে হত না। ধরার আগে পর্যন্ত মায়ের ফোন বাজতেই থাকতো। এখন বাজে না একবারের বেশি।
মাঝে মাঝে মন খারাপ হলে দূরে কোথাও পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। অনেক দূরে। আমি ভাবি। কোথায় যাওয়া যায়?
সমুদ্র আমার খুব প্রিয়। ছোটবেলায় থর হেয়ারডলের কাহিনী আমাকে টানতো খুব। একজন লোক সামান্য একটা ভেলায় চড়ে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিচ্ছে- ভাবতেই রোমাঞ্চ অনুভব করতাম। মনে করতাম বড় হয়ে আমিও একটা ভেলায় করে সমুদ্রে চলে যাবো। তবে আটলান্টিক না। বঙ্গোপসাগর। মা দূরে কোথাও একা যেতে মানা করত সবসময়, তাই সম্ভবত বঙ্গোপসাগরকেই বেশি নিরাপদ মনে করতাম। কি দিনগুলি ছিল ছোটবেলার !

বঙ্গোপসাগরেই যাবো। তবে ভেলায় নয়। ভেলার মধ্যে রোমাঞ্চ আছে, রোমান্টিসিজম নেই। এর চাইতে নৌকা ভালো। বড়সড় একটা পালতোলা নৌকা। অনেক দূর চলে যাবো ভাসতে ভাসতে। তুফান হয় তো হোক। বড় বড় ঢেউ আসে তো আসুক। ভাসিয়ে নিয়ে যাক আমাকে। তবু তো তাতে গ্লানি নেই, হতাশা নেই, অবহেলা নেই। বরং, এত বড় সমুদ্রকে আমি একাই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছি- এমন একটা বীর রসের গন্ধ আছে।

একা সমুদ্র পাড়ি দেব। একদম একা। কাউকে সাথে নেয়ার প্রয়োজন নেই। কারো দরকার নেই আমার। ওই মেয়েটাকেও না। সেখানে শুধু আমার একার পৃথিবী। আমার একান্ত ব্যক্তিগত পৃথিবী।
আচ্ছা, যদি খুব করে ধরে সমুদ্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য? যদি রাগ না ভাঙ্গে? খুব সমস্যায় পড়া যাবে তাহলে।
এমনি করে ভাবতে ভালো লাগে। ভাবনার অবাস্তব জগতে অনেক ভালোবাসা পাওয়া যায়, অনেক বৈষম্য দূর হয়ে যায়, অনেক অপ্রাপ্তি ঘুচে যায়। চাওয়া-পাওয়ার কঠিন সমীকরণগুলো কেমন সহজে মিলে যায় এখানে। বাস্তব জগতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, সেটা বাস্তব।

টের পেলাম, খিদে লেগেছে। মনে মনে কাব্য করলে আর যাই হোক, খিদে মেটে না। দুপুরে রান্না হয়নি মেসে। বুয়া আসেনি। প্রায়ই ফাঁকি দেয়। কিছু বললে মায়াকান্না জুড়ে দেবে। মানিব্যাগে হাত দিলাম। ভেতরে একটা পাঁচ টাকার নোট আর একটা ২ টাকার কয়েন। দুটো টিউশনির একটাও এখনও টাকা দেয়নি- দিচ্ছি দিব বলে মাসের অর্ধেক পার করে ফেলেছে। আজকে সকালের দুটো বেহিসাবী সিগারেটের ফল হচ্ছে আমার প্রায় খালি মানিব্যাগ। খিদেটা ভালোমতই পেয়ে বসেছিল, খালি মানিব্যাগ দেখে আরও বেড়ে গেল।

বাকি নেওয়া সম্ভব না। পরিচিত দোকান একটাই আছে, সেখানে গতমাসের বাকির টাকাটা এখনও দেওয়া হয়নি। এখন বাকি চাইতে গেলে চাচা শুকনো মুখে গত মাসের হিসেবটা জানিয়ে দেবেন। পাঁচ টাকার নোটটা নিয়ে নিচে নামলাম। কেক-টেক কিছু একটা খেয়ে খিদে সামাল দেই আপাতত।

দোকানে গিয়ে টাকাটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কেমন অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হচ্ছে কিনতে গেলেই চাচা বুঝে ফেলবে এই পাঁচ টাকাই আমার শেষ সম্বল। খিদে সহ্য করতে না পেরে শেষ সম্বল দিয়ে আমি কেক কিনতে এসেছি। নইলে পাঁচ টাকার কেক কেনার জন্য কেউ পাঁচতলা সিঁড়ি বেয়ে নামে? পাঁচতলা সিঁড়ি বেয়ে নেমেছি- এটা তার জানার কথা না। তবু অকারণে সংকোচ বোধ করতে লাগলাম।

এমন সময় ছোট একটা দুর্ঘটনা ঘটল। দোকানের সামনে বৃষ্টির পানি জমে ময়লা কাঁদা হয়ে ছিল, একটা গাড়ী তার উপর দিয়ে বেশ গতিতে টান দিল। কাঁদা আমার সাদা শার্ট ছাপিয়ে মুখ পর্যন্ত ভরিয়ে দিয়ে গেল। ধোয়ার পর আজকে প্রথম পড়লাম শার্টটা। শালার মার্ফি’স ল।

দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে একটা গালি দিতে যাব, এই সময়ে সামনের বাড়িটার বারান্দায় চোখ আটকে গেল। ভাগ্যিস, চোখ আটকে গেল।
মেয়েটা খিলখিল করে হাসছে, খুব সম্ভবত আমার অবস্থা দেখে। কি অপূর্ব লাগছে মেয়েটাকে ! না, টোল পড়ে না গালে । তবু কি সুন্দর ! রাস্তায় কাঁদায় মাখামাখি হতভম্ব কোন যুবককে দেখে হাসলে তাতে কোন অপরাধ দেখি না। তবু মেয়েটার চোখে চোখ পড়ে যাওয়ায় মেয়েটা বোধহয় লজ্জা পেয়ে হাসি থামানোর চেষ্টা করল এবং থামাতে না পেরে হাসতে হাসতেই ভেতরে চলে গেল।
নাহ, এই মেয়েকে নেয়া যায় সমুদ্রে। অনেক ঢেউ সামাল দেব দুজনে।

Most Popular

To Top