ইতিহাস

৭ মার্চের কিছু ভুল

৭ মার্চের কিছু ভুল

সামনে কোন কাগজ-কলম নেই। লেখাও নেই কোন কিছু। শরীরে জ্বর প্রায় ১০৩। অথচ লেখা হয়ে গেল একটি জাতির স্বাধীনতার দলিল। মাথার ওপর চক্কর দিতে থাকা সামরিক হেলিকপ্টার কিংবা শহরের বড় বড় দালানের ওপর বসানো কামান। সব কিছুই যেন এক তর্জনীর আঘাতে চুরমার। মাত্র ১৯ মিনিটের ভাষণে হাজার বছরের পরাধীন বাঙ্গালী জাতিকে দেখালেন স্বাধীন, মুক্ত আকাশ। পৃথিবী কে জানালেন, তোমার মানচিত্রে জায়গা করে নেবে নতুন একটি দেশ। ৭ মার্চ, রবিবার ১৯৭১ সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর হয়ে বলে দিলেন “ খোদা হাফেজ পাকিস্তান”।

পরের দিন অর্থাৎ ৮ মার্চ পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের কাছে পাঠানো এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, চতুর শেখ মুজিব চালাকি করে স্বাধীনতা ঘোষণা করে দিলেন আর আমরা চেয়ে চেয়ে দেখলাম।

অথচ বঙ্গবন্ধু সরাসরি একটিবারের জন্য স্বাধীনতার কথা বলেননি। বরং দিয়েছিলেন আলোচনার ডাক। কিন্তু এদেশের মানুষ বুঝে নেয় নেতার মনের কথা। মানুষ বুঝে যায় স্বাধীনতা আজ থেকে আর স্বপ্ন নয়। কিন্তু আজও কিছু মানুষ এই ভাষণের সমালোচনা করেন, ভুল ধরেন সেই দিন সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা না করার। আসলেই কি তাই? তাহলে কি বঙ্গবন্ধু সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা না করে ভুল করেছিলেন? তিনি কি আসলেই স্বাধীনতা চাননি? এই প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবো।

সে সময়কার অনেক ছাত্র নেতা, বাম দল গুলো স্বাধীনতা ঘোষণার পক্ষে ছিলো। এমনকি ১০ মার্চ এক জনসভায় মওলানা ভাসানী পশ্চিম পাকিস্তানকে বলে দিয়েছিলেন- “আসসালামু আলাইকুম” অর্থাৎ তিনিও এক প্রকার স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দিলেন। সবাই চাইছে সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা তাহলে কেন বঙ্গবন্ধু সরাসরি ঘোষণা দেননি, এর বেশ কিছু কারণ রয়েছে।

প্রথমত, তিনি চাননি যে পাকিস্তানীরা এদেশের মানুষ কে বিচ্ছিনতাবাদী বলার সুযোগ পেয়ে যাক। কেননা বঙ্গবন্ধু যদি স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন তাহলে একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ভঙ্গ করার দায় এশেদের মানুষের ওপর এসে পরতো। পাকিস্তানিরা গণহত্যা চালানোর বৈধতা পেয়ে যেত। কারণ তখন পাকিস্তানিরা বিশ্ববাসীর সামনে বলার সুযোগ পেয়ে যেত, বাঙ্গালীরা আইন ভঙ্গ করে অগণতান্ত্রিক ভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। তাই দেশের স্বার্থে এই বিদ্রোহ দমন করা দরকার ছিল।

দ্বিতীয়ত, শুধু স্বাধীনতা ঘোষণা করলেই হতো না। প্রয়োজন ছিলো বিশ্বব্যাপী সমর্থন। যেটি কিনা এই পন্থায় ঘোষণা করলে পাওয়া সম্ভব ছিলো না। ৭ মার্চের আগেই তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করে তাকে জানিয়েছিলেন এই ধরনের বিচ্ছিনতাবাদী কাজে মার্কিন সমর্থন থাকবে না। এছাড়াও ভারত বা রাশিয়ার মতো দেশ গুলোর সমর্থন পাওয়া মুশকিল হতো। ২৫ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করে সরকার গঠনের পর আমরা ভারত সহ অন্যান্য রাষ্ট্র গুলোর সমর্থন পেয়েছিলাম। যদি আক্রান্ত হবার আগেই স্বাধীনতার ঘোষণা আসতো, সে ক্ষেত্রে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে বলে বিশ্বব্যাপী প্রচার করতো পাকিস্তান। তখন সারা বিশ্বে আমাদের পক্ষে সমর্থন পাওয়া দুষ্কর হয়ে যেত। যেমনটা হয়েছিলো শ্রীলংকার তামিল কিংবা অতি সম্প্রতি বার্সেলনার ক্ষেত্রে।

