ফ্লাডলাইট

ঘুরে দাঁড়ানোর শুরু হোক এই ম্যাচ থেকেই!

বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা রেকর্ড জয় নিয়ন আলোয় neon aloy

প্রথম ম্যাচ শেষে একটা রিভিউ লিখেছিলাম যার শেষে বলেছিলাম কোন “মিরাকল” না ঘটলে বাংলাদেশ ম্যাচ জিতবে না।

আজ বাংলাদেশ যেভাবে ২১৫ চেজ করে জিতেছে এটাকে মিরাকলের চেয়ে কম মনেহয় না আমার!

একটা জয় ভীষণ দরকার ছিলো। আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্য। আর সেই জয় যদি হয় “অবিশ্বাস্য”, রেকর্ডগড়া তাহলে আর কি লাগে বলেন!

২১৫ রানের টার্গেট। যেটা দরকার ছিলো পাওয়ার প্লে’র সর্বোচ্চ ব্যবহার করা। গতকাল একটা পোস্টে লিখেছিলাম বাংলাদেশ কেন লিটনকে ওপেনার হিসেবে ব্যবহার করেনা? প্রস্তুতি ম্যাচে ১৮ বলে ৪০ আর প্রথম ম্যাচে দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৩৫ করার পরেও কেন জানি মানুষের লিটনকে পছন্দ হয়না! একজন বলেই বসলো তিনটা লাইফ পেয়ে মাত্র ৩৫! অন্যজন বললো যেই প্লেয়ার লেগ সাইড ছাড়া খেলতেই পারেনা তাকে এতো পছন্দ করার কি আছে? আমি হয়তো খেলাটা তাদের মতো ভালো বুঝিনা তবে অবুঝ মনেই লিটনকে সবসময় একটা ক্লাস মনে হতো। মনে মনে ভাবতাম লিটন একদিন এমন একটা ইনিংস খেলবে যেটা বড় কিছুর জন্ম দিবে।

লিটনকে ওপেন করানোর সিদ্ধান্ত কার সেটা জানিনা, কোচ বা অধিনায়ক যারই হোক সেটা ছিলো একটা “মাস্টার স্ট্রোক”। শ্রীলংকার গেমপ্ল্যানে নিশ্চিত এটা ছিলোনা যে বাংলাদেশ সৌম্যকে বাদ দিয়ে ওপেন করাবে! আমরাই তো কল্পনা করিনি। এতো বড় রান তাড়া করলে আপনাকে প্রথমত ভালো খেলতে হবে, আবার একই সাথে সাইকোলজিক্যাল চাল চালতে হবে। শ্রীলংকার গেমপ্ল্যান কিছুটা হলেও পাল্টাতে হয়েছে লেফট-রাইট কম্বিনেশন থাকার কারনে। কথার কথা বলেছিলাম, সোজা পথে কাজ না হলে বাঁকা পথে যেতে হবে।

বাংলাদেশ প্রথমবার একসাথে ওপেন করতে নামা তামিম-লিটন জুটিতে পেয়ে গেলো উড়ন্ত সূচনা। পাওয়ার প্লেতে ৭৪ রান! লিটন দাসের ১৯ বলে ৪৩ রানের টর্নেডো বয়ে গেলো প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামের উপর দিয়ে। সংখ্যা দিয়ে আসলে বোঝানো যাবেনা এই ইনিংসের প্রভাব। ২১৫ রান তাড়া করা সম্ভব এই বিশ্বাসটা কিভাবে আসলো? লিটনের এই ইনিংসের কারনেই। লিটন দাস প্লাটফর্ম তৈরী করে দিলেন, সাথে বার্তা দিয়ে গিয়েছেন এই রান তাড়া করা যায়, অসম্ভব না! আচ্ছা লিটনের ফ্লিকগুলা দেখেছেন? এতো নিঁখুত টাইমিং করে জাস্ট ফ্লিক করে এভাবে ছয় মারতে কয়জন ব্যাটসম্যান পারেন আমাদের! এফোর্টলেস সিক্স যাকে বলে! ক্ল্যাসিক ব্যাটসম্যানদের শট এমনই হয়! ডাউন দ্যা উইকেটে যেয়ে মারা ছয়টা তাদের জন্য, যারা বলেন লিটন লেগ সাইড ছাড়া খেলতে পারেনা।

অন্যপাশে ছিলেন খান সাহেব। টি-টুয়েন্টি ব্যাটিংটা যেন বশে আসছিলো না। শেষ কবে ৩০ রানের উপরে করেছিলেন সেটাও মনে নেই অনেকের। আমারই নাই! পাওয়ার প্লে’র ভেতর ডট বল দিচ্ছিলেন, লেগ সাইডে আউট হচ্ছিলেন। তামিম ভাবলেন যথেষ্ঠ হয়েছে, টি-টুয়েন্টি মেজাজে ফিরলেন ২৯ বলে ৪৭ রান করে। হয়তো ফিফটি নাগালে ছিলো বলেই সিঙ্গেল নিতে চাচ্ছিলেন। পেরেরার বলটা বুক সমান উচ্চতায় লেগ সাইডে টুকে দিতে যেয়েই ভুলটা করলেন!

তামিম-লিটন দুইজনই ফিফটি মিস না করলে সবচেয়ে ভালো লাগতো। কিন্তু কথায় আছে জেতা ম্যাচে সবই নাকি জয়ের অনুঘটক। তামিম-লিটন ফিফটি করলে মুশফিকের অতিমানবীয় ইনিংস কোথায় পেতাম!

