নাগরিক কথা

হচ্ছেটা কি দেশে?

হচ্ছেটা কি দেশে? neonaloy

‘হ্যালো, এটা কি ০১৭১……..?’ ‘রং নাম্বার’ বলেই ঘ্যাচ করে লাইন কেটে দিলেন বারেক সাহেব। সকাল থেকেই মেজাজটা খিটখিট করছে। নম্বর বিভ্রাটে পেয়েছে তাকে। আগে ছিল বিশ্বে প্রথম, আর এখন নাকি দক্ষিণ এশিয়াতেও দ্বিতীয়। বিশ্বে কত নম্বর কে জানে? দুর্নীতিতে উন্নতি হয়েছে বাংলাদেশের। হতেই পারে। ভাল কথা। তাই বলে টিআইবিকেও এসব কথা বলতে হবে? সব কথা সবসময় না বললে সমস্যাটা কোথায়? এসব সুশীলদের ভাব-চক্কর ভাল বোঝেন না বারেক সাহেব। এরা কখনো ইধার তো কখনো উধার, বঙ্গপোসাগরের জোয়ার-ভাটার মত। হচ্ছেটা কি দেশে?

ব্যক্তিগত ভাবে সততায়ও প্রধানমন্ত্রী এখন পৃথিবীতে নাকি তিন নম্বরে। আগে এসব আওয়ামী প্রচারণা বলে চালানো যেত, কিন্তু এসব বলছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আর গবেষণা সংস্থাগুলো। হার্ভাডের কেনেডি স্কুলে নাকি শেখ হাসিনা পাঠ্য- তিন তিনটি পিএইচডি হচ্ছে তার উপর। এসব দেখেন, পড়েন আর পিত্তি জ্বলে যায় বারেক সাহেবের। নয়া পল্টনে বসে নয়া-নয়া শব্দ আর কঠিন-কঠিন বাক্য চয়নে চলে যে ‘ব্রিফিং সাহিত্য’ চর্চা তা বারেক সাহেবের ধারণা সাধারণ মানুষের কানের পর্দায় ধাক্কা খেয়ে গলা বেয়ে গড়িয়ে পরে। কানের ভিতরে ঢোকে সামান্যই।

‘স্যার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে এসেছি’। ড্রাইভারের ডাকে তন্দ্রা ছুটে যায় বারেক সাহেবের। ‘এই ব্যাটা, বঙ্গবন্ধু কিরে? খাস-পরিস আমার, আর গান গাস বঙ্গবন্ধুর’? খেকিয়ে ওঠেন বারেক সাহেব। বিএসএমএমইউ-তে বারেক সাহেব এসেছেন এলাকার এক অসুস্থ নেতাকে দেখতে। এদেশের চিকিৎসা-টিকিৎসার উপর বারেক সাহেবের কোন কালেই কোন আস্থা ছিল না। হাসপাতাল তো দূরে থাক, শেষ কবে এদেশে কোন ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকেছেন মনেও করতে পারেন না। সর্দি জ্বরেও ছোটেন ব্যাংকক-সিঙ্গাপুরে।

নেতা ভদ্রলোক বিএসএমএমইউ-তে ভর্তি হয়েছে শুনে অবাক হয়েছেন বারেক সাহেব। ‘বলে কি ব্যাটা? হঠাৎ বঙ্গবন্ধুতে চিকিৎসা নেয়ার কি হল?’ মামুন সাহেব তার থানার দলীয় সভাপতি। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে আছেন। রাজনৈতিক পরিবারেরই সন্তান। বাবা ছিলেন ডাকসাইটে মুসলিম লীগার। একাত্তরে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানও ছিলেন। ছেলেও বাবার রাজনীতির ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। ক্ষমতায় থাকতে এলাকা দাবড়ে বেড়িয়েছেন মামুন সাহেব। এলাকায় ‘কাবিখা’, ‘চড়ে খা’, ‘করে খা’ এ সবই নিয়ন্ত্রিত হতো তার চোখের ইশারায়। কামিয়েছেনও বেশ। মামুন সাহেবের এই সহসা ‘স্বদেশ প্রীতিতে’ তাই চিন্তিত বারেক সাহেব।

বিএসএমএমইউ ক্যাম্পাসে ঢুকতেই আরেকবার ধাক্কা খেলেন বারেক সাহেব। আবারো নম্বর বিভ্রাট! স্ট্যান্ড ব্যানারগুলো দেখে বোঝা যায় সদ্য সমাবর্তন হয়েছে এই ক্যাম্পাসে। ব্যানারে বিরক্তিকরভাবে জ্বল-জ্বল করছে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর তালিকায়ও নাকি এখন বিএসএমএমইউ, আর মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এর অবস্থান নাকি দ্বিতীয়তে। অবাক হন বারেক সাহেব। ‘সত্যিই কি তাই?’

