নাগরিক কথা

মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাওয়া হলো না ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী’র

মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাওয়া হলো না ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণীর- neonaloy

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী , একাত্তরে নির্যাতিতা নারীদের সাহসী প্রতীক হিসেবে তাদের পুনর্বাসনে সবসময় ছিলেন অগ্রগামী লড়াকু নারী। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ছিলেন সামনের সারিতে। মিষ্টভাষী প্রিয়ভাষিণী, একজন নারী মুক্তিযোদ্ধা ও ভাস্কর। ফেলে দেয়া হয় এমন জিনিস কিংবা গাছের মরা ডাল তার হাতের ছোঁয়ায় পেয়েছে শৈল্পিক প্রাণ। বীরাঙ্গনা নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের মানুষের হৃদয়ে সবসময় ছিলেন শ্রদ্ধার আসনে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে তাকে মুক্তিযোদ্ধা খেতাব দেয় সরকার। কিন্তু মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোন ভাতা পাননি প্রিয়ভাষিণী।

গত বছরের নভেম্বরে বাসার বাথরুমে পড়ে গিয়ে পায়ের গোড়ালির হাড় স্থানচ্যুত হয় তার। এরপর তাকে চিকিৎসা দেয়া হয় রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগেও প্রিয়ভাষিণী নানা রকম শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হার্টের সমস্যা ও কিডনি জটিলতা ছিলো এর মধ্যে অন্যতম। এমন শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও প্রিয়ভাষিণীকে ঘুরতে হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের এক টেবিল থেকে অন্য টেবিল। ভাতার জন্য নিজের নাম তালিকাভুক্ত করতে একবছর সংশ্লিষ্ট বিভাগ গুলোতে তাকে পড়তে হয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়।

তিনি যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের বিছানায় ছিলেন, তখন তার নানামুখী শারীরিক জটিলতায় চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় প্রিয়ভাষিণীকে ল্যাবএইড থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়। এরপর, মুক্তিযোদ্ধাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা কার্যক্রমের আওতায় বিএসএমএমইউ প্রিয়ভাষিণীর অস্ত্রোপচারের দায়িত্ব নেয়। কিন্তু, তার নানা রোগের পরীক্ষা নিরীক্ষার খরচও ছিলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা তার পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব ছিলো না। ব্যক্তি পর্যায়ে কয়েকজন সরকার দলীয় রাজনীতিক আর্থিক সহায়তা করলেও প্রিয়ভাষিণী পাননি মুক্তযোদ্ধা ভাতা। তিনি যখন হাসপাতালের বিছানায় তখনও তার সন্তানেরা ভাতা সংশ্লিষ্ট কাজ নিয়ে অনেক দৌড়ঝাঁপ করেছেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই সম্মানী পাওয়া হলো না খ্যাতনামা এই মুক্তিযোদ্ধার।

প্রিয়ভাষিণীর ছেলে কারু তিতাস বলেন, “আসলে এটা শুধুমাত্র টাকা পয়সার ব্যাপার ছিলো না। আমার মায়ের জন্য এই ভাতার সম্মানী ছিলো মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া”। তিনি বলেন, “গত এক বছর মাকে অসুস্থ অবস্থায় তিনতলা, পাঁচতলার সিঁড়ি ভাংতে হয়েছে, একটার পর একটা দরখাস্ত করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আমি মাকে বলেছি, মা বাদ দাও। তারপরও মা চেষ্টা করে গেছে”।

কারু তিতাস আরোও বলেন, “সমস্ত মুক্তিযোদ্ধার পক্ষ থেকে বলছি, গ্রামে সাধারণভাবে বসবাস করেন কিন্তু স্বীকৃতি পাননি সে মুক্তিযোদ্ধার পক্ষ হয়ে আমরা এ কথাগুলো বলছি, এটা শুধু ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর একার কথা না। এখন রাষ্ট্র যদি এ সম্মান না দেয় তো আমাদের আর কি করার আছে। আমাদের কোন অভিযোগ নেই, কিন্তু এ ভাতার টাকাও আমরা আর চাই না। শুনেছি বংশধররাও ভাতার টাকা পেয়ে যাবেন, কিন্তু মাকে নিয়ে যখন হাসপাতালে আমরা আর্থিক সংকটে পড়েছিলাম তখন চেষ্টা করেও ভাতার টাকা পাইনি তাই এখন আর কি হবে এসব বলে”।

নিয়ন আলোয়-এর কাছে এই কথাগুলো বলার সময়, মোবাইলের অপরপ্রান্ত থেকে দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়।

বিষয়টা এমন সূক্ষ একটা অনুভূতির, কেননা সারা জীবন তিনি বীরাঙ্গনা, নির্যাতিতা নারী হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছেন, কিন্তু দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়াটা ছিলো প্রিয়ভাষিণীর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মৌখিক স্বীকৃতি তিনি পেয়েছেন কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্য সবার সাথে এক কাতারে দাঁড়িয়ে সম্মানী ভাতা পাওয়া হলো না এই বীর নারীর।
১৯৪৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি খুলনায় জন্ম এ ভাস্করের। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১০ সালে স্বাধীনতা পদক পান তিনি।

৬ মার্চ না ফেরার দেশে চলে গেছেন মুক্তিযোদ্ধা-ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। বেলা পৌনে একটার দিকে ল্যাব এইড হাসপাতালে মারা যান তিনি।

বাংলাদেশের ভাস্কর্য চর্চার অগ্রপথিক ছিলেন ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী।

মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর প্রিয়ভাষিণীর বয়স হয়েছিলো একাত্তর বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি উচ্চরক্তচাপ, উচ্চমাত্রায় ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা, পায়ের গোড়ালি স্থানচ্যুত হওয়া এবং ফুসফুসের সংক্রমণসহ নানা রোগে ভুগছিলেন।

গত বছরের নভেম্বরে নিজ বাসায় পড়ে গিয়ে মাথায় ও গোড়ালিতে চোট পান প্রিয়ভাষিণী। এরপর তাকে তিনদফায় ল্যাব এইড হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। এরপর সেখান থেকে নেয়া হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে পায়ের অস্ত্রোপচার হয় তার। এসময় দুবার আইসিইউতে রাখা হয় প্রিয়ভাষিণীকে। নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরে চিকিৎসা চলার সময় চারবার কার্ডিয়াক এট্যাক হয় তার।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top