৯.২ ওভারে ১০০, প্ল্যাটফর্ম প্রস্তুত। কিন্তু সেটা কাজে তো লাগাতে হবে! গত মাসে শ্রীলংকার সাথে টি-টুয়েন্টি সিরিজের প্রথম ম্যাচের পর লিখেছিলাম আমি বেশ কয়েকটা ম্যাচে দেখেছি ওপেনিং জুটিতে কেউ একজন ভালো ব্যাট করে প্ল্যাটফর্ম বানিয়ে দিলে মুশফিক সেটার উপর দাঁড়িয়ে দারুণ দারুণ সব ইনিংস খেলেন। ওই ম্যাচে মুশফিকের ফিফটি ছিলো সৌম্য সরকারের দূর্দান্ত ফিফটি’র পরেই। আজ তামিম-লিটন ভিত বানিয়ে দিয়েছিলো, শেষ করার দায়িত্ব নিলেন মুশফিক।

৩৫ বলে ৭২, শুধু মাত্র দুটি সংখ্যা। এটা দিয়ে মুশফিকের মাস্টার পিসটা ব্যাখ্যা করা যাবেনা। ব্যাট করেছিলেন শুরুতে সৌম্য সরকারের সাথে, সৌম্য আজ আবার টাচে ছিলেন না। প্রথম দিকে বেশ কিছু ডট দিয়েছিলেন। সেই সময়ে রানের চাকা সচল রেখেছেন মুশফিক। বাউন্ডারি মেরেছেন, আবার সিঙ্গেল নিয়েছেন। সৌম্য অবশ্য দুইটা জিনিস ভালো করেছেন, সিঙ্গেল নিয়েছেন পরে, মুশফিকের সাথে ৫১ রানের জুটি গড়েছেন। আর পরে চার-ছয় মেরে স্ট্রাইক রেট ১০০+ রেখেছেন। যেহেতু ছয়জন ব্যাটসম্যান ছিলো জেনুইন, ওই সময় উইকেট হারালে বিপদ হয়ে যেত। তাই দয়া করে সৌম্য নামের ছেলেটাকে “ধুয়ে” দিয়েন না।

সৌম্যের পর মুশফিকের সঙ্গী হলেন অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। ১১ বলে ২০ রানের “ক্যামিও” খেলার পথে জুটি হলো ৪২ রানের। ১৬-তম ওভারে পেরেরা দিলেন ১৮ রান, মাহমুদুল্লাহ নিলেন ১৬ রান। কিন্তু পরের ওভারে অধিনায়ক যখন আউট হলেন ২২ রান দূরে বাংলাদেশ আর মনের অজান্তে সেই বিখ্যাত টি-টুয়েন্টি ম্যাচ হারার স্মৃতি, যেখানে তীরে এসে তরী ডুবিয়েছিলেন মুশফিক আর মাহমুদুল্লাহ।

তারপর সাব্বিরের অসম্ভব এক রান নেয়ার অপচেষ্টা, পেরেরার সরাসরি থ্রোতে রান আউট।

১০ বলে ১৭ রান দরকার, একটা মাত্র বল মিরাজের পায়ে লেগে লেগ বাই। ১৬ রানই নিলেন মুশফিক। বলা যায় একাই ম্যাচ ফিনিশ করেছেন। ভয়াবহ বাজে টি-টুয়েন্টি রেকর্ডকে কাঁচকলা দেখিয়ে ক্যারিয়ার সেরা ৭২* করে ম্যাচ জিতিয়েই মাঠ ছেড়েছেন তিনি। পুরা ইনিংসে মুশফিকের ডট বল মাত্র ৪ টি।

ম্যাচটা হয়তো আরেকটু কঠিন হতে পারতো, কিন্তু প্রদীপের ইয়র্কারের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে ফুলটস! আর মুশফিকের ৯৪ মিটারের ছক্কা। তখনই ম্যাচ বাংলাদেশের।

তবু খানিক ভয়, ৪ বলে ৩ রান লাগে। মনে পড়ে গিয়েছিলো টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের সেই ম্যাচ। আতহার আলি খান মনে করিয়ে দিলেন আবারো।

মুশফিকের নিজের মনেও হয়তো পাথর হয়ে চেপে বসেছিলো এতোদিন সেই ম্যাচ। হয়তো সেই স্মৃতি মুঁছে ফেলতে এমন একটা দিনই দরকার ছিলো। তাই মুশফিক এবার আর বিগ শটে ম্যাচ শেষ করতে যাননি! মুশফিক ভুল থেকে শিখেছেন! মিড উইকেটে ফ্লিক করেই বাঁধভাঙা উল্লাস মুশফিকের! কত ক্ষোভ, হতাশা চাপা ছিলো মুশি’র ভেতর?

বেঙ্গালুরুর ২০১৬ সালের সেই ভূত মুশফিক তাড়ালেন অবশেষে! আর বাংলাদেশ করলো ইতিহাস! টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটে চতুর্থ সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের ইতিহাস।

সাকিবকে ছাড়াই জিততে পারে বাংলাদেশ, কথাটা অনেকদিন বলেছি। শর্ত হচ্ছে, বাকি যারা আছে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে হবে। এই বিশ্বাসটা দরকার ছিলো বাংলাদেশ দলের জন্য। খুব দরকার ছিলো। আজ তামিম-মুশফিক-রিয়াদ তিন অভিজ্ঞ প্লেয়ার সামনে থেকে পথ দেখিয়েছেন দলকে। অলরাউন্ডার মাহমুদুল্লাহকে দেখতে পেয়েছি অনেকদিন পর। সবচেয়ে বড় কথা দলটা এখন আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে। যেটা খুবই দরকার ছিলো।

দূর্দান্ত বাংলাদেশ!
অভিনন্দন টিম টাইগার্স!
এখান থেকেই শুরু হোক নতুন যাত্রা!

Most Popular

To Top