টুকিটাকি

মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকে মানুষ!

মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকে মানুষ!

‘কোনোদিন জাগিবে না আর

জাগিবার গাঢ় বেদনার

অবিরাম— অবিরাম ভার

সহিবে না আর—’

 

মৃত্যু খুবই ভয়াবহ একটা ব্যাপার, একটা মানুষ কিছুক্ষণ আগে ছিল এখন নেই, এই ব্যাপারটাই কেমন ভয়ঙ্কর অদ্ভুত। মৃত্যুর সাথে সাথে এক জীবন স্মৃতির সমাপ্তি। তবে, আধুনিক বিজ্ঞান আবার এতদিনের প্রচলিত এই ধারণায় একটু বাধ সাধছে। বলছে, শেষ ঠিক, তবে মৃত্যুর একেবারে সাথে সাথে নয়, অন্তত সবটুকু নয়। খোলাসা করি। আজকে আমাদের আলোচনা এই মৃত্যুর সাথেই সম্পর্কিত।

শুরুতে আমাদের জানা প্রয়োজন ডাক্তারী ভাষায় মৃত্যু অর্থাৎ “ক্লিনিকাল ডেথ” কাকে বলে। ক্লিনিকাল ডেথ হল সোজা কথায় হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়া। হৃদস্পন্দন বন্ধের সময়কেই চিকিৎসকরা মৃত্যুর সময় হিসেবে বিবেচনা করেন।

মানুষকে একটি ইউনিট হিসেবে না ধরে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অনুযায়ী আলাদা আলাদা ইউনিট হিসেবে ধরি, তবে বলা যায় সকল ইউনিটের মৃত্যু কিন্তু একসাথে হয় না! মস্তিষ্কের মৃত্যু হয় সবচেয়ে পরে, ক্লিনিকাল ডেথের প্রায় দশমিনিট পরে- অর্থাৎ মানুষ মারা যাবার পরও প্রায় দশ মিনিট বেঁচে থাকতে পারে তার মস্তিষ্ক! তবে বলে রাখি- এটা যে সবার ক্ষেত্রেই ঘটবে তা নয়, বরং বেশিরভাগ সময়ই হৃদস্পন্দন বন্ধ হবার সাথে সাথেই মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে যায়। আমরা আলাপ করব বাকি “কমভাগ” নিয়ে।

একটি পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, মৃত্যুর কয়েক মূহুর্ত আগে মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক প্রবাহ সৃষ্টি হয়- কেন হয় তার সঠিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি। হার্টবিট বন্ধ হয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তার সাথে বন্ধ হয় অক্সিজেন সরবরাহ। কিন্তু মস্তিষ্কের সেরিব্রাল করটেক্স তখনও বেঁচে থাকে, কারণ অক্সিজেনের সাহায্য ছাড়াও তারা কিছুক্ষণ টিকে থাকতে পারে।

ক্লিনিকাল ডেথের পর যখন মস্তিষ্কে অক্সিজেনের সরবরাহ কমতে থাকে, এর কোষ গুলি একে একে মারা যেতে থাকে এবং মানুষ তার ব্রেইন স্টেম রিফ্লেক্স হারাতে থাকে। ব্রেইন শ্তেম রিফ্লেক্সের ব্যাপারটা বলি। চোখের মণি আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করে না, শারীরিক আঘাতের প্রতি সাড়া দেয় না। যদি মৃত্যুর ৫-৬ মিনিটের মধ্যে সিপিআর এর মাধ্যমে হৃদস্পন্দন চালু করার ব্যবস্থা করা যায়, তবে আবার  মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল শুরু হয় এবং অক্সিজেনের সরবরাহ ঘটে। ফলে মস্তিষ্কের সচল হবার সম্ভাবনা থাকে। তা না করা হলে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু।