তৃতীয়ত, পশ্চিম পাকিস্তানীরা নিরীহ মানুষের ওপর হামলার পরেই আমরা যুদ্ধের পথ বেঁছে নিয়েছি এটি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা খুব বেশি প্রয়োজন ছিলো। আর পার্লামেন্টের অধিবেশন বসার কথা ছিল। কাজেই বঙ্গবন্ধুর এটি প্রমাণ করা দরকার ছিল যে, আমাদের অধিকার দিলে আমরা কখনই যুদ্ধের পথে যেতাম না।

“সেদিন স্বাধীনতা ঘোষণা করলে আর এতো মানুষের প্রাণ দিতে হতো না” এমন একটি কথাও কিছু মানুষ বলার চেষ্টা করেন। এই ধারণা যে ভুল, তা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পরিকল্পনায় বোঝায় যায়। সেদিন ভাষণের সময় মাথার ওপর চক্কর দিতে থাকা গানশিপের কাছে নির্দেশনাই ছিলো যে, স্বাধীনতা ঘোষণা হলেই যেন মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয় সবকিছু। এছাড়াও জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন নেতা হিসেবে, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার ইচ্ছা, আক্রান্ত না হলে আমরা অস্ত্র হাতে তুলে নিতাম না এটি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন ছিলো। যা কিনা পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী সমর্থন পেতে আমাদের সাহায্য করেছে।

আজ স্বাধীনতার এতো বছর পর এসে মাঝে মাঝে মনে হয়, আসলেই বোধয় সেদিন বঙ্গবন্ধু ভুল করেছিলেন। তিনি যদি সেদিন সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েই দিতেন, তাহলে বোধহয় আর এতো বিতর্ক হতো না আর “স্বাধীনতার ঘোষক” এই শব্দটিরও আবিষ্কার হতো না।

“জিয়ে পাকিস্তান”

৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে নিন্দুকেরা আরো একটি কথা বলেন, বঙ্গবন্ধু নাকি তার ভাষণ শেষ করেছিলেন জিয়ে পাকিস্তান/পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মাঝেও এই ব্যাপারটি নিয়ে মতের পার্থক্য দেয়া যায়। কেউ বলেন তিনি বলেছিলেন আবার কেউ বলেন যে তারা এমন কিছু শোনেননি। তাহলে আসলে কি হয়েছিলো? কিছু যুক্তি খোঁজার চেষ্টা করি। একজন নেতার ১৯ মিনিটের ভাষণের মূল বক্তব্যই ছিল স্বাধীনতার পক্ষে, যেখানে তিনি জানেন সমগ্র জাতি স্বাধীনতা চাচ্ছে সেখানে তিনি কিভাবে এটি বলেন?

এছাড়াও তার এই পাকিস্তান সরকার কিংবা অন্য কারো কাছেই এই রেকর্ডটি পাওয়া যায় না। পুরো ভাষণের অডিও বা ভিডিও থাকলেও তার এই পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলার কোন প্রমাণ আজও পাওয়া যায় না। ওইদিন সেখানে বিদেশি বহু সাংবাদিক ছিলেন কারো কাছেই এই ধরনের রেকর্ড পাওয়া যায় না যেখানে বঙ্গবন্ধু এই কথা বলেছিলেন। কাজেই আজ নানা ভাবে যত ভুল খোঁজার চেষ্টাই করা হোক না কেন, ইতিহাস তার এই ভাষণের মূল্যায়ন করেছে। ইতিহাস জানে বাঙ্গালীর বা বাংলাদেশের জন্য এই ভাষণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

Most Popular

To Top