বিশেষ

আপনার সন্তানকে নিজ হাতে নষ্ট করবেন না, প্লিজ…

সেদিন ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাশে ভাবলাম ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে গ্রামারের বিভিন্ন টপিক নিয়ে একটা কুইজের আয়োজন করি। ব্যাপারটা ওদের বলতেই ওরা মহা খুশি। কারণ প্রথমত এ ধরণের কুইজ হলে ওদের ক্লাশে কিছু লিখতে হয়না, কাজেই লেখালেখি সংক্রান্ত পরিশ্রম থেকে ওদের অব্যহতি এবং দ্বিতীয়ত কুইজে যেহেতু স্কোরিং এবং হারজিৎ ব্যাপারটা আছে কাজেই ব্যাপারটা ওরা বেশ এঞ্জয় করে। কিন্তু কুইজের গ্রুপ কিভাবে হবে? সাথে সাথে ওদের উত্তর, “কেন বয়েজ ভার্সেস গার্লস?” বিরক্ত আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন? গ্রুপ করলে কেন শুধু বয়েজ ভার্সেস গার্লস করতে হবে? অন্য ভাবেও তো গ্রুপ তৈরি করা যায়। তখন সাথে সাথেই উভয় পক্ষই যুক্তি-তর্ক শুরু করে দিল কেন তারা শ্রেষ্ঠ এবং অন্যরা তাদের সমপর্যায়ের নয়। অন্য যেকোন ধরণের গ্রুপের চেয়ে এভাবে গ্রুপ করলেই তারা যে ব্যাপারটা বেশি এঞ্জয় করে তা ওদের কথায় বেশ বুঝতে পারলাম। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করছিলাম উভয় পক্ষই অপর পক্ষের প্রতি যে পরিমাণ বিষেদ্গার করে যাচ্ছিল তা শুধু আর মজার পর্যায়ে পড়ে না। এটা যে শুধু কুইজের প্রসঙ্গ এলেই দেখা যায় তা নয়, বরং স্কুলের বিভিন্ন এ্যাক্টিভিটিজেই ছেলে এবং মেয়ে গ্রুপের মধ্যে এই মনোভাবটি বেশ লক্ষ্যনীয়। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি তাদের এই মনোভাবটি তৈরি হয় ক্লাশ টু -থ্রি থেকেই।

প্রাথমিক ভাবে হয়তো আমাদের মনে হতেই পারে এ আর এমন কি, পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ব্যাপারটা আসলেই কি তাই? যে ছেলে সন্তানটি ছোটবেলা থেকেই তার বিপরীতলিঙ্গের সহপাঠিটির প্রতি এই মনোভাব নিয়ে বড় হচ্ছে যে মেয়েরা আহ্লাদি, দুর্বল, লুজার। ওরা কিছুই পারেনা শুধু কান্নাকাটি করে, তারা বড় হলেও যে এই ধারণা থেকে খুব একটা সরে আসতে পারে তা কিন্তু নয়। ছোটবেলায় গড়ে ওঠা এমন ধারণাই কিন্তু বড় হলে তার সহপাঠিনীর বা কোন নারীর মেধা কিংবা অর্জনের প্রতি অবজ্ঞার সুচনা ঘটায়।

এখন দেখা যাক এর সুত্রপাত কোথায়। ছেলে এবং মেয়েদের মাঝে এই লিঙ্গভিত্তিক বিভেদের প্রথম সুচনা ঘটে রঙ নির্বাচনে। কন্যা শিশুটির জন্য পিংক আর ছেলে শিশুটির জন্য ব্লু নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা নিজেদের অজান্তেই জেন্ডার ডিস্ক্রিমিনেশনের প্রথম ধাপটা সম্পন্ন করি। আর তাই প্লে গ্রুপের একটি তিন বছরের ছেলে শিশুকেও যদি পিংক কালারের কোন উপহার দেয়া হয় তারা কিন্তু তা সবেগে প্রত্যাখান করে থাকে। এর কারণ, পিংক মানেই গার্ল, পিংক মানেই ছেলে নয়। আর সেই সাথে কালারের সঙ্গে সঙ্গে মেয়ে শিশুটিও যে তাদের সমগোত্রীয় কিছু নয় এই ধারণাটিরও গোড়াপত্তন ঘটে।

