নাগরিক কথা

‘ভূতের বাচ্চা সোলায়মান’ কি আসলেই ধর্মবিদ্বেষী উপন্যাস?

‘ভূতের বাচ্চা সোলায়মান’ কি আসলেই ধর্মবিদ্বেষী উপন্যাস?- নিয়ন আলোয়

একটা প্রশ্ন ঘুরতেসে টাইম-লাইনে। জঙ্গি হামলাকারী ছেলেটা র‍্যাবের কাছে স্বীকারোক্তিতে একটা ধর্মবিদ্ধেষী বইয়ের নাম বলেছে।
তো, ‘ভূতের বাচ্চা সোলায়মান’ এই বইটা; মুহম্মদ জাফর ইকবালের ধর্মবিদ্ধেষী উপন্যাস কিনা? কিংবা এখানে নবী সোলায়মান (আঃ) এর কথা ঘুণাক্ষরেও এসেছে কিনা!

সোজা উত্তর দিইঃ
বইটা আমি পড়েছি। এটার অবলম্বনে বানানো মোরশেদুল ইসলামের নাটকটাও এনটিভিতে দেখিয়েছিল (নাটকটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন)। এটা কোন উপন্যাস না। একটা ছোটদের জন্য লেখা ভৌতিক ফিকশন। এবং ‘’ভুতের বাচ্চা সোলায়মান’ বইটা আপনাদের কিংবা আমাদের কারও জন্য না। একদম প্রাইমারি স্কুলের পিচ্চিদের জন্য লেখা একটা বই। যেখানে ধর্মের প্রতি কোন কটুক্তি কিংবা কাউকেই কটুক্তি করা হয় নাই।
স্যারের লেখা ‘নিশিভূত’ সিরিজ কিংবা ‘ভূতের বাচ্চা কটকটি’ এরকম শিশুতোষ গল্প যারা পড়েছেন। তারা জানবেন, এই বইটাও ‘ভূতের বাচ্চা কটকটির’ মতো এরকম একটা বাচ্চা ভূতকে নিয়ে লেখা বই। কোন ধর্মীয় কিংবা ধর্মকে উপজীব্য করে লেখা বই নয়। যেমন নয় জাফর ইকবালের অন্য বইগুলোও। কারণ তার লেখার স্কুল-জঁরা উভয়েই আলাদা।

এই সো কল্ড বিতর্কিত বইয়ের কাহিনীটা সংক্ষেপে বলি।
নিতু নামের একটা মেয়ে খুব চালাক আর বুদ্ধিমতি। স্কুলে যায় মাত্র। সে তার সমবয়সী বন্ধুদের নিয়ে ‘প্রেত রহস্য’ নামের একটা বই পড়ে ফেলে। একদিন সবাই এক হয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে ভূতকে ডাকে। তো, এই নিরীহ ভূতের বাচ্চাটা এক সন্ধ্যায় পৃথিবীতে এসে আটকে যায়। সেই ভূতের বাচ্চা নিতুকে জানায়- ‘আমার নাম সোলায়মান। আমি দুষ্টলোকের যমের যম, ভালো লোকের জানের জান’। কিন্তু পৃথিবীতে অনেক গরম আর ধূলা! কাজেই, আমি ভূতের দেশে ফিরতে চাই’।
এই হচ্ছে সোলায়মান নামের একটা বন্ধুসুলভ ভূতের বাচ্চার কাহিনী।

যেমন, আরেকটা বইয়ে রিটিনদের বন্ধু ছিল ‘ভূতের বাচ্চা কটকটি’। তো, এই বইয়ে দবীর চাচা নামের এক দুষ্টুলোক একটা অপরাধ করে মিডল ইস্টে পালিয়ে যায়। তারপর বহুদিন পরে নিতুদের বাসায় বেড়াতে আসে। সেই দবির চাচাই এই গল্পের ভিলেন।
নিতুর এই দুঃসম্পর্কে্র চাচা; যেহেতু শেখদের দেশ থেকে এসেছে; তো নিজের সংস্কৃতি ভুলে মিডল ইস্টের শেখদের মতো জোব্বা পরে। আর মনে করে ‘পোলাপাইনকে অলটাইম মাইরের উপর রাখতে হয়’। একদিন, ওই গল্পের দুষ্টুলোক দবির চাচা টের পায়; নিতুর ঘরে একটা ভূতের বাচ্চা থাকে।। নিতু তার সাথে খেলাধুলা করে আর পটরপটর করে গল্প করে। দবীর চাচা যেহেতু দুষ্টুলোক; তাই সে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে নিতুর বন্ধু ভূতের বাচ্চা ‘সোলায়মানকে’ কালোবাজীরদের কাছে বিক্রি করে দিতে চায়।

এর বাইরে বলার মতো কাহিনী কিচ্ছু নাই।
এখন একবার ভাবেন, এই কাহিনীর প্লটে ধর্ম বিদ্ধেষ আছে? এই নাম শুনেই একটা জীবন শেষ করে দিতে চাইলো? কেবল রাবু ভূত আর কটকটির জায়গায়, আরেকটা বইয়ে ‘সোলায়মান’ আসলো বলেই?