সম্প্রতি, ড. স্যাম পার্নিয়া, নিউইয়র্কের  Critical Care and Resuscitation Research এর পরিচালক, বলেন- এমনও সম্ভাবনা রয়েছে মানুষ তার নিজের মৃত্যুর ঘোষণা নিজের কানেই শুনতে পায়! কার্ডিয়াক এরেস্টের ফলে টেকনিকালি মৃত কিন্তু সৌভাগ্যজনক ভাবে বেঁচে উঠেছেন এমন কয়েকজনের উপর গবেষণা চালিয়ে তিনি একথা বলেন।

গবেষণায় পাওয়া যায়, ক্লিনিকাল ডেথ ঘোষণার পরও তাদের সচেতনতা ছিল, তারা তাদের আশেপাশে কি বলা হচ্ছে তা শুনতেও পাচ্ছিল। পরে সেখানে উপস্থিত ডাক্তার এবং নার্সদের দ্বারা এর সত্যতা যাচাই করে নিশ্চিত করা হয়।

মৃত্যুর খুব নিকট থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের কেউ কেউ Near Death Experience এর কথা বলেন। তাদের ভাষ্যমতে, তারা এমন কিছু অভিজ্ঞতা লাভ করেছে যার স্বাভাবিক কোন ব্যাখা নেই। এমন একটি কাহিনী বলি।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের রবিন মিশেল হাসপাতালে চরম সঙ্কটময় অবস্থায় ছিলেন। তার নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্সের কথা তার জবানে অনেকটা এরকম- “আমি একটি উজ্জ্বল আলো দেখতে পেলাম। মনে হল যে সূর্যের দিকে তাকিয়ে আছি। আমার সুরঙ্গের ভেতর দিয়ে পড়ে যাওয়া বা এজাতীয় কিছুর কথা মনে নেই, শুধু মনে হচ্ছিল যে আলোর ভেতর দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছি। আলোটা ছিল খুবই প্রশান্তিদায়ক। আমি মানুষের আকারে কিছু একটা দেখতে পেলাম যা ছিল আলো দিয়ে তৈরী। তার কাঠামোর সবই মানুষের মতই, শুধু তার চেহারা বলতে কিছু ছিল না। সে আমার দিকে এগিয়ে এল। তারপর বলল, তুমি ফিরে যাও। তোমার এখনও এখানে আসার সময় হয়নি।”

পরে জানা যায়, তার এই অভিজ্ঞতা হয় ডাক্তার তাকে ক্লিনিকালি ডেড বলে ঘোষণা করার পর। এরপর আশচর্যজনকভাবে তিনি বেঁচে উঠেন (অবশ্যই অলৌকিক ভাবে নয়, ক্লিনিকালি ডেড ঘোষণা করার পর বেঁচে উঠার বেশ কয়েকটি নজির রয়েছে)। মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথেই যে মস্তিষ্কের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় না, এটা তারই উদাহরণ। হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মসিষ্কের কোষগুলো অতি সক্রিয় হয়ে উঠার জন্যই এমন ঘটতে পারে বলে নিউরো-সায়েন্টিস্টদের ধারণা।

এর ফলে তৈরী হল এক নতুন নৈতিক সংকট, কখন একজন মানুষকে মৃত ঘোষণা করা উচিৎ? মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকার পরও মানুষকে মৃত বলা যায় কিনা?

কথিত আছে মৃত্যুর ঠিক আগে না।কি মানুষ জীবনের সমস্ত স্মৃতি সিনেমার মত চোখের সামনে দেখতে পায়। এরও একটা হাইপোথেটিকাল ব্যাখ্যা আছে, যদিও তা এক্সপেরিমেন্টালি প্রমাণ করা হয়তো কোন দিনই সম্ভব নয় হয়তো। মানুষের ক্লিনিকাল ডেথের পর বেঁচে থাকা মেমরী সেলগুলো শেষবারের মত অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং স্মৃতিগুলো রি-শাফল করে। তখনই মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের মস্তিষ্ক স্মৃতিগুলো কল্পনা করে নেয়।

নাই হয়ে যাওয়ার আগে জীবনের অম্ল-মধুর স্মৃতিগুলো ফিরে দেখার ব্যাপারটা খুব একটা খারাপ না হয়তো!

Most Popular

To Top