এছাড়া খেলনার ব্যাপারটি তো আছেই। মেয়ে শিশু মানেই পুতুল, হাড়িপাতিল, সফট টয় আর ছেলে সন্তানের জন্য বরাদ্দ গাড়ি, পিস্তল আর রকেট বিমান। অনেক সময় মেয়ে সন্তানদের জন্য গাড়ি, বিমান দেয়া হলেও খুব কম সংখ্যক পুত্র সন্তানদের পিতামাতাকে দেখা যায় তাদের সন্তানদের হাড়ি পাতিল খেলনা কিনে দিতে। কাজেই, রান্না বান্না, হাড়ি পাতিল সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ যে শুধু মেয়েদের জন্যেই বরাদ্দ ছেলে শিশুদের মাঝে এ ধারণা বদ্ধমুল করতে এই আচরনই যথেষ্ঠ।

এ তো গেল ছোট্ট শিশুদের কথা। এবার আসি বয়ঃসন্ধির জটিল সময়ের ধাঁধায়। কো-এডুকেশনে একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে একই সাথে বয়সের এই রহস্যময় ধাপটির দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছায় আর সেই সাথে শুরু হয় বিপরীত লিঙ্গের প্রতি অদম্য কৌতুহল। এই কৌতুহলের নিদর্শন দেখা যায় একে অপরের প্রতি বিভিন্ন চিরকুট, ম্যাসেজ অথবা মন্তব্যে। এই ম্যাসেজ, চিরকুট আর মন্তব্যের ভাষা যে স্বভাবতই তাদের বিপরীত লিঙ্গের সহপাঠিটির শারীরবৃত্তীয় বিভিন্ন পরিবর্তন সংক্রান্ত তা বলাই বাহুল্য। এর সাথে সাথে আর একটি জিনিসেরও সুত্রপাত ঘটে আর তা হল ইভটিজিং। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষনের ব্যাপারটিও এর সাথে সাথেই ঘটে। কিন্তু আকর্ষন আর সম্মান কিন্তু এক নয়। এভাবেই ধীরে ধীরে তারা যতই বড় হতে থাকে তাদের মাঝে নারীদের প্রতি এক ধরণের পরিপুর্ণ ধারণা তৈরি হয়। তাদের মাঝে কেউ কেউ নারীদের প্রতি সম্মানবোধ নিয়েই বড় হয় আবার কেউ কেউ ছোটবেলায় তৈরি হওয়া সেই স্টেরিওটাইপ থেকে বের হয়ে আসতে পারেনা।

এটা যে শুধু ছেলে সন্তানদের ক্ষেত্রেই হয় তা কিন্তু নয়, কিছু কিছু মেয়ে শিক্ষার্থীদেরও দেখা যায় ছেলে সহপাঠিদের প্রতি একটা নেগেটিভ ধারণা নিয়ে বড় হতে। ছোটবেলা থেকেই তাদের মাথায় এই ধারণাটিই বদ্ধমুল থাকে যে ছেলে মানেই প্রতিপক্ষ, হায়েনা সদৃশ্য কোন প্রাণি। হয়তো পরিবার বা পারিপার্শ্বকতা থেকেই এই ধারনা তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ফলাফলে বিভিন্ন গ্রুপ ওয়ার্ক বা প্রোজেক্ট ওয়ার্কে তারা এক কোণে নিজেদের গুটিয়ে রাখে। ছেলে সহপাঠিটির প্রতি তারা কখনোই সহজ হতে পারেনা, বন্ধুত্বপুর্ণ সম্পর্ক তো দুরে থাক। তাদের এ ধরণের মনোভাব এখন বড় কোন সমস্যা তৈরি না করলেও অদূর ভবিষ্যতে সুস্থ্য দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবেনা- তা কে বলতে পারে?

