ইতিহাস

হিটলার যখন নোবেল বিজয়ী

হিটলার

মহাত্মা গান্ধী, এলিয়ানোর রুজভেল্ট এবং হিটলারের মধ্যে মিল কোথায়? মিল হল, এক বা একাধিক সময় তারা সবাই নোবেল প্রাইজের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন!

হ্যাঁ, বলছিলাম জার্মানির নাৎসি বাহিনির প্রধান এবং বিংশ শতাব্দীর সব থেকে কুখ্যাত একনায়ক এডলফ হিটলারের কথা, যার নির্দেশে ১৯৩৯ সালে জার্মানি কর্তৃক পোল্যান্ড আক্রমণ করা হলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। তার কারণেই প্রাণহানি ঘটে ৬০ মিলিয়নের অধিক মানুষের।
এবং এই মানুষটির নামই নোবেল শান্তি পুরষ্কারের মনোনয়নের জন্য সুপারিশ করা হয়। এবং হিটলারের নাম সুপারিশ করেন সুইডিশ পার্লামেন্টের একজন ডেমোক্রেটিক সদস্য, এরিক গডফ্রিড ক্রিশ্চিয়ান ব্রান্ড।

নোবেল প্রাইজের শুরুটা উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে। সুইডিশ ধনকুবের বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল তার বিপুল সম্পত্তি কিছু পুরস্কার দেয়ার কাজে ব্যবহার করতে চাইলেন। মানব ইতিহাসে যারা মানব জাতির জন্য চমকপ্রদ কিংবা উল্লেখযোগ্য কিছু করবে, তাদের জন্যই এ পুরষ্কার, এ কথাও তিনি তার উইলে লিখে রেখে যান। প্রাইজগুলো বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে দেয়া হয়, যেমনঃ সাহিত্য, মেডিসিন, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, শান্তি এবং অর্থনীতি। হিটলারকে নোবেল শান্তি পুরষ্কারের মনোনয়ন দেয়ার জন্য সুপারিশ করা হয় যেটি ১৯০১ সাল থেকে নিয়মিত দেয়া হয়ে থাকে।

শান্তি পুরষ্কারের জন্য আলফ্রেড নোবেলের নির্দেশনা ছিল- এই পুরষ্কার তাদেরই প্রাপ্য যারা ‘সর্বাধিক চেষ্টা চালিয়েছে কিংবা সর্বোচ্চ কাজ করেছে জাতি কিংবা গোত্রদ্বয়ের সংঘবদ্ধ করার জন্য, যুদ্ধরত সৈন্যকে প্রতিহত করার জন্য কিংবা শান্তির ধারাকে ত্বরান্বিত করার জন্য’।

মজার ব্যাপার হল, ১৯৩০ সালে হিটলার সকল জার্মানবাসির জন্য নোবেল প্রাইজ নিষিদ্ধ করে দেন। ব্যাপারটার শুরু হয় জার্মান শান্তিবাদী কার্ল ভন অজিয়েস্কিয়ের মাধ্যমে, যিনি ১৯৩৫ সালে নোবেল শান্তি প্রাইজের জন্য নির্বাচিত হন।
তিনি জার্মানির পুনঃযুদ্ধায়োজনের কথা ফাঁস করে দেয়ার জন্য এ সম্মাননা পান। জার্মানির পুনঃযুদ্ধায়োজন ছিল ‘ট্রিটি অব ভারসেলিস’ বিরোধী। ‘ট্রিটি অব ভারসেলিস’ হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি এবং মিত্রশক্তির মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি যাতে বলা আছে জার্মানি নতুন করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারবে না কিংবা সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করতে পারবে না। কিন্তু কার্ল ভন অজিয়েস্কি প্রকাশ করেন , ‘ট্রিটি অব ভারসেলিস’ চুক্তির কয়েকদিনের মধ্যেই জার্মানি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেয়া শুরু করে।

হিটলার

কার্ল ভন অজিয়েস্কিক

 

