টুকিটাকি

বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ

বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ

পিএইচডি করার জন্য একজন ছাত্রের সবচেয়ে বেশি যেটি দরকার তা হলো একটি ভালো ফেলোশিপ। দেশে বা বিদেশে পিএইচডির জন্য বাংলাদেশ সরকারের বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ এবং জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ নামক দুইটি ফেলোশিপের কথা আমি শুনেছি। অন্য আরও অনেক ফেলোশিপ হয়তো আছে- কিন্তু এই দুইটির মধ্যে সবেচেয়ে বেশি টাকার ফেলোশিপ যেটি (বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ) তা নিয়েই এখানে দুই চারটি কথা বলি।

বিদেশে পিএইচডি করার জন্য সম্ভবত প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ জনকে বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ দেওয়া হয় (১৬ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ৪০ টি ফেলোশীপ !)। বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপে মাসিক বেতন দেওয়া হয় ৯৬০০০ হাজার টাকা। এই ফেলোশিপ নিয়ে যদি কেউ অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, বা ইউএসএ’র কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যেতে চায় তাহলে সে বিপদে পড়বে। ৯৬০০০ টাকা, মানে প্রায় দেড় হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার। এই দিয়ে একজন ছাত্র অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, বা ইউএসএতে একা গেলে হয়ত কোন রকম চলতে পারবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে বাংলাদেশ থেকে যারা যায় তাদের বেশির ভাগই ফ্যামেলি সহ যায়। দেড় হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার দিয়ে একজন ছাত্রের পক্ষে ফ্যামেলি সহ চলা অসম্ভব একটি ব্যাপার। এজন্য বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ নিয়ে অনেকেই বিদেশে যেতে চায় না (আমি অন্তত ৪ জনকে চিনি যারা বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ পেয়েও গ্রহণ করেনি)|

আর বঙ্গবন্ধু ফেলোশীপে যারা বাংলাদেশে পিএইচডি করতে চায় তারা মাসিক বেতন হিসাবে পায় ২৫০০০ টাকা। এই টাকা দিয়ে একজন ছাত্র কোন রকম হয়তো চলে যেতে পারবে, কিন্তু ৪ বছর পরে সে যে মানের একটি পিএইচডি ডিগ্রী পাবে তা দিয়ে কিভাবে বিদেশ থেকে পিএইচডি করাদের সাথে প্রতিযোগিতা করবে? সেজন্যই মেধাবী ছেলেমেয়েরা দেশের এইসব ফেলোশিপের আশে পাশে দিয়েও যেতে চায় না।

অথচ সরকার ইচ্ছে করলেই এই ফেলোশিপ গুলোকে কার্যকর ফেলোশিপে রুপান্তরিত করতে পারে।
এখানে একটি উদাহরণ দেই, গতকাল পত্রিকায় দেখলাম ভারতের নরেদ্র মোদী সরকার সেখানের স্টুডেন্টদের বিদেশমুখীতা কমাতে যারা ভারতের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করবে তাদেরকে মাসিক ৮০০০০ রুপি বেতন দিবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ৮০০০০ রুপিকে অস্ট্রেলিয়ান ডলারে কনভার্ট করলে প্রায় ১৬০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলারের উপরে বেতন হয়। আমরা অস্ট্রেলিইয়াতে একজন ছাত্রকে পিএইচডির সময় প্রায় ২২০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার স্কলারশীপ দিয়ে থাকি। ভারত এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যাহিক জীবনের খরচ হিসাব করে খুব অনায়াসে বলে দেওয়া যাবে, যে ছাত্রটি ভারতে পিএইচডি করবে সে অস্ট্রেলিয়াতে পিএইচডি করা যে কোন ছাত্রের থেকে বেশি টাকা সেভ করবে। তাহলে ঐ ছাত্রটি কেন পি এইচডির জন্য বিদেশে যাবে? এর পরেও যাওয়ার অনেক গুলো কারণ হয়তো থাকবে- যেমন ভালো প্রফেসর, ভালো ল্যাবরেটরী, ভালো ইন্টেলেকচুয়াল পরিবেশ। অর্থনৈতিক ব্যাপারটি কিন্তু আর মুখ্য থাকলো না।