আচ্ছা, ধর্ম এসেছে কোথায়? এসেছে।
নিতু নামের মেয়েটা যেদিন বলে, সে সায়েন্টিস্ট হতে চায়। সেদিন ভিলেন দবির চাচা বলে- “আস্তাগফিরুল্লাহ! কি বলে? মাইয়াদের সবার আগে সংসার। তাদের সায়েন্টিস্ট কিংবা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে হয় না”। হ্যাঁ, এই কথাটা আছে।
এই একটা বাক্য ধর্ম-বিদ্ধেষী? এই বাক্যের জন্য কোপানো জায়েজ?

আরেকটা ধূয়োঃ
বইয়ের প্রচ্ছদে দবীর চাচার গায়ে জোব্বা আছে বলে, ধর্মীয় পোশাককে অবমাননা করা হয়েছে? বাহ তাই!
আইসিস যে হাজার হাজার ইয়াজিদী আর খ্রিস্টানদের মেরে ফেললো এই গেল বছরেও; ইয়েমেনে যে রাষ্ট্রীয়ভাবে হাজার হাজার বেদুঈন পৌত্তলিককে মেরে ফেলেছে গত ১০ বছরে; তাদের সবার পোষাকই তো ওই ‘জোব্বা’। এটা তো মরুভূমির সব গোত্রেরই পোষাক, জোব্বা আর মাথায় রশি।

ভুতের বাচ্চা সোলাইমান বইটির প্রচ্ছদ

এই গল্পের দবীর চাচা তো মিডল ইস্টের শেখ হতে গিয়েই জোব্বা গায়ে দেয়। আলেম-ওলামা টাইপ কিছু হতে নয়।
সোজা কথায়, দবির চাচাকে জাফর স্যারের লেখায় মিডল ইস্টের জোব্বা পরা আদম ব্যাবসায়ী শেখের বেশে দেখানো হয়েছে।  তাকে হুজুর হিসেবেও ক্যারিক্টফাই করা হয় নাই। আপনি বড়জোর, আমাদের শৈশবের জাঁদরেল এবং উপযাচক সেকেলে মুরুব্বী ছিল না? এরকম দেখতে পারেন।

পড়লে দেখবেন- ভূতের বাচ্চা কিনতে আসা কালোবাজারিরা তাকে সব সময় ‘স্যার’ সম্বোধন করে। জোব্বা পরা হুজুরও নয়। সে মুরুব্বিপনা করলেও; একলা ঘরে টিভিতে হিন্দি গান দেখতে- শুনতে ভালো পায়।
এই হলো কাহিনী। খুব স্ক্রুটিনি করে দেখলেও।

তাহলে, আপত্তিটা কোথায়?
আপত্তিটা কিছুই নয়। যারা জাফর ইকবালকে কোপাতে চায়, মেরে শেষ করতে চায়। তাদের এই প্রাইমারি ক্লাসের বাচ্চাদের ভুতের গল্প পড়ারও মানসিকতা কিংবা যোগ্যতা নাই।

তাদের মগজ বন্ধ হয়ে গেছে। সেই বন্ধ মগজ আপনাকেও কোপাবে। কেন কোপাবে? আপনি নিজেও জানবেন না।
যদি মনে করেন আপনি সেইফ আছেন। তাহলে আপনাকে আমার পক্ষ থেকে ‘হাই’।

ডিসক্লেইমারঃ মুহাম্মদ জাফর ইকবালের বইয়ের নিরীহতা প্রমাণ করতে এই লেখা লেখা হয় নি। শুধু একটা তাগিদ অনুভব করেছি- এক পক্ষ কতটুকু অন্ধকার। অন্য পক্ষ কতটুকু প্রোপাগান্ডার আর বিষেদ্গারের শিকার; এই উদাহরণটা দেখায়ে দেয়া দরকার। কেবল বই কিংবা টেক্সটের জন্য কাউকে নাস্তিক উপাধি সমর্থন যোগ্য নয়। তার বিশ্বাস কখনও তার প্রাণহত্যার জুজু হতে পারে না। অন্ততঃ কোন সভ্য সমাজে না।

লিখেছেনঃ হাসনাত কালাম সুহান

Most Popular

To Top