কেবিন ব্লকে ধীর পায়ে ঢোকেন বারেক সাহেব। সেক্রেটারী দৌড়াদৌড়ি করে লিফ্ট আটকায় স্যারের জন্য। একটু অবাক হন বারেক সাহেব। কেউ যেন পাত্তাই দিতে চাচ্ছে না। তাকে চিনছে না এতে অবাক হন না তিনি। না চিনতেই পারে। তাই বলে সেক্রেটারীর দৌড়াদৌড়ি না হোক অন্তত কালো স্যুট পরা গানম্যান দুজনকে তো একটু সমীহ করবে। বিএসএমএমইউ-এর ডাক্তার আর রোগীরা ইদানিং ভিআইপি দেখতে দেখতে ভিআইপি জিনিসটার প্রতি কেমন যেন নির্লিপ্ত ভাব হয়ে গেছে। প্রতিদিনই কোন না কোন ভিআইপি এই হাসপাতালে আসেন আর চিকিৎসা নিয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে ফেরত যান। বারেক সাহেব এসব জানেন না। তিনি জানেন বামরুমগ্রাদ আর মাউন্ট এলিজাবেথের খবর।

লিফ্ট থেকে নেমে কেবিনে ঢুকতেই আবারো অবাক হবার পালা। ছিমছাম সাজানো গোছানো পরিচ্ছন্ন কেবিন। বাহুল্য নাই ঠিকই, ময়লাও নাই এতটুকুও। পাশেই নার্সিং ষ্টেশন। ফাইল ঘাটতে ব্যস্ত একদল অল্প বয়সী নার্স। সেক্রেটারী ডাক দিতেই ছুটে এলো একজন হাস্যজ্বোল সিস্টার। বারেক সাহেবের হিসাবটা ঠিক মিলছে না। ‘হচ্ছেটা কি এসব দেশে’? ‘স্যার আপনি আমাকে চিনতে পারেননি। ছোটবেলায় দেখেছেন, বাসায়ও এসেছেন। আমার বড় ভাই আপনার এলাকার আপনার দলের ছাত্র সংগঠনের নেতা’। এবার আর প্রশ্ন না করে পারলেন না বারেক সাহেব। জিজ্ঞেস করলেন, ‘মা, তোমার চাকরিটা হলো কিভাবে? কত দিতে হলো?’ উত্তর শুনে চক্ষু চড়কগাছ বারেক সাহেবের। ‘স্যার আমাকে কোন টাকাই দিতে হয়নি। সবাই আমাকে এপ্লাই করতেই মানা করেছিল। ঢাকা মেডিকেল নার্সিং ইন্সটিটিউট থেকে নার্সিং ডিপ্লোমা করে বসে ছিলাম। ভাবলাম এপ্লাই করেই দেখি। শেষমেশ পরীক্ষা দিয়ে চাকরিটাও পেয়ে গেলাম। আল্লাহ শেখ হাসিনার মঙ্গল করুক’। বলতে বলতে মেয়েটার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পরে।

বিএসএমএমইউ-তে আসার পথে অনলাইন পত্রিকায় প্রেস কাউন্সিলে একটি জাতীয় দৈনিকের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মামলা জেতার খবর। বিএসএমএমইউ-তে নার্স নিয়োগে দুর্নীতির বিষয়ে খবর ছেপেছিল পত্রিকাটি। এর বিরুদ্ধেই প্রেস কাউন্সিলে রায় পেয়েছে বিএসএমএমইউ। পত্রিকাটিকে ভৎর্সনা করে রায়টি ছাপানোর নির্দেশ দিয়েছে কাউন্সিল। বিষয়টি যে সঠিক ছিল বুঝতে পারেন বারেক সাহেব।

‘খবর কি? কেমন আছেন মামুন সাহেব?’ কেবিনে ঢুকে অসুস্থ নেতার কাছে জানতে চান বারেক সাহেব। ‘আপনি না ইন্ডিয়ায় চিকিৎসা করাতেন? হঠাৎ করে বঙ্গবন্ধু প্রেমী হয়ে গেলেন কেন। মামুন সাহেব লিভার সিরোসিসের রোগী। তাই তার বঙ্গবন্ধুতে চিকিৎসা নেয়ার সিদ্ধান্তে বড় বেশী অবাক হয়েছেন বারেক সাহেব।

‘হায়দ্রাবাদেইতো গিয়েছিলাম। ওরা বললো দেশের চিকিৎসা ঠিকই আছে। স্টেমসেল থেরাপির কথা বলেছিল। নিতেও চেয়েছিলাম, ওরা বললো বিএসএমএমইউ-র লিভার ডিপার্টমেন্টেই লিভার সিরোসিসের রোগীদের স্টেমসেল থেরাপি করা হয়। ওরাই আমাকে এখানে পাঠিয়ে দিল’।