আমার মনে হয় এখনই সরকারের উচিৎ গবেষণা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো। (কোটা ছাড়া) মেধার ভিত্তিতে সারা দেশ থেকে ফিল্টার করে করে এক থেকে দেড় হাজার ছেলেমেয়েকে পিএইচডির স্কলারশীপ দিয়ে বিদেশে যেতে বলুক এবং ওদেরকে বলুক তোমরা অস্ট্রেলিয়া ইউরোপ বা আমেরিকায় যে টাকা বেতন পেতে আমরাও সেই টাকা দেব, কিন্তু শর্ত তিনটি- ১) সরকার যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বলবে দেশে ফিরে এসে তোমাকে সে বিশ্ববিদ্যালয়েই চাকুরী করতে হবে। ২) বিদেশে থেকে ডিগ্রী নিয়ে এসে তোমাকে একটি ল্যাব প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং তুমি যা শিখে এসেছো সেই বিষয়ে বা রিলেটেড বিষয়ে আরও পাঁচটি ছেলেমেয়েকে তোমার ল্যাব থেকে পিএইচডি ডিগ্রী দেওয়ার জন্য কাজ করাবে, এবং ৩) তুমি কোন রাজনীতি করতে পারবে না। তোমার কাজ শুধু গবেষণা করা এবং গবেষণাকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ব্যবহারের পথ খোঁজে বের করা।

এর ফলে যা হবে দেশ ১০ বছরের মধ্যে কিছু মেধাবী তরুণ অধ্যাপক পাবে যারা বিদেশের সাথে পাল্লা দিয়ে আমদের দেশে গবেষণা করবে। হাজার হাজার মেধাবী তরুণ তাঁদের অধীনে কাজ করবে। দেশে অনেকগুলো বিশ্বমানের ল্যাবরেটরী হবে। দেশের গবেষণার পরিবেশ বিশ্ব স্বীকৃতি পাবে।
আর এর সামগ্রীক ফল কি হবে তা তো দক্ষিণ কোরিয়া, চায়নার দিকে তাকালেই কিছুটা ধারণা করা যায়। যারা একটু খবর রাখেন তারা জানেন যে, এতটা না হলেও এমন একটি উদ্যোগ মাত্র তিন দশক আগে নিয়েই দক্ষিণ কোরিয়া এখন পৃথিবীর অন্যতম প্রধান সমৃদ্ধ (সব দিক দিয়ে) দেশ।

কিন্তু এর জন্য কী সরকারের খুব বেশি টাকার দরকার- প্রতি বছর হয়ত দুই হাজার থেকে তিন হাজার কোটি টাকা। পত্র পত্রিকায় যেভাবে ব্যাংক কেলেঙ্কারীর কথা শুনি তাতে মনে হয় এই পরিমান টাকা সরকারের হাতের ময়লা।

বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা যখন একটি চাকুরীর নিশ্চয়তা পায়, যখন ভালো কাজ করার পরিবেশ পায়- তখন এরা কি করতে পারে আমি তা কিছুটা দেখেছি | আমাদের একটি জেনারেশান দরকার- যারা পরিশ্রম করবে। আমার মনে হয় আমাদের এখনকার জেনারেশানের ছেলেমেয়েরা তাদের নিজেদের যোগ্যতা সম্বন্ধে জানে। এরা পরিশ্রমী, এরা মেধাবী। এদের উপর বিনিয়োগ করুন- বিনিময়ে একটি অর্থনৈতিক ভাবে সমৃদ্ধ জাতি পাবেন।

Most Popular

To Top