এই যে ছেলেটি কিংবা মেয়েটি বিপরীত লিঙ্গের প্রতি বিরুপ কিংবা এলিয়েন সুচক ধারণা নিয়ে বড় হচ্ছে- দিন শেষে এর পরিণাম হচ্ছে লিঙ্গ বৈষম্য, নারী নির্যাতন, এবং আরো কিছু অসুস্থ সম্পর্ক।

এখন কথা হল এই যে ধীরে ধীরে একটি শিশুর তার বিপরীত লিঙ্গের প্রতি ধারনা তৈরি হয় তা সম্মানসূচক, সহনশীল এবং বন্ধুত্বপুর্ণ ধারনায় পরিণত করতে আমরা কিভাবে সাহায্য করতে পারি? একজন মনোবিদ হয়তো এর যথার্থ উত্তর দিতে পারবেন, আমি শুধু আমার দশ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান থেকে যা শেয়ার করতে পারি তা হল-

আপনার সন্তানটিকে সব ধরণের খেলনাতেই অভ্যস্ত করে তুলুন। হাড়ি পাতিল যে শুধু মেয়েদের জিনিস, বন্দুক, পিস্তল, গাড়ি যে শুধু ছেলেদের জন্য মানানসই এমন কোন বৈষম্যমুলক চিন্তা তাদের মাঝে তৈরি হতে দিবেন না।

যেহেতু এই সমাজে নারীদের অবস্থানটি যথেষ্ঠই নাজুক এবং নারীদের প্রতি সংঘটিত ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স, ধর্ষন, ইভটিজিং এর ক্ষেত্রে বিপরীত লিঙ্গের মুখ্য ভুমিকা থাকে তাই কন্যা শিশুর অভিভাবকদের চেয়ে একজন পুত্র সন্তানের অভিভাবকদের সচেতন হওয়া বেশি জরুরী। আপনার পুত্র সন্তানটির মাঝে নারীদের প্রতি সম্মানবোধ জাগানো কিন্তু আপনারই কর্তব্য। বয়ঃসন্ধির সেই কৌতুহলের সময়টিতে আপনার পুত্র সন্তানটিকে কাছে টেনে নিন। তার কৌতূহলের মাত্রা যেন শোভনীয়তার সীমা অতিক্রম না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। তার মা, তার বোনও যে একজন নারী এবং তার সহপাঠিনীও যে তাদের মতই একজন, অন্য গ্রহের কোন প্রাণি নয় এই বোধটি তার মাঝে জাগ্রত করুন।

আপনি একজন পুত্র সন্তানের অভিভাবক। আপনি মনে করেন পোশাকই ধর্ষনের একমাত্র কারণ, আপনি গলা ফুলিয়ে এই মতবাদ প্রচার করতে চান। ভাল কথা। কিন্তু আপনি কি চিন্তা করেছেন আপনার এই মতবাদ আপনার পুত্র সন্তানকে ধর্ষণে উৎসাহী করে তুলতে পারে? কাজেই সন্তানকে অপরের পোশাক নয় বরং নিজের সংযমের প্রতি মনোযোগী করে তুলুন।

পুরুষ মানেই শোষক শ্রেণী, অত্যাচারি, প্রতিপক্ষ এমন ধারণা কখনোই আপনার কন্যা সন্তানের মাঝে তৈরি হতে দিবেন না। যদি কোন তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে তার এমন ধারণা জন্মায় তবে তাকে সেই ট্রমা থেকে বের করে নিয়ে আসুন। এই পৃথিবীতে যেমন খারাপ মানুষ আছে, ভাল মানুষও আছে বিস্তর- এটি তাকে বোঝান। পুরুষ জাতির প্রতি নেগেটিভ ধারনা নিয়ে আপনার কন্যা সন্তানটি যেন বড় না হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখুন।

সবশেষ কথা আপনার সন্তান কে একটি সুস্থ পরিবেশে গড়ে তুলুন। বাবা এবং মাকে একে অপরের প্রতি অশ্রদ্ধাপুর্ণ আচরণ করতে দেখলে আর যা-ই হোক আপনার সন্তান কোন দিনই বিপরীত লিঙ্গের প্রতি সহনশীল কিংবা শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠতে পারবে না। কাজেই নারী পুরুষ পরস্পর সহনশীল, শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্বপুর্ণ সম্পর্ক ভিত্তিক একটি লিঙ্গ বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়তে হলে তার গোড়পত্তনটি কিন্তু আপনার ঘর থেকেই হতে হবে। আসুন নিজ নিজ সন্তানের মাঝে বিপরীতলিঙ্গের প্রতি সম্মান বোধের সঠিক শিক্ষা দিয়ে আমরা এই প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করতে এগিয়ে আসি।

Most Popular

To Top