তিনি ১৯৩৫ সালে নোবেল শান্তির জন্য নির্বাচিত হলেও মূলত এ তথ্য প্রকাশ করেন ১৯৩১ সালে। এ তথ্য ফাঁস করার পর দেশদ্রোহী হিসেবে কার্ল ভন অজিয়েস্কিকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়। অজিয়েস্কিকে হয়তো দীর্ঘদিন কারাগারে থাকতে হতো এবং অবর্ণনীয় অত্যাচারের সম্মুখীন হতে হতো, কিন্তু দীর্ঘদিন যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে ১৯৩৮ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

অজিয়েস্কিকে মনোনয়ন দেয়া নিয়ে কমিটির মাঝে মতভেদের সৃষ্টি হয়। অনেকেই মনে করছিলেন, একজন দেশদ্রোহী আসামি নোবেল প্রাইজের জন্য উপযুক্ত নয়। শেষমেশ, নোবেল শান্তি প্রাইজের জন্য তাঁর নাম ঘোষণা করা হলে অনেকেই কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন।

এই ঘোষণায় জার্মানবাসীও ক্ষুব্ধ হয় এবং নোবেল কমিটি ব্যাপক ক্ষোভের মুখে পড়ে। তখন অ্যাডলফ হিটলার, সকল ধরনের নোবেল প্রাইজ জার্মানবাসীর জন্য নিষিদ্ধ করে দেন।

যদিও হিটলার সকল জার্মানবাসীর জন্য নোবেল প্রাইজ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, কিন্তু যদি তিনিই পেতেন নোবেল প্রাইজটা তাহলে কি হতো? তিনি কি নিজের জন্য এই হুকুম শিথিল করতেন? মূলত, এরিক গডফ্রিড ক্রিশ্চিয়ান ব্রান্ড মজা করেন হিটলারের নাম মনোনয়নের তালিকাতে দিয়েছিলেন। তিনি হিটলারের নাম সুপারিশ করে নোবেল কমিটিকে যে চিঠিটা দিয়েছিলেন তার বক্তব্য ছিল মূলত এইরকম-

“নরওয়েজান কমিটি,
আমি বিনীতভাবে নিবেদন করছি, মহান জার্মানের কোটি মানুষের চ্যান্সেলর এবং ফুয়েরার অ্যাডলফ হিটলারকে ১৯৩৯ সালের নোবেল শান্তি প্রাইজের জন্য নির্বাচিত করা হোক। আর যে কোন ব্যক্তির থেকে তিনি এ প্রাইজের জন্য বেশি উপযুক্ত”।

হিটলার

 

শুধুমাত্র আলফ্রেড নোবেলের দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী মনোনয়নের সুপারিশ করা হলেও সুপারিশের তালিকাটা অনেক বড়ই হয়ে যায়। এমনকি ২০১৮ সালের নোবেল শান্তি পুরষ্কারের জন্য ইতিমধ্যে মনোনয়ন পেয়েছে ১১৩টি সংগঠনসহ মোট ৩২৮ জন ব্যক্তিবর্গ। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, ১৯৩৯ সালে সুপারিশের তালিকা ছিল অনেক ছোট। বলা যায় না, দুর্ঘটনা ঘটেও যেতে পারতো! এ কারণেই হয়তো কিছু সময় পরেই তিনি হিটলারের মনোনয়নের জন্য তাঁর প্রস্তাব ফিরিয়ে নেন। সুইডিশ পত্রিকা ‘সেভেনাস্কা মরগনপোস্টেন’এ দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এটা ছিল মূলত সেবারের আরেক মনোনীত প্রার্থী, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নিভাইলে চেম্বারলিনের জন্য সমালোচনামূলক বক্তব্য।

কিন্তু সেবার হিটলার মনোনয়ন পান নি। এমনকি, কেউই সেবার নোবেল শান্তি প্রাইজ পান নি। কার্ল ভন অজিয়েস্কিকে নোবেল প্রদান এবং হিটলারের মনোনয়নের সুপারিশকে কেন্দ্র করে নোবেল শান্তি কমিটির ভিতরে দ্বিধাবিভক্তি শুরু হয় এবং এ কারণে, ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘদিন নোবেল শান্তি প্রাইজ ঘোষণা করা হয়নি।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, হিটলারকে নোবেল শান্তি পুরষ্কারের জন্য মনোনয়ন দেয়ার তিন মাসের মাথায় জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘোষণা দেয়।

Most Popular

To Top