এরপর আলোচনা আর খুব বেশি এগোয় না। মৃদুপায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে আসেন বারেক সাহেব। কাক তো কখনো কাকের মাংস খায় না। নিজ দলের নেতা-কর্মী কেন গাইবে সরকারি গান। এতদিন এ ধরনের যা কিছু সবই সরকারি প্রোপাগান্ডা আর আওয়ামী মিথ্যাচার বলে উড়িয়ে দিয়েছেন আর নিজেকে প্রবোধ দিয়েছেন বারেক সাহেব। আজকে বিএসএমএমইউ-তে এসে সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেলো। ড্রাইভারকে ফোন করে জানতে চান গাড়ি কোথায় পার্ক করেছে। উত্তর শুনে মেজাজটা খিচড়ে যায় আবারো। ‘বলে কি হারামজাদা? টিএসসির সামনে গাড়ি পার্ক করেছে মানে কি? এখন কি এতটা পথ হেটে যেতে হবে?’ পরে অবশ্য ভুল ভাঙ্গে তার। ঢাকা ভার্সিটির টিএসসি না, বিএসএমএমইউ টিএসসির সামনে রাখা আছে তার গাড়িটি।

‘আর কত সহ্য করা যায়?’ ভাবেন বারেক সাহেব। ‘চিকিৎসা আর গবেষণা এ পর্যন্ত না হয় তাও হজম করা যাচ্ছিল, তাই বলে এখন টিএসসিও হজম করতে হবে? বিশ্ববিদ্যালয় কি শেষ-মেষ বিশ্ববিদ্যালয়ই হয়ে যাবে?’ সকালে শিক্ষকরা পড়াবেন। শিষ্যরা শিখবে শিক্ষাগুরুর কাছে। আর দুপুরে এই টিএসসিই পরিণত হবে মিলনমেলায়।

বঙ্গবন্ধু থেকে বেড়িয়ে ধানমন্ডিতে রওনা হন বারেক সাহেব। একটা বিজনেস মিটিং-এ দেরী হয়ে যাচ্ছে। রুপসী বাংলা সিগন্যালে ইউটার্ন নিতে গিয়ে তরতরিয়ে বেড়ে ওঠা ইউনিভার্সিটি কনভেনশন সেন্টার নজরে পরে বারেক সাহেবের। গাড়ি এলিফ্যান্ট রোডে ঢুকতে চোখে পড়ল আরো দুটো আধুনিক জমজ ভবন। ‘এগুলোও কি বিএসএমএমইউ নাকি?’ ড্রাইভারের কাছে জানতে চান বারেক সাহেব। এ ভবন দুটি বিএসএমএমইউ- এর আউটডোর। বাংলাদেশের একমাত্র এস্কালেটর লাগানো হাসপাতাল বিল্ডিং, হার মানাবে যে কোন আধুনিক শপিং সেন্টারকেও। এসব রাস্তায় তার নিত্য যাতায়ত, অথচ বিএসএমএমইউ-র ভৌত অবকাঠামো বেড়ে ওঠা কেন যেন তার কোনদিনও চোখে পড়েনি।

পাঁচ বছর পরপর বাঙ্গালী ক্ষমতার গনেশ উল্টে দিবে এটাই ইদানিং নিয়ম হয়ে গিয়েছিল। সেই নিয়ম উল্টে দিয়ে আওয়ামী লীগের দশ পুরা হচ্ছে আর এই বাড়তি পাঁচ বছর সময় পেয়ে এরা যা শুরু করেছ এটা বেড়ে পনের-বিশ হলে ভাবতেই আতকে ওঠেন বারেক সাহেব। সংখ্যাগুলো কেমন যেন জট পাকিয়ে যায় বারেক সাহেবের। ‘আচ্ছা, নয়াপল্টনের বিফ্রিং সাহিত্য বিশারদদের মগজে কি এ সংখ্যাগুলো একটুও সুরসুরি দেয় না?’

আর কথা বাড়ান না বারেক সাহেব। সদ্য কেনা আই ফোন এক্সে ফেসবুক ব্রাউজিং-এ মন দেন বারেক সাহেব। একটা অনলাইন পোর্টালে খবরটা নজরে আসে তার। দ্রুততম সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ায় বিশ্বের রাষ্ট্র নায়কদের মধ্যে এক নম্বর হয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ছোট্ট করে একটা ‘লাইক’ দেন বারেক সাহেব।

লেখক পরিচিতিঃ ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)
সহযোগী অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

Most Popular

To Top